শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ২০ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৯ এপ্রিল, ২০১৯ ২৩:০১

জমি না কিনেই প্লট বরাদ্দ দিচ্ছে ট্রাস্ট সিটি, বিক্ষুব্ধ কৃষকরা

হাজারো গ্রাহক প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক

জমি না কিনেই প্লট বরাদ্দ দিচ্ছে ট্রাস্ট সিটি, বিক্ষুব্ধ কৃষকরা

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে পূর্বাচল ৪ নম্বর সেক্টরঘেঁষা ভুঁইফোড় আবাসন পূর্বাচল ট্রাস্ট সিটির আগ্রাসী কর্মকাণ্ড বেড়েই চলেছে। কোনো অনুমতি ছাড়াই গড়ে তোলা নামসর্বস্ব এ আবাসন প্রকল্পের ফাঁদে পড়ে হাজারো গ্রাহক প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। স্থানীয় কৃষকের কাছ থেকে জমি না কিনেই গ্রাহকের মাঝে প্লট বরাদ্দ দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে স্থানীয় কৃষক। ইতিমধ্যে কৃষকের অভিযোগের ভিত্তিতে ওই আবাসন প্রকল্পের সব কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে প্রশাসন। রাজউকের পূর্বাচল নতুন শহরের ২১ নম্বর সেক্টরসংলগ্ন উপজেলার দাউদপুর ইউনিয়নের কুলিয়াদী ও রঘুরামপুর মৌজায় ‘পূর্বাচল ট্রাস্ট সিটি’ নামের প্রকল্পটি অনুমোদন না নিয়েই গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

‘পূর্বাচল ট্রাস্ট সিটি’ প্রকল্পের নামে চটকদার বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে পূর্বাচলে প্লট কিনে অসংখ্য গ্রাহক প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কায় পড়েছেন। ৩ হাজার কাঠা বিক্রীত প্লটের বিপরীতে ৩০০ বিঘার বেশি জমির প্রয়োজন হলেও বাস্তবে এ প্রতিষ্ঠানের জমি আছে মাত্র ৯ বিঘা। স্থানীয়দের কাছ থেকে বছর চুক্তিতে জমি ভাড়া নিয়ে আর মস্তানদের সহযোগিতায় জমি দখলে রেখে প্রকল্পের সাইনবোর্ড টাঙিয়ে নামসর্বস্ব ‘ট্রাস্ট সিটি’ গড়ে তোলা হয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানের প্রচারণা বন্ধ ও প্লট বিক্রির ওপর রয়েছে রাউজকের নিষেধাজ্ঞা। তবু থামছে না তাদের প্রতারণামূলক আগ্রাসী কার্যক্রম। জানা যায়, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাউজক) পূর্বাচল নতুন শহরের ২১ নম্বর সেক্টরসংলগ্ন উপজেলার দাউদপুর ইউনিয়নের কুলিয়াদী ও রঘুরামপুর মৌজায় প্রকল্প দেখানো হয়েছে ‘পূর্বাচল ট্রাস্ট সিটি’র। পূর্বাচল উপশহরের তুলনায় কম দামে প্লট দেওয়ার আশ্বাসে ট্রাস্ট সিটি শুরু করে বাহারি প্রচারণা। স্বপ্নের শহরে নিজের বাড়ি নির্মাণের আশায় লোকজন প্লট কেনেন ট্রাস্ট সিটিতে। গত চার বছরে ট্রাস্ট সিটির বিক্রীত প্লটের পরিমাণ হাজারের বেশি। প্রতিষ্ঠানের ধার্যমূল্য ১০ লাখ টাকা কাঠাপ্রতি বিক্রি করা হচ্ছে ট্রাস্ট সিটির প্লট। সে হিসেবে গ্রাহকের কয়েক শ কোটি টাকা ইতিমধ্যে জমা পড়েছে প্রকল্পটির কাছে। এদিকে গত আট বছরে সেখানে ট্রাস্ট জমি কিনেছে মাত্র ৯ বিঘা। অবশ্য তাদের হিসাবে কেনা জমির পরিমাণ ৫০ বিঘা। আর কৃষকের জমি জোরপূর্বক দখলে নেওয়া হয়েছে। কৃষকের অভিযোগের ভিত্তিতে পূর্বাচল ট্রাস্ট সিটির সব কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় প্রশাসন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এলাকার কৃষকের কাছ থেকে সাইনবোর্ড টাঙানোর শর্তে বছর চুক্তিতে জমি ভাড়া নিয়ে প্লট হিসেবে বিক্রি করা হয়েছে। এ ছাড়া সন্ত্রাসীদের সহায়তায় অনেক জমি দখলে রেখে প্লট বিক্রি করছে তারা। শিমুলিয়ার মুরাদ হাসান সিপনের ১৩ শতাংশ, রিপন মিয়ার ৩৯ শতাংশ, লুৎফর রহমানের ১৩ শতাংশ, সাজিদুর রহমানের ১৩ শতাংশ, মাজাহারুল ইসলাম রতনের ২৩ শতাংশ, হ্যাপি আক্তারের ১৫ শতাংশ, লিলি আক্তারের ১৫ শতাংশ, মমতাজ বেগমের ১৫ শতাংশ, শফিকুর রহমানের ১৭ শতাংশ, বোরহানের ২১ শতাংশ, কাউসারের ১৪ শতাংশ কৃষিজমিতে বালু ভরাট করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া এ কোম্পানি স্থানীয় সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে হুমকি ও ভয়ভীতি দেখিয়ে কুলিয়াদী মৌজায় কুলিয়াদী এলাকার নাসির মিয়ার ২৭ শতাংশ, হাশেম মিয়ার ২৩ শতাংশ, আমজাদ হোসেনের ১০০ শতাংশ, আনোয়ার হোসেনের ১০০ শতাংশ, নান্নু মিয়ার ১০০ শতাংশ, ওহাব ভূইয়ার ১০০ শতাংশ, মোজাম্মেল ভূইয়ার ২৬ শতাংশ, আজিজুল হকের ১৩ শতাংশ, মোস্তফা মিয়ার ২৯ শতাংশ, ছালাম মিয়ার ৪৪ শতাংশ, হাসমত আলীর ৪৫ শতাংশ, শিমুলিয়ার হামিদ মিয়ার ১১ শতাংশ, রঘুরামপুর মৌজায় রঘুরামপুর এলাকার ঈমান খানের ২২ শতাংশ, ফজলুল হক খানের ১২ শতাংশ, মোফাজ্জল হোসেনের ২৬ শতাংশ, হারুনুর রশিদের ২৬ শতাংশসহ ১৩৬ জনের মোট ১০০ বিঘা জমিতে জমি না কিনেই জোরপূর্বক ও ভাড়ায় কোম্পানির সাইনবোর্ড লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ট্রাস্ট সিটির প্রকল্পের সন্ত্রাসী কর্মকা  পরিচালনার জন্য মাসিক চুক্তিতে মস্তানদের লালন-পালন করে প্রতিষ্ঠানটি। হিরনাল এলাকার সন্ত্রাসী হুমায়ুন কবীর মিঠু ও তার সহযোগী কামরুল হাসান নয়ন, মোতাহার ফকির, হালিম মোল্লা, জামান, রেজু, শিবজন, ছলুসহ ৪০-৫০ জনের একটি দল এলাকায় ট্রাস্ট সিটির নিয়ন্ত্রণ করে। কেউ প্রকল্প দেখতে এলে সাইডে দাঁড়ানো থাকে এ বাহিনীর সদস্যরা। এলাকার কৃষকদের শায়েস্তা করে জমিতে সাইনবোর্ড টাঙায় এ মস্তান বাহিনী। ট্রাস্ট সিটির নির্দেশে এ বাহিনীর অত্যাচারের শিকার হয়েছেন এলাকার বহু কৃষক। ট্রাস্ট সিটির প্রতারণা ফাঁস হয়ে যাওয়ায় শতাধিক গ্রাহক টাকা ফেরত চেয়ে মামলা করেছেন এ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। ২০১৭ সালের ১৫ মে স্থানীয় ১৩৬ জন জমির মালিকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ট্রাস্ট পূর্বাচল নামক আবাসন কোম্পানি তার প্রকল্পে ন্যূনতম জমি না কিনে এবং রাজউক থেকে প্রকল্পের অনুমোদন না নিয়ে প্রকল্পের বিজ্ঞাপন প্রচার, জমি দখল, বালু ভরাটসহ প্লট বিক্রির কার্যক্রমের ওপর ২০১৭ সালের ১২ জুলাই নিষেধাজ্ঞা জারি করে রাজউক। রাউজকের সচিব সুশান্ত চাকমার স্বাক্ষরিত সে নিষেধাজ্ঞার অনুুলিপি দুর্নীতি দমন কমিশনে প্রেরণ করে রাউজক। যার স্মারক নম্বর ২৫.৩৯.০০০০.০৩০.৩২.০০৪.১৭-১০০২(৩)। এর পরও কোম্পানি রাউজকের নিষেধাজ্ঞাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কেবল এলাকার মস্তানদের সহযোগিতায় এখনো দাবড়ে বেড়াচ্ছে। এ ব্যাপারে ট্রাস্ট সিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘একটি বড় প্রকল্প তৈরি করতে গেলে কিছু ভুলত্রুটি থাকবেই। সঠিক হিসাব দেখাতে না পারলেও আমরা এলাকায় বহু জমি কিনেছি। এখন অবধি ৭০০-এর অধিক প্লট বিক্রি হয়েছে আমাদের। সম্পূর্ণভাবে কিস্তি পরিশোধ ও এককালীন টাকা প্রদান করায় ২৫ জনকে ইতিমধ্যে প্লট রেজিস্ট্রি করে দিয়েছি।’


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর