Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০৫

অবহেলায় নষ্ট জব্দ গাড়ি

আদালত ও থানায় একবার ডাম্পিং হলে চিরতরে শেষ, অনেক সময় ফেরত নিতে আসে না কেউ, বংশবিস্তার ঘটছে মশার

আলী আজম ও মাহবুব মমতাজী

অবহেলায় নষ্ট জব্দ গাড়ি
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে শেরেবাংলানগরে ডাম্পিংয়ে রাখা গাড়ি -বাংলাদেশ প্রতিদিন

ধুলায় ধূসরিত শত শত যানবাহন। কোনোটির আসন নেই, কোনোটির নেই দরজা। চাকা বসে গেছে, কোনোটির আবার গ্লাস উধাও। আবার কোনোটির শুধু কাঠামো পড়ে আছে। কোনো কোনো গাড়ির ভিতরেই জন্মেছে গাছ। এমন চিত্র রাজধানীর শেরেবাংলানগরের আগারগাঁও ও তালতলায় ডাম্পিং করা যানবাহনের। মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার, বাস, মাইক্রোবাস, পিকআপ ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা বছরের পর বছর খোলা আকাশের নিচে পড়ে রয়েছে। রোদে পুড়ছে, বৃষ্টিতে ভিজছে। চুরি হচ্ছে যন্ত্রাংশ। হারাচ্ছে ব্যবহারের উপযোগিতা। নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি টাকার সম্পদ। একই চিত্র রাজধানীর প্রতিটি থানা ও আদালত প্রাঙ্গণে। হাজার কোটি টাকার যানবাহন অযত্ন-অবহেলায় খোলা আকাশের নিচে পড়ে রয়েছে। ভাঙাচোরা এসব গাড়ির স্তূপের কারণে থানাগুলো যেন এখন একেকটি ময়লার ভাগাড়। শুধু তাই নয়, পানি জমে এডিস মশা তৈরির কারখানায় পরিণত হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মামলা হওয়ার পর আলামত  হিসেবে যানবাহন আটকে রাখা হয়। এর মধ্যে কিছু যানবাহন আদালতের নির্দেশে মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপেক্ষা করতে হয় মামলা নিষ্পত্তি পর্যন্ত। আর মামলার দীর্ঘসূত্রতাই আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা। মামলা নিষ্পত্তি হতে লাগে ১০ থেকে ১২ বছর। এরপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আদালত হয় গাড়ি মালিকের কাছে ফিরিয়ে দিতে বলে, না হয় নিলামে বিক্রির আদেশ দেয়। এদিকে নিলামে বিক্রির প্রক্রিয়াও বেশ জটিল ও সময়সাপেক্ষ। তত দিনে যানবাহনগুলো এতটাই করুণ দশায় উপনীত হয় যে, তা শেষ পর্যন্ত ভাঙাড়ির দোকানে বিক্রি করা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। আইন ভঙ্গ কিংবা মামলার আলামত হিসেবে দিনে গড়ে ২০ থেকে ৩০টি গাড়ি আসে ডাম্পিং স্টেশনে। এখানে দীর্ঘদিন পড়ে থাকা মোটরসাইকেলের সংখ্যা বেশি; যার অধিকাংশই নম্বরবিহীন। বছরের পর বছর জব্দ করা গাড়ি পড়ে থেকে নষ্ট হলেও এসব গাড়ি রক্ষায় কারও কোনো উদ্যোগ নেই। ডাম্পিং স্টেশন : আগারগাঁও তালতলা ছাড়াও রাজধানীতে জব্দ করা গাড়ি রাখার জন্য বেশ কয়েকটি ডাম্পিং স্টেশন রয়েছে। কিন্তু সেগুলোয় স্থানসংকুলান না হওয়ায় বাধ্য হয়ে থানা প্রাঙ্গণেও জব্দ যানবাহন রাখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। ডাম্পিং স্টেশনের বাইরেও তালতলার সড়কের ওপর রাখা হয়েছে জব্দ যানবাহন। ফলে সড়ক সংকুচিত হচ্ছে। অভিযোগ পাওয়া যায়, এসব ডাম্পিং স্টেশনে কয়েক হাজার টাকা হাতে গুঁজে দিলেই মিলে যায় দামি দামি গাড়ির খুচরা যন্ত্রাংশ। এক থেকে দেড় হাজার টাকায় পাওয়া যায় টায়ার। আর ২০০ টাকায় মেলে ব্রেক শু। আড়াই হাজার টাকায় বিক্রি হয় গাড়ির সাউন্ড সিস্টেম। সরেজমিন দেখা যায়, আগারগাঁও তালতলার ডাম্পিং স্টেশনটি রাস্তার ওপরই। দুই লেনবিশিষ্ট রাস্তার একপাশের পুরোটাই ডাম্পিং স্টেশন। রাস্তার ওপর গাড়ি রাখায় ব্যাহত হচ্ছে যান চলা। বছরের পর বছর পড়ে থাকা গাড়ির গা বেয়ে জন্মেছে বিভিন্ন ধরনের গাছ। রিকশা থেকে শুরু করে বড় ট্রাক, সব ধরনের যানবাহনই রয়েছে এ ডাম্পিং স্টেশনে। ট্রাফিক আইনে আটক অধিকাংশ গাড়ি মালিক বা চালক এসে নিয়ে গেলেও থেকে যায় বিভিন্ন থানা থেকে আসা মামলার আলামতগুলো। সরকারি সংগীত কলেজের সামনে কথা হয় শফিক নামে একজনের সঙ্গে। তিনি বিজ্ঞান জাদুঘরের সামনে ডাব বিক্রি করেন। এই প্রতিবেদককে জানালেন, ‘সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে ডাম্পিং স্টেশনে চুরি করা যন্ত্রাংশের হাট বসে। তবে বেশি চুরি হয় লুকিং গ্লাস ও ভিতরে থাকা সাউন্ড সিস্টেম। আশপাশে কয়েকজন লোক আছে যারা ডাম্পিং স্টেশনে আসা যানবাহনের যন্ত্রাংশ খুলে বিক্রির সঙ্গে জড়িত।’ আগারগাঁও ডাম্পিং স্টেশনে দায়িত্বরত মজিবর রহমান নামে এক কনস্টেবল জানান, ‘আগারগাঁও ডাম্পিংয়ে এখন কম গাড়ি রাখা হয়। এখানে অফিশিয়াল কাজ চলে। বেশির ভাগ গাড়ি রাখা হয় তালতলা, দারুসসালাম ও গাবতলী ডাম্পিং স্টেশনে। আগে তো আগারগাঁওয়ে গাড়ির মধ্যে অনেক গাছপালা গজিয়েছিল, কাদামাটিতে নালা হয়ে গিয়েছিল। ওইসব গাছপালা কেটে পরিষ্কার করা হয়েছে।’ থানা যেন ডাম্পিং জোন : রাজধানীর প্রতিটি থানা এখন ডাম্পিং জোনে পরিণত হয়েছে। যাত্রাবাড়ী, শ্যামপুর, কদমতলী, মিরপুর, পল্লবী, শাহআলী, কাফরুল, তুরাগ, দক্ষিণখান, উত্তরা-পূর্ব, তেজগাঁও, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, মোহাম্মদপুর, পল্টন, বাড্ডাসহ ঢাকা মহানগরীর বেশ কয়েকটি থানা ঘুরে বহু জরাজীর্ণ গাড়ি দেখা গেছে। লতাপাতা ও ময়লা-আবর্জনায় ঢেকে আছে গাড়িগুলো। অনেক গাড়ির আয়না, ব্যাটারি, লাইট, বিভিন্ন যন্ত্রপাতি দেখা যায়নি। কোনোটির সিট নেই, কোনোটির দরজা নেই, নম্বর প্লেট নেই, চাকা নেই, আবার গ্লাস নেই, কোনোটির শুধু বডি পড়ে আছে। বেশির ভাগ গাড়িতে মরচে পড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। এগুলো এতটাই বেহাল ও ভাঙাচোরা যে ভাঙাড়ি হিসেবে বিক্রিরও অযোগ্য। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, এর নেপথ্য রয়েছে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া, মালিককে খুঁজে না পাওয়া, খুঁজে পেলেও বেশি রকম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ফেরত নিতে গাড়ি মালিকদের অনীহা। তারা এও বলছেন, এর ফলে সম্পদের ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে নষ্ট হচ্ছে থানার সৌন্দর্য ও পরিবেশ। বড় সমস্যা হলো, থানা প্রাঙ্গণের বিশাল একটা জায়গা গাড়িগুলোর দখলে থাকায় পুলিশের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটছে। গাড়ি কিংবা এর কোনো অংশ যাতে খোয়া না যায় তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন বাড়তি নজরদারি। সব মিলিয়ে গাড়িগুলো এখন সব থানার