শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ ২৩:৩৭

ভারতের নাগরিকত্ব আইন

জ্বলছে পশ্চিমবঙ্গ দিল্লি সহিংসতা অব্যাহত

নয়াদিল্লি ও কলকাতা প্রতিনিধি

জ্বলছে পশ্চিমবঙ্গ দিল্লি সহিংসতা অব্যাহত

নাগরিকত্ব আইন ইস্যুতে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। সহিংসতা শুরু হয়েছে দিল্লিতেও। গতকাল সকাল থেকে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষিপ্ত সহিংসতা হয়। কোথাও টায়ার জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ, কোথাও আবার রেলস্টেশনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। রাজ্যটির রাজ্যপাল, মুখ্যমন্ত্রী বা বিদ্বজ্জনেরা শান্তি-শৃঙ্খলার বার্তা দিলেও আন্দোলনকারীরা তাদের অবস্থানে অনড়। এদিন সকালে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার সাগরদীঘি থানার সেখদীঘির ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ দেখানো হয়। ওই জেলারই বহরমপুর থানার বৈরাগীপাড়া মোড়ে বিজেপি পার্টি অফিসে আগুন লাগানোর অভিযোগ উঠেছে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে। সুতি থানার বিভিন্ন এলাকায় লুটপাট, বাড়িঘর ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। জঙ্গিপুর-লালগোলা রাজ্য সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে চলে অবরোধ। বীরভূম জেলার মুরারই থেকে মুর্শিদাবাদের রঘুনাথগঞ্জগামী রাজ্য সড়কের ওপর এবং বিলাসনগর মোড়ে টায়ার জ্বালিয়ে অবরোধ চলে। অবরোধ থেকেই এনআরসি, মোদি-অমিত শাহবিরোধী স্লোগান দেওয়া হয়। উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার আমডাঙ্গায় ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কে সোনাডাঙ্গা ও ধানকল মোড়ে রাস্তা অবরোধ করেন আন্দোলনকারীরা। প্রথমে রাস্তায় গাছের গুঁড়ি ফেলে সড়ক অবরোধ করা হয়। পরে সেই গুঁড়ি জ্বালানো হয়। আমডাঙ্গার কামদেবপুর মোড়ে ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কে রাস্তা আটকে সেখানেই শুরু হয়ে যায় পিকনিক। সবজি কাটা থেকে শুরু করে রান্না- সবকিছুই চলে রাস্তার ওপর। এ ছাড়া এ জেলার খড়দহ, দেগঙ্গাসহ একাধিক জায়গায় সড়ক আটকে বিক্ষোভ দেখানো হয়। মালদহ জেলার হরিশচন্দ্রপুর থানার ভালুকা রোড রেলস্টেশনে বিক্ষোভ হয়। প্রথমে কয়েক হাজার মানুষ স্টেশনে প্রবেশ করে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ দেখায়। পরে আচমকাই ভালুকা রেল রোড স্টেশনে অগ্নিসংযোগ ঘটায়। বিক্ষোভকারীদের লাগানো আগুনে ভস্মীভূত হয়ে গেছে স্টেশনটি। পুড়ে গেছে টিকিট কাউন্টার, যাত্রীদের বসার জায়গা, শৌচাগার। ঘটনাস্থলে বিশাল পুলিশ বাহিনী পৌঁছলেও তারা ছিল নীরব দর্শক। এ ঘটনায় উত্তরবঙ্গের সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের ট্রেন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার একাধিক জায়গায় ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেসের তরফে প্রতিবাদ মিছিল বের করা হয়। এই জেলার ক্যানিং এলাকায় যুব তৃণমূলের জেলা সভাপতি শওকত মোল্লার নেতৃত্বে ওই মিছিলে অংশ নেন বিপুলসংখ্যক কর্মী-সমর্থক। নাগরিকত্ব নিয়ে হাওড়া জেলার শিবপুর ট্রাম ডিপো থেকে হাওড়া ময়দান পর্যন্ত মিছিল করেন তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকরা। মিছিলে অংশ নেন রাজ্যের মন্ত্রী অরূপ রায়সহ জেলার শীর্ষস্থানীয় তৃণমূল নেতারা। বর্ধমান জেলার দুর্গাপুরের বেনাচিতি বাজার এলাকায় কংগ্রেসের তরফে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনবিরোধী মিছিল বের করা হয়। মিছিল থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম কমানোর দাবিও জানানো হয়। মিছিল বের হয় হুগলি জেলাতেও। শান্তি-শৃঙ্খলার অবনতি ও গুজব যাতে ছড়াতে না পারে কেউ এ জন্য গতকাল দুুপুর থেকে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুর, মুর্শিদাবাদ, মালদহ, হাওড়া, উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার কিছু জায়গায় ইন্টারনেট পরিষেবা সাময়িক বন্ধ রাখা হয়েছে। এদিকে আসামে নিহতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৩ জন। শনিবার সন্ধ্যায় গুয়াহাটি মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক বিক্ষোভকারীর মৃত্যু হয়। তবে শনিবারের মতো গতকালও গুয়াহাটি, ডিব্রুগড়সহ একাধিক জায়গায় কারফিউ শিথিল করা হয়েছে। অল্প সংখ্যায় হলেও রাস্তায় গাড়ি চলাচল শুরু হয়েছে। তবে অশান্তি ও গুজবের আশঙ্কায় ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ইন্টারনেট পরিষেবা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত সপ্তাহে দেশটির সংসদে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল পাস হলে তাতে রাষ্ট্রপতি স্বাক্ষর করার পর থেকে সবচেয়ে বেশি উত্তাল হয়ে ওঠে উত্তর-পূর্ব ভারতের আসাম রাজ্য। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ বাধে পুলিশের। সহিংসতায় এখন পর্যন্ত ২৭ জন আহত হয়েছেন।

বিজেপি সভাপতির যত অভিযোগ : এদিকে গতকাল কলকাতায় বিজেপি রাজ্য দফতরে এক সংবাদ সম্মেলন করে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সভাপতি দিলীপ ঘোষ বলেছেন, ‘বাংলাদেশি মুসলিমরা যেভাবে রাস্তায় নেমে ব্যাপক সহিংসতা ও সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস করছে- সেটা নজিরবিহীন। আরও মজার ব্যাপার এখানকার রাজ্য সরকার হাতে হাত দিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখছে। মুখ্যমন্ত্রী মিষ্টি মিষ্টি বাণী দিচ্ছেন।’ তবে ‘ভারতের মুসলিমদের আইন নিয়ে চিন্তার কোনো কারণ নেই’ উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘ভারতবর্ষের মুসলিমদের চিন্তা করার কোনো কারণ নেই। তারা এখানে আছেন, থাকবেন। তারা এখানকার নাগরিক। কিন্তু যারা বাংলাদেশ থেকে এখানে ঢুকেছেন, তৃণমূল-সিপিআইএম-কংগ্রেসকে ভোট দিয়েছেন,  মমতা ব্যানার্জি যাদের জন্য তাবেদারি করছেন- সেই সব বাংলাদেশি মুসলিমরাই এখানে উৎপাত করছে। তারা দাঙ্গার পরিবেশ তৈরির পরিকল্পনা করছে, এটা বন্ধ হওয়ার দরকার আছে।’

আইন সংশোধনের ইঙ্গিত অমিতের : প্রয়োজন হলে নাগরিকত্ব সংশোধন আইনে কিছু পরিবর্তন আনার ইঙ্গিত দিয়েছেন ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। বিলটি আইনে পরিণত হওয়ার পর গতকাল ঝাড়খ- রাজ্যের গিরিদিহ’তে এক র‌্যালিতে এ নিয়ে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর উদ্বেগের বিষয় মাথায় রেখে এই আইনের ধারাগুলোতে কিছুটা পরিবর্তন আনা যেতে পারে।

অনশনে কেরালার মুখ্যমন্ত্রী : বিতর্কিত নাগরিকত্ব (সংশোধিত) আইনের প্রতিবাদে অনশনে বসছেন কেরালার মুখ্যমন্ত্রী ও সিপিএম নেতা পিনারাই বিজয়ন। কেরালা সিপিএম জানিয়েছে, সোমবার মুখ্যমন্ত্রী, কেরালা সিপিএম ও কয়েকটি অবিজেপি জাতীয় দলের নেতৃত্ব তিরবনন্তপুরমের পালায়মের শহীদ মিনারের কাছে অনশনে বসছেন। দলের নেতারা বলছেন, বিক্ষোভের নামে ধ্বংসাত্মক কাজকর্ম এড়াতেই অনশনের মতো কর্মসূচি  বেছে নেওয়া হয়েছে। এটা ছাড়া বিজেপিকে ঠেকানোর আর কোনো উপায় নেই।

পিনারাইয়ের এই অনশন কর্মসূচি যদি সফল হয় তাহলে সিপিএমের অন্যান্য রাজ্যও এই উপায় অবলম্বন করবে বলে জানা গেছে।


আপনার মন্তব্য