শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৬ জুলাই, ২০২০ ০০:০১

চিকিৎসাসেবার যত চ্যালেঞ্জ

করোনা টেস্টে সংকট, চলছে না হাসপাতালে অন্যান্য পরীক্ষাও, ৪৬ জেলায় নেই আইসিইউ, হাসপাতালে অক্সিজেনের ভুতুড়ে বিল

জয়শ্রী ভাদুড়ী

চিকিৎসাসেবার যত চ্যালেঞ্জ
করোনার নতুন চ্যালেঞ্জ গরুর হাট। স্বাস্থ্যবিধি কেউই মানছে না। ছবিটি নওগাঁর মান্দার চৌবাড়িয়া হাটের -বাংলাদেশ প্রতিদিন

করোনা উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে অপেক্ষমাণ মানুষের দীর্ঘ লাইন। নমুনা দেওয়ার ১৫ দিনেও মিলছে না রিপোর্ট। তীব্র শ্বাসকষ্টে রোগীর প্রাণ ওষ্ঠাগত হলেও আইসিইউ পাওয়া যাচ্ছে না। ৪৬ জেলার হাসপাতালে নেই আইসিইউ। করোনা মহামারীতে নানামুখী চ্যালেঞ্জে পড়েছে দেশের চিকিৎসাসেবা। বেসরকারি হাসপাতালে অক্সিজেনের খরচ হিসেবে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে ভুতুড়ে বিল। হাসপাতালে অন্যান্য টেস্ট করাতেও বিপাকে পড়ছেন রোগীরা। সংক্রমণ বৃদ্ধির এ সময়ে কোরবানির  গরুর হাটে স্বাস্থ্যঝুঁকি ঘিরে তৈরি হচ্ছে নতুন শঙ্কা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ভাইরাস বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আইসিইউ, ভেন্টিলেটর সাপোর্ট ছাড়া করোনা রোগীদের চিকিৎসা খুব মুশকিল। কারণ করোনায় শ্বাসকষ্টের রোগীর যে কোনো সময় অবস্থা খারাপ হতে পারে। ভেন্টিলেশন ছাড়া চিকিৎসার প্রস্তুতি শূন্যের কোঠায়। দেশে কমপক্ষে পাঁচ হাজার ভেন্টিলেটর দরকার। সরকারি-বেসরকারি আইসিইউর দায়িত্বে থাকা নার্সদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, ‘করোনা সংক্রমণে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে কোরবানির ঈদের গরুর হাটে জনসমাগম হলে সংক্রমণ ঝুঁকি আরও বাড়বে। গরুর হাটে কতটা স্বাস্থ্যবিধি মানা হবে তা অনুমেয়।’

করোনা টেস্ট সংকট : করোনাভাইরাসের উপসর্গ থাকায় গত ৩১ মে নমুনা পরীক্ষা করতে দেন বনশ্রীর বাসিন্দা সতীশ চন্দ্র দাস, তার স্ত্রী রূপালি দাস এবং ছেলে ডা. তন্ময় দাস। এর মধ্যে গত ৫ জুন শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে বেসরকারি একটি হাসপাতালে করোনা সাসপেক্টেড রোগী হিসেবে ভর্তি হন তারা। চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ৯ জুন মারা যান সতীশ চন্দ্র দাস। মারা যাওয়ার চার দিন পর স্বাস্থ্য অধিদফতরে যোগাযোগ করে তারা রিপোর্ট পান। বনশ্রীর এক বাসা থেকে নমুনা নিয়ে রিপোর্টে তিনজনকে তিন এলাকার বাসিন্দা উল্লেখ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন পর ভুল ঠিকানার রিপোর্ট নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে তার পরিবার।

সারা দেশে মাত্র ৭৩টি ল্যাবে চলছে করোনাভাইরাস শনাক্ত টেস্ট। উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালের দুয়ারে ঘুরছে মানুুষ, হটলাইন নম্বরে বাড়ছে উপসর্গ রয়েছে এমন রোগীদের কল। অনেক চেষ্টায় করোনা টেস্টের জন্য নমুনা দিলেও ১৫-২০ দিনে মিলছে না প্রতিবেদন। নমুনা সংগ্রহের এত দিন পরে প্রতিবেদন দেওয়ায় নমুনার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। একসঙ্গে স্পষ্ট হচ্ছে করোনার নমুনা সংগ্রহ ও ল্যাবে শনাক্তকরণ কাজে প্রয়োজনীয় জনবলের সংকট। সংকটের কারণে ল্যাবগুলোতে জমছে নমুনার স্তূপ। গত ২৭ মে জ্বর, শ্বাসকষ্ট ও হালকা গলাব্যথা নিয়ে কক্সবাজার মেডিকেল কলেজে নমুনা দেন কক্সবাজারের এক বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. ইয়াসফিনাউল হক। নমুনা দেওয়ার ১৯ দিন পর ১৪ জুন তিনি স্বাস্থ্য অধিদফতরের এসএমএস পান যে তার করোনা টেস্টের রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে। তবে সেই এসএমএসে বলা হয়, তার নমুনা রিসিভ করা হয়েছে ৬ জুন। ২৭ মে নমুনা দেওয়ার পর তা ৬ জুন রিসিভ করা হলে রিপোর্ট কতটা বিশ্বাসযোগ্য তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ওই চিকিৎসকের পরিবারের সদস্যরা।

৪৬ জেলায় নেই আইসিইউ : স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, ঢাকা মহানগরীতে কভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের জন্য আইসিইউ শয্যা আছে ১৪৯টি। সব বিভাগ মিলে আইসিইউ শয্যা আছে ৪০১টি। ঢাকা বিভাগে ৮২টি, ময়মনসিংহ বিভাগে ১৭, চট্টগ্রাম মহানগরীতে ৩৯ ও বিভাগে ২৭, রাজশাহী বিভাগে ২৩, রংপুর বিভাগে ২০, খুলনা বিভাগে ১৮, বরিশাল বিভাগে ১০, সিলেট বিভাগে ১৬টি। দেশের ৪৬ জেলায় নেই আইসিইউ। এসব জেলার রোগীদের ভরসা করতে হচ্ছে বিভাগীয় হাসপাতালগুলোর ওপরে। ঢাকামুখী রোগীর চাপও বাড়ছে। রাজধানীতে আইসিইউ যেন সোনার হরিণ। তদবির ছাড়া মিলছে না একটি আইসিইউ শয্যা। রাজধানীর এক ব্যবসায়ীর বাবা করোনা আক্রান্ত হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন। রাতে অবস্থার অবনতি হওয়ায় ওই হাসপাতাল থেকে আইসিইউতে নেওয়ার জন্য বলা হয়। ওই হাসপাতালে আইসিইউ প্রস্তুত না হওয়ায় বিপাকে পড়েন রোগীর পরিবার। পরের দিন রাত হলেও আইসিইউ ব্যবস্থা করতে পারেননি তারা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনসংখ্যার অনুপাতে দেশে করোনা মোকাবিলায় কমপক্ষে সাড়ে ৩ হাজার আইসিইউ ও ৫ হাজার ভেন্টিলেটর প্রস্তুত করা দরকার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণা বলছে, কভিড-১৯ এ আক্রান্ত মোট রোগীর ৮০-৮২ শতাংশ সাধারণ চিকিৎসাতেই সুস্থ হয়ে ওঠেন। বাকি ১৮-২০ শতাংশ রোগীর চিকিৎসা নিতে হয় হাসপাতালে। এদের মধ্যে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ রোগীর জন্য প্রয়োজন হতে পারে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস সুবিধা বা ভেন্টিলেটর। আর জটিল ৫ শতাংশের জন্য লাগতে পারে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউ। চিকিৎসকরা বলছেন, করোনা রোগীদের মধ্যে প্রায় ১৮ শতাংশ অন্যান্য রোগে আক্রান্ত থাকায় আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

অক্সিজেনের ভুতুড়ে বিল : দেশে করোনা আক্রান্ত রোগী বৃদ্ধি পাওয়ায় বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে রোগী ভর্তির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোনো বিল নির্ধারণ করে না দেওয়ায় কিছু বেসরকারি হাসপাতাল এ পরিস্থিতির ফায়দা লুটছে। রাজধানীর ধানমন্ডির আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালের বিরুদ্ধে অক্সিজেনের বেশি বিল নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সেখানে মাত্র ৩০ মিনিট অক্সিজেন দিয়ে নয় দিনের অক্সিজেন বিল নিয়েছে মোজাম্মেল হক চৌধুরী নামের এক রোগীর কাছ থেকে। জুন মাসের শুরুর দিকে প্রচ- শ্বাসকষ্ট নিয়ে চট্টগ্রামের ম্যাক্স হাসপাতালে ভর্তি হন জান্নাতুল ফেরদৌস। তাকে ১০ দিন অক্সিজেন দিতে হয়েছিল। সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে যাওয়ার সময় তার পরিবারের হাতে ৬ লাখ টাকারও বেশি অঙ্কের বিল ধরিয়ে দেওয়া হয়। এর মধ্যে শুধু অক্সিজেনের বিল ৩ লাখ ৫ হাজার টাকা। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপাচার্য রশীদ-ই-মাহবুব বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘বেসরকারি হাসপাতাল চিকিৎসা দিলেও এর নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে থাকতে হবে। সেবার মূল্য নির্ধারণ না করে এভাবে হাসপাতালের মর্জির ওপর ছেড়ে দিলে এ পরিস্থিতি তৈরি হবেই।’

সংকটে অন্য অসুখের রোগীরা : চট্টগ্রামের হালিশহরের বাসিন্দা আফরোজা বেগম ঘরের মেঝেতে হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান। দ্রুত হাসপাতালে নিলে চিকিৎসকরা জানান তিনি ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত। দ্রুত অপারেশনের প্রয়োজন। তাৎক্ষণিক রোগীকে ঢাকায় এনে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করালে করোনা টেস্টের প্রতিবেদন নিয়ে আসতে বলে কর্তৃপক্ষ। আফরোজা বেগমের জামাতা হাসিবুল ইসলাম বলেন, ‘আমার শ্বশুর ও আমি শাশুড়িকে হাসপাতালে ভর্তি করলে তারা অনেকগুলো টেস্ট করতে দেয়। কিন্তু প্রথমে আমাদের তিনজনের করোনা টেস্টের প্রতিবেদন আনতে বলে। কিন্তু আমাদের কোনো উপসর্গ না থাকায় টেস্ট করাবে না বলে জানায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।’

তিনি আরও বলেন, ‘ওই হাসপাতাল রোগী নিয়ে চলে যেতে বললে আরেকটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করি। কিন্তু সেখানেও চিকিৎসকরা করোনা টেস্ট ছাড়া অপারেশন করতে অস্বীকৃতি জানান। অনেক চিকিৎসক আক্রান্ত হওয়ায় তারা ঝুঁকি নিতে চাইছিলেন না। কোনো উপায় না থাকায় রোগী নিয়ে চট্টগ্রামে ফিরে যাই। বিনা চিকিৎসায় চোখের সামনে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে একটা মানুষ।’ এ পরিস্থিতিতে বিপদে পড়েছেন কিডনি রোগীরা। অনেক রোগীর নির্দিষ্ট সময় পরপর ডায়ালাইসিসের প্রয়োজন হয়। করোনা সংক্রমণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে হাসপাতালগুলো। অনেক হাসপাতালে ইউনিট লকডাউন কিংবা করোনা হাসপাতালে রূপান্তরিত করায় সমস্যায় পড়েছেন রোগীরা। ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের কেমোথেরাপি দেওয়ার আগে করোনা টেস্ট রিপোর্ট আনতে হচ্ছে। প্রতি ধাপের থেরাপিতে করোনা নেগেটিভ সার্টিফিকেট আনতে বিড়ম্বনা পোহাতে হচ্ছে রোগী ও তার স্বজনদের। অধিকাংশ হাসপাতালে করোনা রোগী ভর্তি করায় অন্যান্য টেস্ট করানো যাচ্ছে না। অনেক হাসপাতালে বন্ধ রয়েছে টেস্ট। ল্যাব টেকনোলজিস্টরা করোনা টেস্ট ল্যাবে কাজ করছেন। করোনায় খুব বিপদে না পড়লে রোগীরাও যাচ্ছেন না ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। অধিকাংশ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে স্বাভাবিকের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ রোগী আসছে। নওগাঁর বাসিন্দা সুমা রানী লিভার সমস্যা নিয়ে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘রোগ নির্ণয় করতে আমার প্রায় ৩৫টি টেস্ট করতে হয়েছে। ছয়টি হাসপাতাল ঘুরে টেস্ট করিয়েছি। কোনো হাসপাতালে ল্যাব বন্ধ, কোনো হাসপাতালে নির্ধারিত টেস্টের টেকনেশিয়ান নেই। পেটে অসহনীয় যন্ত্রণা চেপে বাড়িতে থাকারও পরিস্থিতি নেই। তাই বাধ্য হয়েই হাসপাতালের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছি।’


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর