শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ৩০ মে, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৯ মে, ২০২০ ২৩:২৪

বেরিয়ে আসছে ইউনাইটেড হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের অভিজাত তারকা হাসপাতাল ইউনাইটেডের করোনা ইউনিটে আগুনে পাঁচ রোগীর মর্মান্তিক মৃত্যুর পর বেরিয়ে আসছে অব্যবস্থাপনা আর রোগীর প্রতি অবহেলার নানা তথ্য। ফায়ার সার্ভিস আর পুলিশের তদন্তসংশ্লিষ্টরা নজিরবিহীন নানা তথ্য উদঘাটনের পর হতবাক। তারা জানতে পেরেছেন ইউনাইটেড হাসপাতাল তাদের করোনা ইউনিট স্থাপনের জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে কোনো অনুমতি নেয়নি। এমনকি তারা যে বেডের সংখ্যা বাড়িয়েছে, সে বিষয়েও কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি। শুধু তাই নয়, যত্রতত্র দাহ্য পদার্থ দিয়ে লাইফসাপোর্ট ও আইসিইউ কক্ষ তৈরি করা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এমন এক পরিস্থিতিতে অগ্নিকান্ডের পুরো ঘটনার তদন্ত দাবি করেছে নিহত রিয়াজুল আলম লিটনের পরিবার। তারা প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করে বলেছেন, অন্যথায় তারা হত্যার অভিযোগে মামলা দায়ের করবে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যে কোনো হাসপাতালের বেডের সংখ্যা বাড়াতে হলে অনুমতি নিতে হয় বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। এমনকি যত্রতত্র দাহ্য পদার্থ দিয়ে লাইফসাপোর্ট ও আইসিইউ কক্ষ  তৈরি করা নিয়েও সমালোচনা করেছেন বিশেষজ্ঞরা। লাইফসাপোর্ট কক্ষ নির্মাণের ক্ষেত্রেও স্বাস্থ্য অধিদফতরের নির্দেশনা উপেক্ষা করেছে ইউনাইটেড  হাসপাতাল। হাসপাতালের বর্ধিত অংশে করোনা ইউনিট বা ওয়ার্ড করার বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের কোনো অনুমতি নেয়নি।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘কোনো হাসপাতালে বেড সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হলে অবশ্যই অধিদফতরের অনুমতি নিতে হবে। হাসপাতালের বর্ধিত কোনো অংশে লাইফসাপোর্ট কক্ষ, আইসিইউ কক্ষ করতে কোনো অনুমতি লাগবে না। পূর্বের অনুমতিতেই হবে। তবে এসব কক্ষ তৈরির ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদফতরের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে।’

এদিকে হত্যাকা- দাবি করে প্রয়োজনে মামলা করা হবে বলে জানিয়েছেন নিহত লিটনের বড়ভাই মো. রইসুল আযম ডাবলু। এ ব্যাপারে তিনি গণম্যাধ্যমসহ দেশবাসীর সহযোগিতা কামনা করেছেন।

ঘটনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরে খুন করা হয়েছে এমনটি দাবি করে লিটনের স্ত্রী ফৌজিয়া আক্তার জেনি সাংবাদিকদের জানান, জ্বর এবং সামান্য শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। তাই বেটার ফিল এবং প্রয়োজনে অক্সিজেন সেবা পাওয়ার জন্য হাসপাতালে যাওয়া। বড় হাসপাতালে গিয়েছিলাম ভালো সেবা পাওয়ার জন্য। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ করোনা সন্দেহে বন্ডে সই নিয়ে আইসোলেশন সেন্টারে নিয়ে যায় আমার স্বামীকে। যদি বন্ড না দেই তাহলে তারা ভর্তি নেবে না বলে জানিয়ে দেয়। ভর্তির পর তারা রাস্তার ওপর দিয়ে আমার স্বামীকে হাঁটিয়ে নিয়ে গিয়ে পাশেই আইসোলেশনে রাখে। এরপর তারা আমার সঙ্গে আর কোনো প্রকার কথা বলেনি।

বাচ্চা ছোট থাকায় এক আত্মীয় আর গাড়িচালককে রেখে বাচ্চাকে নিয়ে চলে আসি। এর ২ ঘণ্টা পর ফোন করে আমার আত্মীয় জানান, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলেছে আপনার রোগী ভালো আছে, রাতের খাবার খেয়েছে। একটু আরাম পাওয়ার জন্য হালকা অক্সিজেন দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আমার স্বামী এতই সুস্থ ছিল যে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় সে নিজেই বের হয়ে আসতে পারত এবং সঙ্গে আরও একজনকে নিয়ে আসতে পারত। কিন্তু ঘরে অতিরিক্ত দাহ্য পদার্থ থাকায় এবং ঘরের দরজা লক করা ছিল বলেই সে হয়তো বের হতে পারেনি। এ কারণে আমি মনে করি আমার স্বামীকে খুন করা হয়েছে। আমি এবং একমাত্র সন্তানের মাথার ছাতা ছিল আমার স্বামী। এখন আমার সব শেষ হয়ে গেছে। এ ঘটনায় সরকারের কাছে বিচার চাই আমি।

দিনাজপুর প্রতিনিধি জানান, বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় লিটনের লাশ গ্রামের বাড়ি দিনাজপুরের বীরগঞ্জে নিয়ে আসা হয়। পরে বিকাল ৩টায় বাড়ির পাশে ঈদগা মাঠে জানাজা শেষে স্থানীয় দক্ষিণ সুজালপুর করবস্থানে বাবার পাশে দাফন করা হয় তাকে।

দিনাজপুরের বীরগঞ্জ পৌর শহরের সুজালপুর মাস্টারপাড়ার বাসিন্দা  ছেলে মৃত ফরজান আলীর ছেলে রিয়াজুল আলম লিটন। ৪ ভাই এক বোনের মধ্যে সবার ছোট লিটন। লেখাপড়া এবং চাকরি সূত্রে দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার শ্যামলী প্রিন্স বাজার এলাকায় স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস করতেন তিনি।

প্রসঙ্গত, বুধবার (২৭ মে) রাত ৯টা ৫৫ মিনিটে ইউনাইটেড হাসপাতালের বর্ধিত অংশে আগুন লাগে। আগুন নেভাতে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট কাজ করে। রাত সাড়ে ১০টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এই আগুনে পাঁচজন রোগী মারা গেছেন। তারা হাসপাতালের করোনা ইউনিটে আইসোলেশনে ছিলেন। পাঁচজনের মধ্যে চারজন পুরুষ ও একজন নারী। নিহতরা হলেন- মোহাম্মদ মাহবুব (৫০), মনির হোসেন (৭৫), ভেরন অ্যান্থনি পল (৭৪), খোদেজা বেগম (৭০) ও রিয়াজ উল আলম (৫০)। তাদের মধ্যে প্রথম তিনজন করোনা আক্রান্ত ছিলেন। বাকি দুজনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছিল, তারা রিপোর্টের অপেক্ষায় ছিলেন। তারা সবাই প্রফেসর ড. মো. ওমর ফারুকের তত্ত্বাবধানে করোনা ইউনিটে ভর্তি ছিলেন।

অগ্নিকা-ের পরদিন বিকালে ইউনাইটেড হাসপাতালের কমিউনিকেশন্স অ্যান্ড বিজনেস ডেভেলপমেন্ট বিভাগের প্রধান ডা. সাগুফা আনোয়ার সংবাদ সম্মেলনে জানান, রোগীরা সবাই লাইফসাপোর্টে ছিলেন। তার এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন নিহতদের স্বজনরা।

নিহত খোদেজা বেগমের ছেলে আলমগীর হোসেন বলেন, ‘আমাকে বুধবার দিনের বেলা ইউনাইটেড থেকে জানানো হয়, মা সুস্থ হয়েছেন, তাকে পরদিন বেডে দেওয়া হবে। তাকে কখন লাইফসাপোর্টে রাখা হলো? এগুলো সব মিথ্যাচার।’

ইউনাইটেড হাসপাতালের বর্ধিত অংশে লাইফসাপোর্ট ও আইসিইউ কক্ষ নির্মাণে যেসব জিনিসপত্র ব্যবহার করা হয়েছে, তারও সমালোচনা করেছেন কেউ কেউ। কারণ, পারটেক্স বোর্ড, লোহার অ্যাঙ্গেল এবং কাপড়ের শামিয়ানা দিয়ে নির্মাণ করা হয় ইউনাইটেডের করোনা ইউনিট। এসব সামগ্রী দিয়ে কোনোভাবেই আইসিইউ অথবা লাইফসাপোর্টের কক্ষ করা স্বাস্থ্যসম্মত নয়। আইসিইউ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘এমন সামগ্রী দিয়ে এসব কক্ষ তৈরি করতে হবে, যেন কোনো ময়লা না আটকে থাকে। কোনো প্রকার কাঠ বা কাপড় দিয়ে এসব কক্ষ করা যাবে না।’

ইউনাইটেডের করোনা ইউনিটে ছিল না অগ্নিনির্বাপণের কোনো  ব্যবস্থা। এ ছাড়া ফায়ার সার্ভিস থেকেও এই বর্ধিত অংশের অনুমোদন নেওয়া হয়নি। হাসপাতালের ভিতরে মেয়াদোত্তীর্ণ অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ছিল। তবে সেগুলো কেউ ব্যবহার করেনি। অগ্নিকা-ের তদন্তে গঠিত কমিটির প্রধান ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক (ঢাকা বিভাগ) দেবাশীষ বর্ধন এই তথ্য জানান। ইউনাইটেড হাসপাতালের কমিউনিকেশন্স অ্যান্ড বিজনেস ডেভেলপমেন্ট বিভাগের প্রধান ডা. সাগুফা আনোয়ার বলেন, ‘সরকার আমাদের বলার পরই আমরা দ্রুত করোনা রোগীদের চিকিৎসার জন্য উদ্যোগ নিয়েছি। আইসোলেশন ওয়ার্ডে রোগী থাকলে সেখানে আইসিইউ বেড রাখতে হয়। আমরা সেটা রেখেছি। সবকিছুই করা হয়েছে রোগীদের ভালোর জন্য।’ তিনি বলেন, ‘একটি দুর্ঘটনা। এখন এসব প্রশ্ন আসছে।’


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর