শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ৮ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ৭ নভেম্বর, ২০১৯ ২৩:৩৮

খোকার জানাজায় শোকার্ত মানুষের ঢল

সব দলের অংশগ্রহণ, জুরাইনে দাফন

নিজস্ব প্রতিবেদক

খোকার জানাজায় শোকার্ত মানুষের ঢল

রাজধানীতে পাঁচ দফা জানাজা শেষে গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র সাদেক হোসেন খোকাকে জুরাইনে তার বাবা-মায়ের কবরের পাশে শায়িত করা হয়। বিএনপির এই ভাইস চেয়ারম্যানের জানাজায় সর্বস্তরের মানুষের ঢল নামে। দলমতনির্বিশেষে সবাই তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানান। রাজধানীতে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা, নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়, দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নগর ভবন, ক্লাব ব্রাদার্স ইউনিয়নে এবং সর্বশেষ ধূপখোলা মাঠে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন সর্বস্তরের মানুষ। পরে জুরাইনে পারিবারিক কবরস্থানে খোকার লাশ শায়িত করা হয়। নগর ভবনের জানাজা শেষে গোপীবাগের বাসায় মরহুমের কফিন কিছুক্ষণ রাখা হয়।

এদিকে খোকার লাশ কবরে নামানোর আগে এই গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা কামান্ডারকে পুলিশের ১৭ সদস্যের একটি চৌকস দল ঢাকা জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার আবদুল আউয়ালের নেতৃত্বে রাষ্ট্রীয় সালাম জানান। তারা এই মুক্তিযোদ্ধাকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন। রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষ থেকে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমানের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা স্যালুট জানান। এ সময় পুলিশের এডিসি নাজমুন নাহারসহ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। কবরস্থানের সামনের দিকে তার মা সালেহা খাতুন ও বাবা এম এ করীমের কবর রয়েছে।

এ সময় মরহুমের পরিবারের সদস্য ছাড়াও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, মহানগরী দক্ষিণের সভাপতি হাবিব-উন-নবী খান সোহেলসহ দল ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মী এবং আত্মীয়স্বজন উপস্থিত ছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে একটি ক্যান্সার হাসপাতালে সোমবার মারা যান সাদেক হোসেন খোকা। গতকাল সকাল সাড়ে ৮টায় ঢাকা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে খোকার লাশ এসে পৌঁছায়। খোকার কফিনের সঙ্গে তার স্ত্রী ইসমত হোসেন, ছেলে প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন ও ইশফাক হোসেন, মেয়ে সারিকা সাদেক, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুস সালামসহ স্বজনরা আসেন।

বিমানবন্দরে মরহুমের লাশ গ্রহণ করেন বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। এ সময় বিএনপি নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, মেজর (অব.) কামরুল ইসলাম, আতাউর রহমান ঢালী, খায়রুল কবির খোকন, ফজলুল হক মিলন, শামা ওবায়েদ, কামরুজ্জামান রতন, নাজিমউদ্দিন আলম, তাবিথ আউয়াল, বজলুল বাসিত আনজু, নবী-উল্লাহ নবী, এস এম জাহাঙ্গীর, শায়রুল কবির খান, শামসুদ্দিন দিদার প্রমুখ।

এরপর বিমানবন্দর থেকে খোকার লাশ নিয়ে যাওয়া হয় জাতীয় সংসদ ভবনে। বেলা ১১টার দিকে সংসদে অনুষ্ঠিত জানাজায় বিএনপি ছাড়াও আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, বিএনপি, ওয়ার্কার্স পার্টি, বিকল্পধারা, এলডিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী এবং সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অংশ নেন। পরিবারের পক্ষে খোকার ছেলে প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন জানাজার আগে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বলেন, ‘সব দলের নেতা-কর্মীরা আমার বাবার জানাজায় অংশ নিয়েছেন। এতে প্রমাণ হয় তিনি সর্বজনীন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন। তিনি ট্রাভেল ডকুমেন্ট নিয়ে দেশে ফিরেছেন। বাংলাদেশের পাসপোর্ট তিনি পাননি। এটা তার জীবনের আক্ষেপ ছিল। তিনি বাংলাদেশে তার শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করতে পারেননি।’

