শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ২৩:৪৮

চীনা পণ্য আমদানি কমেছে মোংলায়

নতুন করে পণ্যের অর্ডার দিতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা

সামছুজ্জামান শাহীন, খুলনা

করোনাভাইরাসের কারণে চীনের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলে আমদানিনির্ভর পণ্যে ধস নামতে শুরু করেছে। বাজারে এরই মধ্যে গার্মেন্ট কাপড়, ইলেকট্রনিক্স পণ্য ও হার্ডওয়্যার খুচরা যন্ত্রাংশের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ব্যবসায়ীরা নতুন করে পণ্যের অর্ডার দিতে পারছেন না। গত দুই মাস আগেও যেসব পণ্যের চাহিদা দেওয়া হয়েছে তার বিপরীতে ব্যাংকগুলোতেও এলসি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

আমদানিকারকরা বলছেন, চীনের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ থাকায় দক্ষিণাঞ্চলে চীনের আমদানি করা পণ্যের চাহিদা অস্বাভাবিক বেড়েছে। এতে বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। জানা যায়, বাংলাদেশ প্রতি বছর যে পরিমাণ পণ্য আমদানি করে তার ৩৫ শতাংশই আসে চীন থেকে। সমুদ্রপথে এসব পণ্যের অধিকাংশই চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর দিয়ে আনা হয়। আমদানিকৃত পণ্যের মধ্যে রয়েছে, সুতা, গার্মেন্ট কাপড়, চিকিৎসা সরঞ্জাম, পণ্যের কাঁচামাল, ইলেকট্রনিক্স পণ্য ও হার্ডওয়ার খুচরা যন্ত্রাংশ। এ ছাড়া রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, খুলনা ওয়াসার পানি সরবরাহ প্রকল্পসহ কয়েকটি মেগা প্রকল্পে ব্যবহৃত যন্ত্রাংশও চীন থেকে আনা হয়। করোনাভাইরাসের কারণে এসব প্রকল্পের কাজ সময়মতো শেষ হবে কিনা এ নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। মোংলা বন্দরের হারবার মাস্টার কমান্ডার শেখ ফখরউদ্দিন জানান, গত ৩০ জানুয়ারি সর্বশেষ চীনের সাংহাই থেকে তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পের যন্ত্রাংশ নিয়ে চীনা জাহাজ এমভি লি এয়ারবাক বন্দরে এসেছে। এর বাইরে কনটেইনারে ইলেকট্রনিক্স পণ্য, হার্ডওয়্যার ও খুচরা যন্ত্রাংশ এই বন্দর দিয়ে আমদানি করা হয়। তিনি বলেন, করোনাভাইরাসের সতর্কতায় বন্দরের নিরাপত্তা গেটে মোবাইল লেজার ডিটেক্টর স্থাপন করা হয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সতর্কতার পাশাপাশি সংক্রমণ প্রতিরোধ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে ছয় সদস্যের কমিটি রয়েছে। সন্দেহজনক রোগীকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার জন্য সার্বক্ষণিক অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত রাখা হয়েছে। চীন থেকে ইলেকট্রনিক্স খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানিকারক খুলনা পার্টস হাউসের মালিক এস এম ইয়াছীন আলী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, চীনে প্রবেশের জন্য ভিসার আবেদন নেওয়া বন্ধ রয়েছে। ফলে শিপমেন্টের সময় ব্যবসায়ীরা সেখানে যেতে পারছে না। সাপ্লায়াররা (চীনা ব্যবসায়ী) বলছেন, চীনে পণ্য উৎপাদনের সব কারখানা আপাতত বন্ধ রয়েছে। কবে থেকে উৎপাদন শুরু হবে তার নিশ্চয়তা নেই। যেসব পণ্য ১০-২০ ফেব্রুয়ারির মধ্যে শিপমেন্ট হওয়ার কথা ছিল, তাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ঘাটতির কারণে খুলনার বাজারে টিভি-কম্পিউটারের পার্টস, রিমোট কন্ট্রোলসহ খুচরা যন্ত্রাংশের দাম এরই মধ্যে ১০ থেকে ২০ শতাংশ বেড়েছে। হার্ডওয়্যার পণ্য আমদানিকারক খুলনার সাউদিয়া ট্রেডিং করপোরেশনের মালিক গোলাম মোহাম্মদ মিনার জানান, চীনে যেসব পণ্যের অর্ডার আগেই দেওয়া হয়েছিল ব্যাংকগুলো তার এলসি বন্ধ করে দিয়েছে। সংকটের কারণে বাজারে আমদানি নির্ভর হার্ডওয়ার পণ্য ডোর লক, প্যাড লক, সিটকানি, কব্জাসহ এসব পণ্যের চাহিদা অস্বাভাবিক বেড়েছে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে এসব পণ্যের সংকট তৈরি হবে।

জানা যায়, চীন থেকে বছরে প্রায় এক হাজার ৪০০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করে বাংলাদেশ। করোনাভাইরাসের কারণে বর্তমানে চীন থেকে পণ্য জাহাজীকরণ, বুকিং এবং বিক্রি বন্ধ রয়েছে। খুলনা চেম্বার অব কমার্সের সহসভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বুলু বিশ্বাস বলেন, খুলনায় বিশেষ করে ইলেকট্র্রনিক্স পণ্যের ৬০ ভাগই চায়না বাজারের দখলে। মোবাইল, টিভি, ফ্রিজ, কসমেটিকস, খেলনা, গেঞ্জি, জ্যাকেট, আসবাবপত্র, ভিডিও গেমসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রত্যেকটি জিনিসেই রয়েছে চীনের আধিপত্য। কিন্তু আসন্ন ঈদকে ঘিরে পণ্য আমদানির জন্যও ব্যবসায়ীরা চীনে যেতে পারছেন না। এতে খুলনার অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার শঙ্কা রয়েছে।

এদিকে চীনা ব্যবসায়ী, মেগা প্রকল্পের শ্রমিক, কারিগরি সহায়তাকারী ও প্রকৌশলীসহ এ অঞ্চলে কয়েক হাজার চীনা নাগরিক কাজ করছেন। এর মধ্যে মোংলা বন্দরের ড্রেজিং কাজে জাহাজ, বোর্ড ও কাটিং মেশিনে তিনশ চীনা নাগরিক বন্দর এলাকায় অবস্থান করছেন। এ ছাড়া খুলনা ওয়াসার পানি সরবরাহ প্রকল্পসহ কয়েকটি প্রকল্পে শতাধিক চীনা নাগরিক কর্মরত রয়েছেন। এর মধ্যে ওয়াসার কাজে কারিগরি সহায়তাকারী অধিকাংশ চীনা নাগরিক দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে রয়েছেন। তবে দুজন সম্প্রতি চীনে যাওয়ার পর ফেরত আসেনি। করোনাভাইরাসের কারণে প্রকল্পের কাজেও কিছুটা গতি কমে এসেছে।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সারাবিশ্বে ব্যবসা-বাণিজ্যে ‘কোয়ান্টিটি মেথড’ বা পরনির্ভরশীলতা রয়েছে। ফলে চীনের করোনাভাইরাসের ধাক্কা বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও আসবে। চীনের করোনাভাইরাসে পরিস্থিতি এখন খুবই উদ্বেগজনক। তবে সংকটটা কতখানি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে ক্ষতির পরিমাণ।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর