শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৫ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৪ আগস্ট, ২০১৯ ২২:৩৭

সিন্ডিকেটে যত সর্বনাশ চামড়া নিয়ে নৈরাজ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক

সিন্ডিকেটে যত সর্বনাশ চামড়া নিয়ে নৈরাজ্য

সিন্ডিকেট বাণিজ্যে জিম্মি হয়ে পড়া চামড়ার বাজারে ভয়াবহ ধস নেমেছে। চামড়ার বাজারের ভয়াবহ এ নৈরাজ্যের কারণে প্রান্তিক পর্যায় থেকে আড়ত ব্যবসায়ীরা পর্যন্ত চরম ক্ষতির শিকার হয়েছেন। দাম না পেয়ে সড়কের ওপরই শত শত চামড়া ফেলে গেছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। চট্টগ্রামে কয়েক হাজার চামড়ার ঠাঁই হয়েছে সিটি করপোরেশনের ভাগাড়ে। দিনাজপুর, নাটোর, যশোরসহ দেশের চামড়ার বাজার খ্যাত অনেক স্থানেই ক্ষতিগ্রস্তরা শত শত চামড়া মাটির নিচে পুঁতে ফেলেছেন। সিলেটসহ কয়েকটি এলাকায় চামড়া নদীতে নিক্ষেপ করে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত প্রান্তিক মানুষজন।

এ ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মহল জানিয়েছেন, চামড়ার নজিরবিহীন এ দরপতনের কারসাজি বিগত ৩১ বছরেও দেখতে পাননি তারা। লাখ টাকা দামের গরুর চামড়াও বিক্রি করতে হয়েছে মাত্র ৪০০ টাকায়। বাজারের এ কারসাজিতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দুস্থ, এতিম ও আর্থিক দৈন্যদশায় থাকা মসজিদ, মাদ্রাসা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। চামড়ার বাজারের নজিরবিহীন এ দরপতনকে ‘ব্যবসায়ীদের কারসাজি’ বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘সরকারের যে কোনো উদ্যোগে একটি মহল বিরুদ্ধাচরণ করে থাকে। তবে মানুষ যেন চামড়ার ন্যায্য দাম পায় তা নিশ্চিত করতেই আমরা কাঁচা চামড়া রপ্তানির সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেছি।’ এদিকে কাঁচা চামড়া রপ্তানির সুযোগ ঘোষণায় ব্যবসায়ীদের এক পক্ষ খুশি হলেও আরেক পক্ষ শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এরই মধ্যে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ) কাঁচা চামড়া রপ্তানির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারেরও দাবি জানিয়েছে।

কেন দুর্দশা চামড়ার বাজারে : সাভারের চামড়া শিল্প নগরীর ছোট ছোট চায়ের দোকানে অবসর সময় কাটছে শ্রমিকদের। ট্যানারিগুলোর ভিতরে নেই কর্মযজ্ঞ। হাতে গোনা কয়েকটিতে চামড়ার ট্রাক এসেছে। গতকাল এসব ট্যানারি-সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাধারণত ঈদের পরের সাত দিন উৎসবের আমেজ থাকে ট্যানারির কারখানাগুলোতে। এবার সেই চিরচেনা ব্যস্ততা নেই। মালিকরা বলছেন, গত বছরের চামড়া মজুদ আছে। বিদেশি ক্রেতাও কমে গেছে। তাই দামও কমেছে। খোকন ট্যানারি লিমিটেডের মালিক মো. সেলিম বলেন, ‘বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেখেছি চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। এতেই পরিষ্কার আমাদের অবস্থা কত খারাপ।’ চায়নিজ গোল্ডেন ট্যানারি লিমিটেডের সুপারভাইজর মো. মিন্টু মিয়া বলেন, সবাই বলে ট্যানারিমালিক এবং রাজধানীর পোস্তার ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করছেন। কিন্তু আসল সিন্ডিকেট করেন কেমিক্যাল ব্যবসায়ীরা। দেশীয় বাজারে ২০১৪ সাল থেকেই ধারাবাহিকভাবে কমছে কাঁচা চামড়ার দাম। গেল কোরবানিতে কাঁচা চামড়ার দাম বেশি মন্দা ছিল। এতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হন মৌসুমি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। তারা জানিয়েছেন, কাঁচা চামড়ার দামের বিষয়টি নির্ভর করে ফড়িয়া ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের ওপর। কয়েক বছর ধরে কৃত্রিম সমস্যা সৃষ্টি করে বাজার থেকে অল্প দামে চামড়া কিনছেন আর ট্যানারিমালিকদের সঙ্গে নিজেদের অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বের বিষয়টি বারবার অজুহাত হিসেবে দেখাচ্ছেন আড়তদাররা। রাজধানীর পোস্তায় আসা মৌসুমি চামড়ার ব্যবসায়ী জিল্লুর রহমান বলেন, আগে চামড়ার ব্যবসা এমন ছিল না। এখন ট্যানারিমালিক ও আড়তদাররা ছাড়া কারও পকেটে মুনাফার টাকা যায় না। আরেক ব্যবসায়ী মোহাম্মদ বিল্লাল বলেন, দুই বছর ধরে আর মুনাফার মুখ দেখা যায় না। দিন দিন ব্যবসা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘চামড়ার বাজারে সমস্যা হচ্ছে ট্যানারিমালিকদের কাছে পাওনা টাকা নিয়ে। আমরা যে পরিমাণ কিনতে চাইছি, তা পুঁজির অভাবে পারছি না। সবার কাছে টাকা থাকলে বাজারে প্রতিযোগিতা থাকত, ফলে চামড়ার দামও বাড়ত।’ কাঁচা চামড়া সংগ্রহকারী পাইকাররা এবার ঈদের আগের রাতেও জানিয়েছেন, তাদের হাতে প্রয়োজনীয় টাকা নেই। তাদের দাবি, ৮০ থেকে ৮৫ ভাগ ট্যানারিমালিক গত বছরের চামড়ার পেমেন্ট দেননি। চামড়ারও বেশ কিছু টাকা ট্যানারিমালিকদের কাছে পাওনা রয়েছে। শতভাগ টাকা পেমেন্ট করেছে এ রকম ট্যানারি আছে মাত্র এক থেকে দুটি।