জন্যই কমবেশি বোঝা। জানা গেছে, মামলা-হামলা, দুর্ঘটনা, মাদক পরিবহন, অবৈধ মাল বহনসহ বিভিন্ন অভিযোগে বাইক, ট্রাক, প্রাইভেট কার, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, মাইক্রোবাসসহ বিভিন্ন ধরনের গাড়ি জব্দ করে পুলিশ। মামলা শুরু থেকে নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত থানাগুলোয় খোলা আকাশের নিচে রোদ-বৃষ্টি-ঝড়ে অযতেœ পড়ে থাকে এসব জব্দ গাড়ি। একপর্যায়ে তা ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে যায়। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উপকমিশনার (মিডিয়া) মো. মাসুদুর রহমান জানান, থানায় পড়ে থাকা গাড়িগুলো আলামতের গাড়ি। আদালতের নির্দেশে এসব আলামতের গাড়ির নিষ্পত্তি করা হয়। আদালত প্রাঙ্গণ : পুরান ঢাকার আদালত প্রাঙ্গণ ভাঙা যানবাহনের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। ঢাকা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনের খোলা জায়গায় অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে গাড়িগুলো। মোটরসাইকেল, রিকশা, রিকশাভ্যানসহ বিভিন্ন যানবাহনই বিচারাধীন বিভিন্ন মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত। মামলার দীর্ঘসূত্রতায় বছরের পর বছর পড়ে থেকে সঠিক সংরক্ষণের অভাবে এমন হাল এসব গাড়ির। মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় এসব আলামত ধ্বংস বা কোনো গতি করা যাচ্ছে না। এ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ঢাকা মহানগর আদালতের একজন কর্মকর্তা জানান, মামলা প্রমাণের জন্য আলামত একটি উপাদান। জায়গার অভাবে সঠিকভাবে গাড়ি সংরক্ষণ করা যাচ্ছে না। মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় তারা আলামত ধ্বংস করতে পারছেন না। জানা গেছে, পুলিশ মামলায় জব্দ করা জিনিস আলামত হিসেবে দাখিল করে। এসব আলামত পাঠানো হয় আদালতের মালখানায়। রায় না হওয়া পর্যন্ত আলামত মালখানায় থাকে। ঢাকার আদালতের মালখানা দুটি। একটি জেলা মালখানা, অন্যটি মহানগর মালখানা। মহানগর মালখানা পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণ এ চার ভাগে বিভক্ত। জেলা মালখানা ঢাকার কালেক্টরেট ভবনের নিচতলায় এবং মহানগর মালখানা মুখ্য মহানগর হাকিম (সিএমএম) আদালতের ভূতলে। টাকা, অস্ত্র ও ছোট অন্যান্য আলামত মালখানার ভিতরেই রাখা হয়। এ দুই মালখানায় জায়গা না থাকায় যানবাহনের মতো আলামত রাখা হচ্ছে বাইরে। আলামত জমতে জমতে ঢাকা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে বিচারিক হাকিম আদালতের সামনের চত্বর পর্যন্ত ছড়িয়েছে। রোদ-বৃষ্টিতে নষ্ট হচ্ছে এসব আলামত। সরেজমিনে দেখা যায়, পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে স্তূপাকারে ও ধুলায় ডুবে থাকা যানগুলো দেখে চেনার উপায় নেই। অযত্ন-অবহেলায় আলামতের এমন চেহারা হয়েছে যে তা শনাক্ত করতে পুলিশকেও গলদঘর্ম হতে হয়। সংরক্ষণের সঠিক ব্যবস্থা না থাকায় যানগুলোর ভিতরের অধিকাংশ যন্ত্রপাতি খোয়া গেছে। মালখানা কর্তৃপক্ষের দেওয়া নম্বরও মুছে গেছে অনেক আলামত থেকে। অনেক আলামতের ওপর আগাছা জন্মেছে।


আপনার মন্তব্য