শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ২৭ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৬ মার্চ, ২০২০ ২৩:১৫

নতুন আক্রান্ত ৫ জন

টোলারবাগের লকডাউন থেকে পালিয়ে তারা টাঙ্গাইলে, করোনা সন্দেহে এক শিশুকে ঢাকায় আনা হচ্ছে, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দফতরের এক কর্মকর্তা আক্রান্ত, স্পেনে এক বাংলাদেশির মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক

নতুন আক্রান্ত ৫ জন

দেশে নতুন আরও পাঁচজনের মধ্যে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে। এ নিয়ে দেশে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৪ জনে। এর মধ্যে ১১ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। এ পর্যন্ত দেশে করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন পাঁচজন। এ ছাড়া খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জ্বর ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত এক রোগীর মৃত্যু হয়েছে। তার বাড়ি খুলনা নগরীর হেলাতলা এলাকায়। জানা গেছে, ঢাকায় করোনা আক্রান্ত হয়ে আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান এক ব্যক্তি। তার সঙ্গে একই হাসপাতালে পাশাপাশি বেডে চিকিৎসাধীন ছিলেন খুলনার মোস্তাহিদুর রহমান (৪৫)। পরে তাকে খুলনায় আনা হয়। ভর্তি করা হয় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ডে। বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) দুপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা গেছেন। তিনি খুলনা মহানগরীর হেলাতলা এলাকার মৃত সাঈদুর রহমানের ছেলে। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. এ টি এম মঞ্জুর মোর্শেদ এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, তার শরীরে করোনাভাইরাসের উপসর্গ থাকতে পারে। ঘটনার পর তার স্বজনরা লাশটি রেখে পালিয়ে যান। মন্ত্রণালয় সূত্র জানিছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে এক কর্মকর্তা করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এর পরে এই মন্ত্রণালয়ের শীর্ষপর্যায়ের কয়েকজনকে হোম কোয়ারেন্টাইনে যেতে বলা হয়েছে। এদিকে স্পেনে এক বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। আক্রান্ত রোগীর তথ্য গোপন করায় কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের শতাধিক বাসিন্দা। মিরপুরের টোলারবাগ থেকে পালিয়ে একটি পরিবার টাঙ্গাইলে আশ্রয় নিয়েছে। করোনা আক্রান্ত সন্দেহে এক শিশুকে কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় আনা হয়েছে। চিকিৎসকদের জন্য স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জারি হওয়া আদেশটি বাতিল এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরের জারি হওয়া আদেশ স্থগিত করেছে কর্তৃপক্ষ। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আদেশে কেউ চিকিৎসাসেবা বঞ্চিত হলে সেনাবাহিনীর তল্লাশি চৌকি বা থানার ওসিকে জানানোর কথা বলা হয়েছিল। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক মীরজাদি সেব্রিনা ফ্লোরা গতকাল সংবাদ সম্মেলনে বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় ১২৬ জন সন্দেহভাজনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচজনের সংক্রমণ পাওয়া যায়। নতুন আক্রান্ত পাঁচজনের মধ্যে একজন বিদেশফেরত। তিনজন আগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে এসেছিলেন। আরেকজনের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। কার মাধ্যমে তিনি সংক্রমিত হয়েছেন, তা এখনো জানা যায়নি। আক্রান্ত সবাই পুরুষ। এই পাঁচজনের মধ্যে দুজনের বয়স ৩০-৪০ বছর। দুজনের বয়স ৪১-৫০ বছর, একজন ষাটোর্ধ্ব। তিনি বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় আরও চারজন সুস্থ হয়ে উঠেছেন। আক্রান্তদের মধ্যে সব মিলিয়ে মোট ১১ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। নতুন এই পাঁচ রোগীর মধ্যে চারজনের লক্ষণ মৃদু এবং একজনের মধ্যে কোমরবিডিটি (দীর্ঘমেয়াদি অন্য রোগ) আছে বলে জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে। মীরজাদি সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, পিসিআর পদ্ধতিতে আইইডিসিআর ছাড়া আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে করোনা পরীক্ষা হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান ও ঢাকা শিশু হাসপাতালে পরীক্ষা শুরু হয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রামে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেজ (বিআইটিআইডি)-তে এই কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বিভাগীয় পর্যায়ে আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে এটি সম্প্রসারণের কাজ চলছে। করোনা সন্দেহে কেউ হাসপাতালে ভর্তি হলে হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী আইইডিসিআর গিয়ে সেই নমুনা সংগ্রহ করে নিয়ে আসত। এখন হাসপাতালের নমুনাগুলো হাসপাতাল থেকেই সংগ্রহ করে আইইডিসিআরে পাঠানো হবে। প্রতিটি এলাকাভিত্তিক নমুনা সংগ্রহ করে তা পরীক্ষা করা হবে বলে জানান তিনি। চিকিৎসকদের জন্য স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জারি হওয়া আদেশটি বাতিল এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরের জারি হওয়া আদেশ স্থগিত করেছে কর্তৃপক্ষ। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আদেশে কেউ চিকিৎসাসেবা বঞ্চিত হলে সেনাবাহিনীর তল্লাশি চৌকি বা থানার ওসিকে জানানোর কথা বলা হয়েছিল। অন্যদিকে অধিদফতরের চিঠিতে করোনাভাইরাসের উপসর্গ আছে এমন রোগীকে ব্যক্তিগত সুরক্ষা পোশাক (পিপিই) ছাড়াই প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার নির্দেশ জারি করেছিল স্বাস্থ্য অধিদফতর। এই দুই আদেশ নিয়ে চিকিৎসকদের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। ওই আদেশ দুটি গত রাতেই বাতিল করে সংশোধিত বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত এক নারীর তথ্য গোপনের কারণে বিপাকে পড়েছেন চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বাসিন্দারা। ওই নারীকে চিকিৎসা করায় কক্সবাজার সদর হাসপাতালের ১৩ জন চিকিৎসক এবং তার ছেলে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে বৈঠকে অংশ নেওয়ায় বোর্ড চেয়ারম্যানসহ ৭০ জনকে হোম কোয়ারেন্টাইনে যেতে হয়েছে। সেই সঙ্গে ওই নারীর চিকিৎসায় সংশ্লিষ্ট সেবিকা ও তার আত্মীয়স্বজনসহ এখন কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন আরও অর্ধশতাধিক মানুষ। এতে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। ২৪ মার্চ সৌদিফেরত কক্সবাজার সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষের মা ওই নারীর করোনা পজিটিভের খবর প্রকাশ হয়। এর আগে অসুস্থতা বোধ করায় ২১ মার্চ তাকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতাল সূত্র জানায়, রোগীর লক্ষণ দেখে বারবার জানতে চাইলেও পরিবারের কেউই বিদেশ ভ্রমণের তথ্য প্রকাশ না করে গোপন রাখেন। শরীয়তপুরে নড়িয়ায় ইতালিফেরত এক যুবক ও তার স্ত্রীর করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরীক্ষার জন্য নমুনা নিয়েছে আইইডিসিআর। নড়িয়া উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা রাজিব হাওলাদার জানান, জ্বর, সর্দি, কাশি ও গলাব্যথা থাকায় আইইডিসিআর থেকে বিশেষজ্ঞ টিম এসে এই দুজনের নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় নিয়ে গেছে। জেলা প্রশাসন ও জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ এই দম্পতিকে নজরদারিতে রেখেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ঢাকা মিরপুরের টোলারবাগে এক ব্যক্তি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার পর ওই এলাকা লকডাউন করা হয়। সেই লকডাউন থেকে পালিয়ে একটি পরিবার আশ্রয় নেয় টাঙ্গাইলের বাসাইলের একটি বাড়িতে।