রপ্তানির সুযোগে এক পক্ষ খুশি, আরেক পক্ষ শঙ্কিত : স্থানীয় শিল্পে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, সাধারণ মানুষ ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা কতটা উপকৃত হতে পারেনÑ এসব বিষয়ে অস্পষ্টতার মধ্যেই দেশে প্রথমবারের মতো কাঁচা চামড়া রপ্তানির অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। রপ্তানির সুযোগ হলে আর ট্যানারিগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না এ আশায় কাঁচা চামড়ার পাইকারি ব্যবসায়ী ও আড়তদাররা সরকারের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। কিন্তু চামড়াজাত পণ্য, পাদুকা উৎপাদন শিল্প ও প্রক্রিয়াজাত চামড়া রপ্তানির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কাঁচা চামড়া রপ্তানি হলে দেশে এসব শিল্পের কাঁচামালের সহজলভ্যতা কমে যাবে। এতে হুমকির মুখে পড়বে পুরো শিল্প। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার অ্যান্ড লেদারগুডস এক্সপোর্টারস অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহ-সভাপতি দিলজাহান ভূঁইয়া বলেন, কাঁচা চামড়া রপ্তানি হলে শিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে। কাঁচা চামড়া রপ্তানির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ)। সংগঠনটি বলেছে, কাঁচা চামড়া রপ্তানির সুযোগ দিলে শতভাগ দেশীয় এই শিল্প হুমকির মুখে পড়বে। চামড়া শিল্প নগরীতে সাত হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ ঝুঁকির সম্মুখীন হবে। সাভারের আধুনিক শিল্প নগরী প্রয়োজনীয় কাঁচা চামড়ার অভাবে সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে পড়বে। এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত জনগোষ্ঠী বেকার হয়ে পড়বে। গতকাল ধানমন্ডিতে নিজস্ব কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন বিটিএ চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ।

তবু চামড়া পাচারের আশঙ্কা : কোরবানির চামড়া ঘিরে সক্রিয় হয়ে উঠেছে পাচারকারী একাধিক সিন্ডিকেট। ফলে পর্যাপ্ত লবণ মজুদের পাশাপাশি সহজ শর্তে চামড়া কিনতে ৬০০ কোটি টাকার ঋণসুবিধা দেওয়ার পরও কোরবানির চামড়া পাচারের শঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। ফড়িয়া ও খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দর কম বলে ট্যানারি ব্যবসায়ীরা নিজের প্রয়োজনে বেশি চামড়া কিনছেন না। প্রকৃত দামও পাচ্ছেন না মালিকরা। বিদেশে পাচার হওয়ার শঙ্কাও রয়েছে। তবে বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা এ বিষয়ে সজাগ রয়েছেন।

আরও খবর : আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো আরও খবর-

নারায়ণগঞ্জ : ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের ফতুল্লার জালকুড়িস্থ আন্তর্জাতিক ভেন্যু খান সাহেব ওসমান আলী ক্রিকেট স্টেডিয়ামের উল্টো পাশের রাস্তায় পড়ে আছে হাজার হাজার চামড়া। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সীমানা শুরু সেই পিলারের নিচেই পচতে শুরু করেছে। চট্টগ্রাম : চসিকের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উত্তর জোনের মনিটরিং টিমের প্রধান ও ৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোবারক আলী বলেন, ‘আতুরার ডিপো, মুরাদপুর রোড ও বহদ্দারহাট মোড়ে অসংখ্য চামড়া পড়ে আছে। বহদ্দারহাট মোড় থেকে চার ট্রাক, আতুরার ডিপো ও মুরাদপুর এলাকা থেকে প্রায় ৭০ ট্রাক চামড়া অপসারণ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় এক লাখ চামড়া নষ্ট হয়েছে। এসব চামড়া নগরীর হালিশহর এবং বায়েজিদ আরেফিন নগর এলাকায় চসিকের নির্ধারিত স্থানে গর্ত করে পুঁতে ফেলা হবে।’ সুনামগঞ্জ : জেলার জগন্নাথপুর  উপজেলায় বিক্রি করতে না পেরে মাদ্রাসায় দান করা ৯০০ কোরবানির পশুর চামড়া মাটির নিচে পুঁতে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। সাভার : কোরবানির পশুর চামড়া রাস্তায় পচে নষ্ট হচ্ছে। এক ট্রাক চামড়া বিক্রি করা হয় ৫ হাজার টাকা। এ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। সিন্ডিকেট করে ফায়দা লুটছেন সাভারে হেমায়েতপুর আড়তদার ও ট্যানারি মালিকরা। রংপুর : ট্যানারি মালিকদের দু-একজন প্রতিনিধি ছাড়া চামড়া কেনার জন্য বড় বড় ট্যানারির কোনো প্রতিনিধি রংপুরের চামড়া পট্টিতে আসেননি। খুলনা : খুলনায় এবার পানির দামে বিক্রি হয়েছে কোরবানির পশুর চামড়া। বড় আকারের গরুর চামড়া ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায় ও ছোট গরুর চামড়া ১০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে এ দামেও চামড়া কেনার মতো ক্রেতা খুঁজে পাওয়া যায়নি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া : চামড়ার বাজার মূল্যে ধস নামায় মাথায় হাত পড়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার চামড়া ব্যবসায়ীদের। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা। মৌলভীবাজার : চামড়া প্রতি ১৫ টাকা দামে বিক্রি না করে তা নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছেন মৌলভীবাজার টাউন কামিল মাদ্রাসার এক ছাত্র। ঠ্যালা বোঝাই কয়েক শত চামড়া নদীতে ফেলে দেওয়ার এ রকম একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে ফেসবুকে।

নওগাঁ : নওগাঁয় কোরবানি পশুর চামড়া কিনে লোকসানে পড়েছেন ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা। বগুড়া : রাত বাড়ছে আর চামড়ার দাম কমছে, এ অবস্থায় শেষ পর্যন্ত চামড়ার বাজার নামতে নামতে কোথায় গিয়ে ঠেকে তা বলতে পারছে না সংশ্লিষ্টরা। রাজশাহী : রাজশাহীতে এবার পানির দরে কোরবানি পশুর চামড়া বিক্রি হয়েছে। আকারভেদে গরুর চামড়া একশ থেকে চারশ টাকা এবং ছাগলের চামড়া ১০ থেকে ২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত তিন দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন চামড়ার দাম এটি।

দিনাজপুর : ঢাকার বিভিন্ন ট্যানারিমালিকদের কাছ থেকে পাওনা টাকা না পাওয়া, শ্রমিক ও লবণের মূল্য দ্বিগুণ এবং চামড়া বিক্রি নিয়ে দিনাজপুরে চামড়া ব্যবসায়ে ব্যাপক দরপতন ও ধস। ছাগলের চামড়া কেউ কিনছে না। কারণ পরিবহনসহ লবণজাত করতে যে খরচ, বিক্রি করে তা উঠবে না। কুমিল্লা : কুমিল্লায় এ বছর পশুর চামড়া নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করতে হয়েছে। ঈদের দিন ও পরের দিন ক্রেতা না থাকায় কাক্সিক্ষত মূল্য পাননি বিক্রেতারা। এতে ক্ষোভে ফেটে পড়েন তারা। একশ থেকে দুইশ টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে চামড়া। ক্ষোভে কেউ চামড়া মাটিতে পুঁতলেন- কেউ গোমতী নদীতে চামড়া ফেলে দেন।


আপনার মন্তব্য