Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ১ মে, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ৩০ এপ্রিল, ২০১৯ ২৩:৩৭

বিএনপির শীর্ষ নেতারা ক্ষুব্ধ

ফখরুলের আসন শূন্য ঘোষণা। চার এমপির শপথ নিয়ে অন্ধকারে ছিল স্থায়ী কমিটি জানত না ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দল। তৃণমূলে হতাশা। সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনা

শফিউল আলম দোলন ও মাহমুদ আজহার

বিএনপির শীর্ষ নেতারা ক্ষুব্ধ

বিএনপির চার এমপি শপথ নেওয়ায় দলের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল হতভম্ব, ক্ষুব্ধ। নেতা-কর্মীদের বড় অংশই হতাশ। তবে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সিদ্ধান্তের কথা বলায় প্রকাশ্যে কেউ কিছু বলছেন না। দলের এ সিদ্ধান্তে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে। নেতা-কর্মীরা দলের এ সিদ্ধান্তকে এইচ এম এরশাদের ‘সকাল বিকাল মত পাল্টানোর’ সঙ্গেও তুলনা করেছেন। তারেক রহমানের নাম ভাঙানোর কথাও বলছেন কেউ কেউ। তবে ক্ষুব্ধ হলেও তারেক রহমানের নাম ব্যবহার করায় সিদ্ধান্ত মেনে নিতেও তারা প্রস্তুত।

সোমবার রাতে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসন কার্যালয়ে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যখন সংবাদ সম্মেলন করেন, তখন তিনি একাই ছিলেন। জানা যায়, একাধিক সদস্যকে ডেকেও সাড়া পাওয়া যায়নি। সূত্রে জানা যায়, রবিবার রাতে গুলশান কার্যালয়ে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে স্কাইপিতে লন্ডন থেকে যুক্ত হন তারেক রহমান। ওই সময় স্থায়ী কমিটির সদস্যরা দলীয় এমপিদের শপথ ঠেকানোর পক্ষে মত দেন। এ নিয়ে নানা কৌশল গ্রহণ করা হয়। তারেক রহমানও স্থায়ী কমিটির সঙ্গে একমত হন। স্থায়ী কমিটির বৈঠকের সময় পাশের রুমে ছিলেন তিন সংসদ সদস্য। এরপর তারেক রহমান এমপিদের সঙ্গে কথা বলেন। সংসদে না যাওয়ার পক্ষে তিনি যুক্তি তুলে ধরলে এমপিরা পাল্টা যুক্তি তুলে ধরেন। সোমবার চার এমপির শপথ নেওয়ার আগ মুহূর্তে হারুনুর রশীদের বাসায় স্কাইপিতে কথা বলেন তারেক রহমান। এরপরই শপথ নেন চার এমপি। স্থায়ী কমিটির বৈঠকের পর নতুন সিদ্ধান্ত সম্পর্কে অজানা ছিল বিএনপির শীর্ষ নেতাদের। এ নিয়ে প্রকাশ্যে কেউ মন্তব্য না করলেও ক্ষুব্ধ মনোভাব লক্ষ্য করা গেছে। এ ব্যাপারে কথা বলতে স্থায়ী কমিটির পাঁচজন সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তারা কেউই এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, দলের মুখপাত্র মির্জা ফখরুল। এখন তার বক্তব্যই দলের বক্তব্য। আমার এ নিয়ে আলাদা করে কিছু বলার নেই। গয়েশ্বর রায় বলেন, যা বলার মহাসচিবই বলেছেন। আমার কোনো বক্তব্য নেই। তবে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে শুধু এটুকুই জানান, সর্বশেষ স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এমপিদের শপথ নেওয়ার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে দলীয় সদস্যদের সংসদে শপথ নেওয়ার সিদ্ধান্তকে রাজনীতির ‘চমক’ এবং ‘ইউটার্ন’ হিসেবে দেখছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ‘গতকাল থেকে রাজনীতি খুব গরম হয়ে উঠেছে। গরম হয়ে উঠেছে যে, বিএনপির নির্বাচিত বলে  ঘোষিত যেসব সংসদ সদস্য তারা সংসদে শপথ নিয়েছেন। এটা নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে একটা চমক। চমকের মতো একটা সংবাদ। ইউটার্নের মতো।’ এদিকে গতকাল নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নেতা-কর্মীদের মধ্যেও হতাশাভাব দেখা যায়। কর্মী-সমর্থকরা বাংলাদেশ প্রতিদিনের কাছে জানতে চান, এটা কীভাবে হলো। এ ঘটনায় তারা খুবই হতভম্ব ও স্তম্ভিত। অন্য দিনের তুলনায় নেতা-কর্মীর সংখ্যাও গতকাল কম দেখা গেছে। মধ্যমসারির এক নেতা মন্তব্য করেন, আগামী তিন মাস কোনো কথাই বলব না। কোনো কর্মসূচিতেও যাব না। কোন মুখ নিয়ে কথা বলব? যা কৌশল বলা হচ্ছে তা তো আত্মঘাতীও হতে পারে। তারপরও বিষয়টি দলের সিনিয়র নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল। মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীরা বলছেন, এখন আর জোর গলায় বলা যাবে না এ সরকার ও সংসদ অবৈধ। ৩০ ডিসেম্বর যে ভোট কারচুপি হয়েছে, সেটার উদাহরণও তুলে ধরা যাবে না। বিএনপির হাইকমান্ড যদি এই সিদ্ধান্তই নেবেন, তা দলীয় ফোরামে তোলা উচিত ছিল। এটা নিচু মানের রাজনীতি হলো। বেশ কিছুদিন পর বিএনপি আবারও ভুল রাজনীতিতে পা দিল। এ প্রসঙ্গে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘৩০ ডিসেম্বর ভোটের পর থেকেই দল সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এ অবৈধ সংসদে বিএনপি যোগ দেবে না। সরকারকে বৈধতা দেবে না। সেটা নিয়েই আমরা বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়েছি। কিন্তু এখন কৌশলগত কারণে বিএনপির পাঁচ এমপি সংসদে যোগ দিয়েছেন। কিন্তু আজ দলের মুখপাত্র ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, তিনি শপথ নেবেন না। প্রথম ২৪ ঘণ্টায় সরকার নিজেকে জয়ী মনে করলেও বিএনপি মহাসচিব শপথ না নেওয়ায় তারা চাপে পড়েছে। এতে আমি মনে করি, বিএনপির জয় হয়েছে।’ দলের যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, ‘তারেক রহমান শুধু বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানই নন, তিনি বেগম খালেদা জিয়ারও সন্তান। মাকে নিয়ে সন্তানের উদ্বেগ থাকাটাই স্বাভাবিক। চার এমপির শপথ নিয়ে দলের হাইকমান্ড যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা ভালো কি মন্দ কয়েকদিনের মধ্যেই স্পষ্ট হবে বলে আশা করছি।’ বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলেন, ‘চার এমপির শপথ গ্রহণের খবরে সারা দেশের নেতা-কর্মীদের মন খারাপ। তাহলে এরশাদের সঙ্গে বিএনপির পার্থক্য কোথাই রইল? আমাদের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে জেলে রয়েছেন। তিনি আজ চরম অসুস্থ। তিনি যদি ছাড়া পেতেন আর এমপিরা সংসদে যেতেন তবুও এই প্রশ্ন উঠত না। ৩০ ডিসেম্বর কেমন ভোট হয়েছে তা সবারই জানা। এরপরও শপথ নেওয়া মানে এই সরকারকে বৈধতা দেওয়া। তারপরও যদি কৌশলগত কারণে বিএনপির হাইকমান্ড সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন সেখানে আমার মতো ক্ষুদ্র কর্মীর আর কিইবা বলার আছে।’  

চার নেতার শপথকে কীভাবে দেখছেন বিএনপির ফেসবুক সমর্থকরা : বিএনপির সমর্থকদের ফেসবুকে লেখা কিছু মন্তব্য তুলে ধরা হলো। একজন বলেছেন, ‘দলীয় সিদ্ধান্ত কথাটার মাঝেও রাজনীতি আছে। রাজনীতির মাঝেও রাজনীতি। বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব তৃণমূলের সঙ্গে রাজনীতি করছে, এটা দুঃখজনক।’ আরেকজন লিখেছেন, বেইমানরা আদর্শ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করুক, সমস্যা নাই। আমাদের আদর্শ বিক্রি হবে না। এ আদর্শ জাতীয়তাবাদের। এ আদর্শ শহীদ জিয়ার। আরেকজন বলেছেন, ‘মায়ের বিপদে সন্তান বিচলিত, উদ্বিগ্ন হবে এটাই স্বাভাবিক। সন্তান অবশ্যই চাইবেন যেভাবেই হোক মা যেন এই বিপদ থেকে মুক্তি পান। কিন্তু সন্তানের এই উদ্বিগ্নতাকে কাজে লাগিয়ে, বিচলিত পরিস্থিতিতে সন্তানকে ভুল-ভাল বুঝিয়ে নেতৃত্বের জায়গা থেকে নেতার মতো ভূমিকা পালন না করে যেসব নেতা পকেট ভারী করে নিজের স্বার্থ হাসিল করেন তাদের কোন শ্রেণিতে ফেলবেন? আরেকজন মন্তব্য করেছেন, আন্দোলনের অংশ হিসেবে সংসদে বিএনপি! তাহলে তো আন্দোলনের অংশ হিসেবে শিয়ালকেও মুরগি বর্গা দেওয়া যায় নাকি!

জানতো না ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলের শরিকরাও : বিএনপির চার এমপির শপথ গ্রহণ সম্পর্কে জানতেন না জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটের শরিক দলের নেতারাও। ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলের একাধিক নেতার সঙ্গে আলাপকালে এ তথ্য জানা গেছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উপস্থিতিতে গতকাল এক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের  নেতা নাগরিক ঐক্যের আহবায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘যদি সমঝোতা হয় তা হলে সেই সমঝোতাটা খোলাখুলি বলেন, কী সমঝোতা হয়েছে? বিএনপি সমঝোতা করলে অনেক আগেই সমঝোতা করতে পারত। বেগম খালেদা জিয়া যদি সমঝোতা করতেন তাহলে উনি প্রধানমন্ত্রী থাকতেন, অন্য কেউ প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন না- এই কথাগুলো আপনাদের মনে রাখতে হবে।’ ২০ দলীয় জোটের শরিক দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বিএনপি যে ১৮০ ডিগ্রী ইউটার্ন, এটা এলডিপি জানে না। আমার মনে হয়, ২০ দলীয় জোটেরও কেউ জানেন না। এতে আমরাও হতাশ।

সংসদে ফখরুলের আসন শূন্য ঘোষণা : নব্বই দিনের মধ্যে শপথ না নেওয়ায় জাতীয় সংসদের বগুড়া-৬ আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। গতকাল একাদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এ সংক্রান্ত ঘোষণা দেন। স্পিকার বলেন, সংবিধানের ৬৭ অনুচ্ছেদের (১) (ক) বিধি অনুযায়ী সংসদের প্রথম বৈঠকের তারিখ হতে ৯০ দিনের মধ্যে সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে নির্ধারিত বিধান অনুযায়ী কোনো সদস্য শপথ গ্রহণ করতে অসমর্থ হন, বিধায় তার আসনটি শূন্য হয়। স্পিকার বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শপথ গ্রহণের অসমর্থ হওয়ায় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ১৭৮ (৩) বিধি অনুযায়ী শূন্য হওয়া সম্পর্কে সংসদকে অবহিত করার বিধান রয়েছে। এমতাবস্থায় শপথ গ্রহণে অসমর্থ হওয়ায় নির্বাচনী এলাকা ৪১, বগুড়া-৬ হতে নির্বাচিত সদস্য মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের আসনটি শূন্য হয়। বিষয়টি জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ১৭৮ (৩) উপবিধি অনুযায়ী এই সংসদে অবহিত করা হলো।


আপনার মন্তব্য