সংসদ চত্বরে জানাজায় অংশ নিতে এসে আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা তোফায়েল আহমেদ মুক্তিযুদ্ধে খোকার অবদানের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও ব্যক্তিজীবনে তিনি চমৎকার মানুষ ছিলেন। বিনয়ী ও মার্জিত আচরণের ব্যক্তি ছিলেন। ব্যক্তিজীবনে আমাদের প্রত্যেক্যের ত্রুটি রয়েছে। সাদেক হোসেন খোকা মানুষ হিসেবে ছিলেন অমায়িক ও ভদ্র।’

জানাজা শেষে বিরোধীদলীয় নেতার পক্ষে খোকার কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মসিউর রহমান রাঙ্গা। এ ছাড়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের পক্ষে মেয়র আতিকুল ইসলাম, এলডিপি চেয়ারম্যান অলি আহমদ, বিএনপির সংসদ সদস্যরা কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। এ ছাড়া বিএনপির পক্ষ থেকেও কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়।

জানাজায় আরও অংশ নেন বিকল্পধারার প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, কৃষক-শ্রমিক-জনতা লীগ সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, বিএনপি নেতাদের মধ্যে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ড. আবদুল মঈন খান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, মোরশেদ খান, আবদুল্লাহ আল নোমান, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ, বরকত উল্লা বুলু, জয়নুল আবদীন ফারুক, গোলাম আকবর খোন্দকার, আবুল খায়ের ভূঁইয়া, হাবিবুর রহমান হাবিব, জাফরুল ইসলাম চৌধুরী, মিজানুর রহমান সিনহা, অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান, নাজিম উদ্দিন আলম, উকিল আবদুস সাত্তার এমপি, জি এম সিরাজ এমপি, হারুনুর রশীদ এমপি, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী প্রমুখ।

আওয়ামী লীগের তোফায়েল আহমেদ ছাড়াও সাবের হোসেন চৌধুরী, আ স ম ফিরোজ, শামসুল হক টুকু, হাজী সেলিম, ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন এমপি, জাতীয় পার্টির রুহুল আমিন হাওলাদার, কাজী ফিরোজ রশীদ, ফখরুল ইমাম, বিকল্পধারার মেজর (অব.) আবদুল মান্নান, কল্যাণ পার্টির মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহ উদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ প্রমুখ জানাজায় অংশ নেন।

জাতীয় সংসদ চত্বরে জানাজার পর খোকার লাশবাহী গাড়ি নিয়ে যাওয়া হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সেখানে বেলা ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত তার লাশ রাখা হয় সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য। সেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পাশাপাশি অনেকে ব্যক্তিগতভাবে তার কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। সংগঠনের মধ্যে সিপিবি, গণফোরাম, এলডিপি, মনোবিজ্ঞান অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন, জাগপা, জাতীয়তাবাদী মহিলা দল, তাঁতী দল, নাগরিক ঐক্য, বাংলাদেশ জাসদ, বাসদ, জাতীয় হিন্দু মহাজোট, ঋষিজ শিল্পী গোষ্ঠী, ছাত্র ইউনিয়ন, গণসংহতি আন্দোলন, জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল ও বাংলাদেশ যুব সমিতির নেতারা শ্রদ্ধা জানান।

এ সময় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, সিপিবির মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, বাসদের খালেকুজ্জামান, নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, গণফোরামের অধ্যাপক আবু সাইয়িদ ও সুব্রত চৌধুরী, জেএসডির আবদুল মালেক রতন, জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের ইশতিয়াক আজিজ উলফাত, সাদেক আহমেদ খান, শিল্পী ফকির আলমগীর, জাসাসের অধ্যাপক মামুন আহমেদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

সাদেক হোসেন খোকার দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয় নয়াপল্টনে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে বাদ জোহর। এর আগে দলের ভাইস চেয়ারম্যানের লাশ দলীয় পতাকা ও ফুল দিয়ে বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা শেষ শ্রদ্ধা জানান। প্রথমে দলের পক্ষে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় প্রয়াত খোকার কফিন দলীয় পতাকায় ঢেকে দিয়ে তার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে কারাবন্দী চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষ থেকে নেতারা তার কফিনে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এ সময় কফিনের সামনে খোকার দুই ছেলে ইশরাক হোসেন ও ইশফাক হোসেন দাঁড়িয়ে ছিলেন।

খোকার কফিন নয়াপল্টনে কালো কাপড়ে তৈরি অস্থায়ী মঞ্চে রাখা হয়। এ সময় নেতা-কর্মীদের কফিনের সামনে গুমরে কাঁদতে দেখা যায়। বিএনপি মহাসচিবসহ নেতাদেরও অনেককে অশ্রুসিক্ত দেখাচ্ছিল। জানাজার পর মুক্তিযোদ্ধা খোকার কফিনে স্যালুট জানান জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধারা। এর মধ্যে ছিলেন সেক্টর কমান্ডার শাহজাহান ওমরসহ মুক্তিযোদ্ধারা। এ সময় জাতীয় পতাকা দিয়ে তার কফিন ঢেকে দেওয়া হয়।

এ জানাজায় বিএনপি নেতাদের মধ্যে শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, জয়নুল আবেদীন, আহমেদ আজম খান, অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, মো. শাহজাহান, শামসুজ্জামান দুদু, রুহুল কবির রিজভী, শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, সাইফুল আলম নীরব, সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, শফিউল বারী বাবু, আবদুল কাদের ভূঁইয়া জুয়েল, ফজলুর রহমান খোকন, ইকবাল হোসেন শ্যামল প্রমুখ অংশ নেন। ২০-দলীয় জোটের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, হামিদুর রহমান আযাদ, শামীম সাঈদী, জাগপার খোন্দকার লুৎফর রহমান, ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, মোস্তাফিজুর রহমান ইরান প্রমুখ জানাজায় অংশ নেন।

নয়াপল্টন কার্যালয় থেকে ফকিরাপুল মোড় পর্যন্ত সড়ক ও আশপাশ গলিতে হাজার হাজার নেতা-কর্মী-সমর্থক এ জানাজায় অংশ নিতে দাঁড়ান। পুরো নয়াপল্টন এলাকা কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। জানাজা যখন হচ্ছিল তখন কার্যালয়ের সামনে ফুটপাথে দাঁড়িয়ে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীরা মাথা নিচু করে তাদের প্রিয় নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এদিকে সকাল ৮টা থেকেই নয়াপল্টন কার্যালয়ের নিচতলায় কোরআনখানি অনুষ্ঠিত হয়। দলের হাজার হাজার নেতা-কর্মী-সমর্থকের উদ্দেশে খোকার বড় ছেলে প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন পরিবারের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং তার বাবার আত্মার মাগফিরাতের জন্য দোয়া চান।

বিএনপি কার্যালয় থেকে কফিন নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নগর ভবনে। সেখান জানাজায় অংশ নেন দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকনসহ কাউন্সিলর ও সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এরপর সাদেক হোসেন খোকার লাশ নিয়ে আসা হয় তার প্রিয় ক্লাব ব্রাদার্স ইউনিয়নে। সেখানে কিছুক্ষণ রাখার পর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে কফিন গোপীবাগে পৈতৃক বাসভবনে স্বজনদের দেখানোর জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে বাদ আসর ধূপখোলা মাঠে সর্বশেষ জানাজার পর জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয় বীর এই গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাকে।


আপনার মন্তব্য