খবর পেয়ে উপজেলা প্রশাসন ওই পরিবারসহ তিনটি পরিবারকে গতকাল লকডাউন করেছে। কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি থাকা এক শিশুকে করোনা সংক্রমণ সন্দেহে আইসোলেশন থেকে ঢাকায় আনা হচ্ছে। গতকাল বিকালে শিশুটিকে নিয়ে একটি অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় রওনা দেয়। রাতে পৌঁছার কথা। তাকে রাজধানীর কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে ভর্তি করা হবে। ওই শিশুর মা-বাবাসহ পরিবারের পাঁচ সদস্যকে বাড়িতে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। বাড়িটি ‘লকডাউন’ করে দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। শিশুটির বাবা ৯ মার্চ সিঙ্গাপুর থেকে দেশে আসেন। তিনি পরিবারের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে ছিলেন।

পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলা সদরে গতকাল সকালে রাশিয়ার নাগরিকসহ বিদেশিদের একটি ভাড়া বাড়ি লকডাউন ঘোষণা করেছে উপজেলা প্রশাসন। বাড়িটিতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পে কর্মরত ২২ জন বিদেশি ভাড়া থাকেন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শিহাব রায়হান বলেন, জ্বর ও গলাব্যথায় আক্রান্ত এক বিদেশিকে ওই বাড়িতে কোয়ারেন্টাইনে থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। নির্দেশ অমান্য করে তিনি বুধবার রাতে ঢাকায় চলে গেছেন। ফলে উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী সাময়িকভাবে বাড়িটি লকডাউন করা হয়েছে।

খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে থাকা এক রোগীর (৩০) মৃত্যু হয়েছে। শ্বাসকষ্ট, গলাব্যথা নিয়ে হাসপাতালে এলে লক্ষণ দেখে তাকে আইসোলেশন ওয়ার্ডে রাখা হয়। পরে রাতেই তার মৃত্যু হয়। তার চিকিৎসার দায়িত্বে থাকা দুই চিকিৎসকসহ, দুই নার্স ও আয়াকে হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জ্বর ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত এক রোগীর মৃত্যু হয়েছে। তার বাড়ি খুলনা নগরীর হেলাতলা এলাকায়। তার শরীরে করোনাভাইরাসের উপসর্গ থাকতে পারে বলে সন্দেহ করছেন হাসপাতালের পরিচালক ডা. এ টি এম মঞ্জুর মোর্শেদ। এ ঘটনার পর তার স্বজনরা লাশটি রেখে পালিয়ে যান।

আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে জানা যায়, হোম কোয়ারেন্টাইনে আছেন হবিগঞ্জে ১১১৬ জন, কিশোরগঞ্জে ৩৮৮ জন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৮৫৮ জন, বাগেরহাটে ১২৯৭ জন, পঞ্চগড়ে ৩৬৮ জন, সিরাজগঞ্জে ৫২৬ জন, টাঙ্গাইলে ৮৩১ জন। এ ছাড়া যুক্তরাজ্য থেকে সিলেটে আসা এক দম্পতিকে হাসপাতালের কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়েছে। বিমানবন্দরে তাদের শরীরে বেশি তাপমাত্রার বিষয়টি ধরা পড়লে সেখান থেকে তাদের হাসপাতালের কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়। ওই ফ্লাইটে আসা আরও ২৯ জন যাত্রীকেও হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর