শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৯ জুলাই, ২০২০ ২৩:৫৪

প্রতারক সাহেদকে খুঁজছে র‌্যাব দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা

তদন্ত হচ্ছে প্রতারণার, মুখ খুললেন স্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রতারক সাহেদকে খুঁজছে র‌্যাব দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা
এভাবেই নিজের অফিসে টর্চার সেল খুলেছিলেন বিতর্কিত সাহেদ

প্রতারণার শেষ নেই রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাহেদ ওরফে সাহেদ করিম ওরফে মো. শহীদের। কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বেরিয়ে আসার মতো একে একে ফাঁস হচ্ছে তার সব অপকর্মের তথ্য। তার সব ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করতে সব ব্যাংকের কাছে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ ফিন্যানশিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। তাকে ধরতে সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছেন র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। গ্রেফতার হতে পারেন যে কোনো সময়। তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। হাসপাতালের আড়ালে পাওয়া গেছে টর্চার সেল। একসময় হাওয়া ভবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সাহেদ কীভাবে রাষ্ট্রীয় সব অনুষ্ঠানে দাওয়াত পেতেন সেসব খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

করোনা রোগীদের চিকিৎসাসেবার নামে প্রতারণা ছাড়াও নিজ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও প্রতারণা করতেন তিনি। এ বিষয়ে মুখ খুলেছেন তার স্ত্রীও। গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপে স্ত্রীর মুখে উঠে আসে তার নানা অপকর্মের চিত্র। তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আরও কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। খুব শিগগিরই সেগুলো জানানো হবে। র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ জানান, সাহেদকে গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তার সবকিছু নিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।

সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক সাহেদের ছবি ঘুরপাক খাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তাদের পাশে থাকা সাহেদের ছবি দেখে নানা প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে তার উপস্থিত থাকারও ছবি দেখা গেছে। জানা গেছে, সাহেদের প্রতারণার বিষয়ে সরকারি বিভিন্ন সংস্থা থেকে আগেই সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। তার পরও একের পর এক প্রতারণা করেই যাচ্ছিলেন সাহেদ।

রাজধানীর উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টরের রিজেন্ট গ্রুপের প্রধান কার্যালয় থেকেই সব অপকর্ম নিয়ন্ত্রণ করতেন প্রতারক সাহেদ। তার কার্যালয় ভবনটিতে ছিল নিজস্ব টর্চার সেল। প্রতারিত লোকজন টাকা চাইতে এলেই করা হতো নির্মম নির্যাতন। সাহেদকে গ্রেফতার অভিযানের পাশাপাশি তার ব্যবসায়ী এবং অপকর্মের সহযোগীদেরও খুঁজে বের করতে মাঠে নেমেছে বিভিন্ন সংস্থা। এর মধ্যে তার অন্যতম সহযোগী ও জনসংযোগ কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম ওরফে তারেক শিবলীকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। গতকাল সকালে রাজধানীর নাখালপাড়া থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। এদিকে সাহেদের ভায়রা ভাই মোহাম্মদ আলী বশিরকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি নাটক প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘টেলিহোম’-এর প্রধান। র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ জানান, তারেক শিবলীকে গ্রেফতারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তার থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তিনি সাহেদের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করতেন। গত ৭ জুলাই রাতে বনানী থেকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে আসা হয় বশিরকে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, সাহেদের অবৈধ টাকা দিয়ে তিনি নাটক প্রযোজনা করতেন। সাহেদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে র‌্যাব হেফাজতে নেওয়া হয়। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে গতকাল ছেড়ে দেওয়া হয় বলে জানান আশিক বিল্লাহ।

স্ত্রীর মুখে সাহেদের প্রতারণার চিত্র : প্রতারণার সব কৌশলই রপ্ত করেছেন সাহেদ। ছাড় দেননি নিজের পরিবারকেও। গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপে স্ত্রীর মুখে উঠে আসে তার নানা অপকর্মের চিত্র। সাহেদের বিচারও দাবি করেছেন স্ত্রী সাদিয়া। তার বাড়ির মালিকের দাবি, বাসা ভাড়ার টাকা চাইতে গেলেও দেওয়া হতো হুমকি। প্রায় দুই বছর ধরে সাহেদ পরিবারসহ থাকতেন ওল্ড ডিওএইচএসের ৯ নম্বর বাসায়। ব্যবসায়ী পরিচয় দিয়ে বাসাটি ভাড়া নিলেও অল্প কয়েক দিনেই বেরিয়ে আসে তার আসল রূপ। সাহেদের স্ত্রী সাদিয়া জানান, সাহেদের প্রতারণা শুরু হয় ২০০৮ সালে। পরিবারের লোকদের সঙ্গেও প্রতারণা করতেন সাহেদ। এটা তার নেশায় পরিণত হয়েছে। এই প্রতারকের বিচার চেয়েছেন স্ত্রী। বলেন, কয়েকবার আমি তার কাছ থেকে চলেও গেছি। আমার পরিবারের কয়েকজনের সঙ্গেও তার টাকাপয়সা নিয়ে গ-গোল ছিল। তার জন্য আমার পরিবারের অন্যরাও সমস্যায় আছেন।

কার্যালয়ে টর্চার সেল : রিজেন্ট গ্রুপের কার্যালয়ে ছিল সাহেদের নিজস্ব টর্চার সেল। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই এ ভবনটিতে কী কী আছে। প্রতারণার শিকার লোকজন টাকা চাইতে এলেই করা হতো নির্যাতন। আর সেখানে তার নির্যাতনের স্থিরচিত্রও প্রকাশিত হয়েছে। এক ভুক্তভোগী সাংবাদিকদের বলেন, এখানে তার কাছে টাকার জন্য গিয়েছিলাম। চাওয়া মাত্রই তার লোকজন আমার দুই হাত ধরে ওই রুমটির দরজা বন্ধ করে দিল। এর পরই তিনি আমাকে মারধর করতে থাকেন। এমনকি পাওনাদারকে নারী দিয়ে হেনস্তা করাও ছিল সাহেদের অন্যতম কাজ। ভুক্তভোগীরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে গিয়ে অভিযোগও করতে পারতেন না। আরও একজন বলেন, হাওয়া ভবনের সঙ্গে তার ভালো যোগাযোগ ছিল এবং গুলশান যুবদলের সভাপতি তার কাছের লোক ছিলেন। এসব কারণে তার বিরুদ্ধে কেউ নালিশ করতে পারত না।

প্রধানমন্ত্রীর এপিএস পরিচয়ে প্রতারণা : প্রধানমন্ত্রীর এপিএস পরিচয়ে হুমকি দেওয়ার পাশাপাশি ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তা পরিচয়ে প্রতারণাসহ নানা অপকর্ম করতেন আলোচিত রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান সাহেদ। এমনকি ঢাকার বাইরে চলাচলের সময় পেয়েছেন পুলিশি নিরাপত্তা। অপকর্ম ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়ে এক কর্মচারীর পুরো পরিবারকে মামলায় ফাঁসিয়ে হয়রানির অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী আরিফুর রহমান সোহাগ জানান, সাহেদ তাকে বলতেন- ‘আমি এখন প্রধানমন্ত্রীর এপিএসের দায়িত্বে। আমার সঙ্গে এগুলো করে কুলাইতে পারবা ভাইয়া, বল তো। যেহেতু আমি এখন একটা পজিশন হোল্ড করি, যদি চারটা থানায় তোমার নামে কইষা মামলা দেই ঠিক হবে জিনিসটা।’ একসময়ের ব্যক্তিগত কর্মচারী সোহাগকে ফোনে প্রধানমন্ত্রীর এপিএস পরিচয় দিয়ে মামলায় ফাঁসিয়ে দেন সাহেদ। এ হুমকির পর ২০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানায় ২০১৭ সালের এক মামলায় আসামি করা হয়েছিল সোহাগ ছাড়াও তার বৃদ্ধ বাবা-মা এবং তিন বোনকে। আরিফুর রহমান সোহাগ বলেন, সাড়ে তিন বছর ধরে এ মামলায় আমি ঝুলছি।

সব ব্যাংক হিসাব জব্দ : রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. সাহেদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট (হিসাব) জব্দ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে কোনো অ্যাকাউন্ট থাকলে তাও জব্দের আদেশ দেওয়া হয়েছে। গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীন বাংলাদেশ ফিন্যানশিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) থেকে সব ব্যাংকে চিঠি দিয়ে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে সাহেদ ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে সব হিসাব আগামী ৩০ দিন অবরুদ্ধ থাকবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর