শিরোনাম
সোমবার, ২৯ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ টা

ঘরে ঘরে ডেঙ্গু, এক দিনেই হাসপাতালে ভর্তি ৮২৪

জয়শ্রী ভাদুড়ী

ঘরে ঘরে ডেঙ্গু, এক দিনেই হাসপাতালে ভর্তি ৮২৪

মশার উপদ্রব নিয়ে গতকাল বিক্ষোভ

রাজধানীতে প্রতিদিন বাড়ছে ডেঙ্গু রোগী। এত রোগী সামাল দিতে হিমশিম পরিস্থিতি হাসপাতালগুলোতে। অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতাল ঘোষণা দিয়েছে শয্যা ফাঁকা না হলে তারা আর নতুন রোগী ভর্তি নেবে না। সরকারি হাসপাতালগুলোতে মেঝে, বারান্দায় রোগী রেখে চিকিৎসা দিচ্ছেন চিকিৎসক, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা। এদিকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে বেশ কিছুদিন ধরেই ভ্যাক্সিনের ব্যাপারে আলোচনা চলছিল, এমন কোনো ভ্যাক্সিন যেটা পুশ করলে ডেঙ্গু আক্রান্তের ঝুঁকি থাকবে না। এ বিষয়ে সানোফি অ্যাভেনটিস নামে এক কোম্পানির সঙ্গে আলোচনা চলছিল স্বাস্থ্য অধিদফতরের। তবে এই ভ্যাক্সিন না আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদ বলেন, আমরা এই ভ্যাক্সিনের সম্ভাব্যতা যাচাই করেছি। একবার ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে এই ভ্যাক্সিন দেওয়া যাবে না। কাউকে এই ভ্যাক্সিন দিলে সে ডেঙ্গুর অন্য টাইপে আক্রান্ত হতে পারে। সেক্ষেত্রে এর ফলাফল হবে ভয়াবহ। এই ভ্যাক্সিন দিলে শরীরে ইমিউনিটি তৈরি হতে ৩-৪ মাস সময় লাগবে। এটা আনতেও প্রায় চার মাস সময় লাগবে। তাই এই ভ্যাক্সিন না আনার সিদ্ধান্ত আমাদের।

তিনি আরও বলেন, আমরা ন্যাশনাল গাইড লাইনের আলোকে চিকিৎসায় জোর দিচ্ছি। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার সমন্বয়ে প্রয়োজনে গাইড লাইন সংযোজন করা হবে। ৫০ জনের একটি প্রশিক্ষণ টিম তৈরি করা হচ্ছে। তারা হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু আক্রান্তদের সেবা ব্যবস্থার বিষয়ে চিকিৎসক, নার্স এবং স্বাস্থ্য কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেবেন। এ ছাড়া দেশের সব মেডিকেল কলেজে ডেঙ্গু রোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৮২৪ জন। এ পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১১ হাজার ৬৫৪ জন। তবে বেসরকারি হিসেবে আক্রান্তের সংখ্যা লাখ ছাড়িয়েছে। সরকারি হিসেবে মৃতের সংখ্যা ৮ জন বলা হলেও এ পর্যন্ত ৩৫ জনের মৃত্যুর বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে। ঢাকার বাইরেও বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। সরকারি হিসেবে গতকাল রাজধানীর বাইরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ১৪১ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এডিসবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. এম এম আক্তারুজ্জামান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমরা ডেঙ্গু চিকিৎসায় ন্যাশনাল গাইড লাইন তৈরি করেছি। প্রতিটি হাসপাতালে ডেঙ্গু কর্নারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বেশিসংখ্যক রোগীকে চিকিৎসার আওতায় আনতে ঢাকা মেডিকেলের নতুন শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট ভবনকে আপাতত ডেঙ্গু ইউনিট হিসেবে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া তেজগাঁওয়ের সরকারি গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউটও ডেঙ্গু রোগীদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় ১০টি মেডিকেল টিম গঠন করা হবে।

রাজধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, সিঁড়ির মাঝের জায়গায় রোগী রেখে চিকিৎসা চলছে। রোগী সিয়ামের দেখাশোনা করছেন তার চাচাতো ভাই রফিক। তিনি বলেন, তিনটি প্রাইভেট হাসপাতালে সিট না পেয়ে এখানে নিয়ে এসেছি। এখানে তবু চিকিৎসা চলছে। চিকিৎসক-নার্সরা যথেষ্ট চেষ্টা করছে সেবা দেওয়ার। জরুরি ভিত্তিতে আরও কিছু ওয়ার্ড বাড়ানোর বিষয়ে বলেন তিনি।

রাজধানীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রতিদিনই বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর : রংপুর : রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত ৩১ রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় ৮ জন ভর্তি হয়েছেন। আক্রান্তদের বেশিরভাগই ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং কিংবা চাকরি করতেন। সেখান থেকে আক্রান্ত হয়ে বাড়িতে চলে এসে রমেক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

পটুয়াখালী : পটুয়াখালীতে প্রতিদিনই বাড়ছে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। গত ১৬ জুলাই থেকে ২৭ জুলাই পর্যন্ত জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১০ জন ডেঙ্গু রোগী। হঠাৎ ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর্যাপ্ত সুবিধা না থাকায় বেসরকারি ক্লিনিকে পরীক্ষা করে শনাক্ত করা হচ্ছে রোগী।

টাঙ্গাইল : টাঙ্গাইলে সাতজন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি আছেন। তারা সবাই পুরুষ। এদের মধ্যে ছয়জনই ঢাকা থেকে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়েছে। আর মাত্র একজন টাঙ্গাইলে আক্রান্ত হয়েছে।

যশোর : গত ১০ দিনে যশোর জেনারেল হাসপাতালে ৩১ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। যাদের মধ্যে ৯ জন ছাড়পত্র নিয়ে বাড়িতে ফিরেছেন। বাকি ২২ জন গতকাল পর্যন্ত যশোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি আছেন। এর মধ্যে গতকাল ভর্তি হয়েছেন দুজন। এর আগের দিন ৮ জন ভর্তি হয়েছিলেন।

খুলনা : খুলনায় এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ৫০ জন রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। যাদের অধিকাংশ ঢাকা থেকে আক্রান্ত হয়ে খুলনায় এসেছেন।

মাদারীপুর : মাদারীপুরে গত ৫ জুলাই থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৩ জন রোগী। যার মধ্যে গত এক সপ্তাহে ভর্তি হয়েছে ১০ জন। এদের মধ্যে মাদারীপুরের নিজ এলাকা থেকে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে দুজন বাসিন্দা। ফলে জনমনে ভীতির সৃষ্টি হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে ১১ জনই ঢাকা থেকে আক্রান্ত হয়ে মাদারীপুরে এসেছে বলে দাবি সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক শশাঙ্ক চন্দ্র ঘোষের।

রাজশাহী : রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন অন্তত ৪১ জন ডেঙ্গু রোগী। এই হাসপাতালে এত দিন ডেঙ্গু রোগ শনাক্ত করার উপকরণ ‘স্ট্রিপ’ ছিল না। অবশেষে গতকাল স্ট্রিপ কিনেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তবে এর খরচ বহন করতে হবে রোগীদের।

মৌলভীবাজার : জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত ৯ জন রোগীকে শনাক্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে পাঁচজন রোগী এখন মৌলভীবাজার সদর ও প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসার জন্য সদর হাসপাতালে খোলা হয়েছে ডেঙ্গু কর্নার।

বরিশাল : বরিশালে ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। গত শনিবার বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেলে ১২ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন থাকলেও একদিনের ব্যবধানে গতকাল ভর্তি ছিল ২৫ জন।

গতকাল চিকিৎসাধীন ২৫ জনের মধ্যে ২ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। এদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা ২৫ জনের মধ্যে ২০ জন পুরুষ এবং ৫ জন ছিল নারী। এদের বেশিরভাগই ঢাকা থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে বরিশাল এসেছেন।

এই বিভাগের আরও খবর

সর্বশেষ খবর