শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৩ জুলাই, ২০২০ ০০:১৭

মন্তব্য কলাম

স্বাস্থ্য অধিদফতরের ব্যাখ্যা অযোগ্যতার স্বীকারোক্তি

বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক

স্বাস্থ্য অধিদফতরের ব্যাখ্যা অযোগ্যতার স্বীকারোক্তি

আজ ঘুম ভাঙার পরই পত্রিকায় দুটি তথ্যসমৃদ্ধ, অতীব গুরুত্বপূর্ণ লেখা আমাকে ভীষণভাবে আকৃষ্ট করেছে। একটি লিখেছেন শাহরিয়ার কবির, অন্যটি নঈম নিজাম। সততা, ন্যায়নিষ্ঠা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আপসহীনতার জন্য উভয়কেই আমি পরম শ্রদ্ধার চোখে দেখি। সেদিন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক স্বদেশ রায়ের সঙ্গে কথা বলার একপর্যায়ে তিনি বলেছিলেন- শাহরিয়ার কবির, মুনতাসির মামুন যুগে যুগে  জন্মায় না। বললেন শাহরিয়ার ভাইর অনুপস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এবং অসাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাসী জনতা এক সফল সেনানায়ক থেকে বঞ্চিত হবেন। আমি পুরোপুরি একমত। নঈম নিজাম সাহেবের সঙ্গে আমার সখ্য হয় এক ক্রান্তিলগ্নে। স্বঘোষিত শান্তি কমিটির সদস্য এবং ইতিহাসে একমাত্র দুর্নীতিগ্রস্ত প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি সিনহার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নঈম নিজামও ছিলেন এক প্রত্যক্ষ সহযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধের সরকারকে বিপদমুক্ত রাখার জন্য সে যুদ্ধ ছিল অপরিহার্য। কেননা সিনহা  তখন পাকিস্তানি স্টাইলে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে উৎখাতের ছক আঁকছিলেন। নঈম নিজামের লেখা যেমনি তথ্য এবং যুক্তিতে ভরপুর তেমনি লেখাটিতে সমৃদ্ধি এনেছে সাহিত্যলংকার। বয়সে আমার ছোট হলেও নঈম নিজাম আমারই মতো উত্তম-সুচিত্রা, সন্ধ্যা-হেমন্ত যুগের লোক। যে যুগ ছিল গোটা উপমহাদেশের সংগীত ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের রেনেসাঁর যুগ। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া দুটি গানের উল্লেখ করে তিনি যথার্থই লিখেছেন- এ ধরনের গান আর হবে না। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে উপমহাদেশের কিংবদন্তি সংগীতজ্ঞ হেমন্ত মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন, তাদের প্রস্থানের পর গানে কোনো মেলোডি থাকবে না। নঈম সাহেবও তার লেখনীতে সেই ইঙ্গিত দিয়ে সাহিত্য-সংস্কৃতিতে তার দখলের কথা নিরঙ্কুশভাবে প্রমাণ করলেন। পাশাপাশি এটাও জানান দিলেন যে,  আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরে অন্যান্য দল থেকে সুযোগসন্ধানীরা এসে শুধু জনগণের এবং মুক্তিযুদ্ধের এই দলটিকেই কলুষিত করছেন না, দুর্নীতি এবং অদক্ষরা আধিপত্য বিস্তার করছেন। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদফতরের ব্যাখ্যা নতুন করে তা প্রমাণ করল। কেননা তাদের ব্যাখ্যায় রয়েছে অদক্ষতার নির্লজ্জ স্বীকারোক্তি। ব্যাখায় বলা হয়েছে, রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে এবং জেকেজির সঙ্গে দুটি কারণে চুক্তি করতে হয়েছিল, যার প্রথমটি ছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ। আর দ্বিতীয়টি ছিল এ কারণে যে, তখন বেসরকারি হাসপাতালগুলো করোনা রোগী নিতে চাচ্ছিল না। দ্বিতীয় কারণটি তাদের অযোগ্যতা এবং অদক্ষতার অমার্জনীয় প্রমাণ। কয়েক মাস আগে পশ্চিমবাংলার বেসরকারি কয়েকটি হাসপাতাল একই ধরনের অভিনয় করলে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি সোজাসুজি বলে দিয়েছিলেন, করোনা রোগী ফিরিয়ে দিলে তাদের লাইসেন্স বাতিল করা হবে এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইনে হাসপাতালগুলো সাময়িক অধিগ্রহণ করা হবে। মমতার সতর্কবাণী শুনে বেসরকারি হাসপাতালগুলো ভয়ে লেজ গুটিয়ে ছিল। ১৯৮২-র আইন  আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কেও লাইসেন্স প্রদান এবং বাতিল করার যে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দিয়েছে তা ভারতীয় আইনে প্রদত্ত ক্ষমতা থেকে আলাদা নয়। রিজেন্ট নামক ভুয়া হাসপাতালসহ হাসপাতালগুলো পয়সার প্রস্তাব পেয়ে কিন্তু ঠিকই রোগী নিতে রাজি হলো। তার মানে তাদের নেতিবাচক অবস্থা ছিল ব্ল্যাক মেইলিং দ্বারা সরকার থেকে পয়সা আদায় করা। আইন প্রয়োগ দ্বারা হাসপাতালগুলোকে বাধ্য না করে অর্থের ব্ল্যাক মেইলিং দাবি মেনে নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং অধিদফতর আগ বাড়িয়েই রাজি হয়ে যায়- যার একটিই কারণ হতে পারে, তা হলো মুনাফার হিস্যা। এ প্রসঙ্গে আমার নিজের একটি অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ল। অবহেলার দ্বারা অধ্যাপক মৃদুল চক্রবর্তীর মৃত্যু ঘটনার কারণে আমি ল্যাব এইড হাসপাতালের চেয়ারম্যান এবং অন্য মালিকদের হাই কোর্টের কাঠগড়ায় সারা দিনের জন্য বন্দী রেখেছিলাম এবং তাদের বাধ্য করেছিলাম চক্রবর্তী পরিবারকে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে। পুলিশের আইজিকে নির্দেশ দিয়েছিলাম তাদের বিরুদ্ধে ৩০৪(ক) ধারার অপরাধ তদন্ত করে নরহত্যার অপরাধ হয়ে থাকলে ব্যবস্থা নিতে। সেদিনই বেসরকারি হাসপাতাল মালিকরা ঘোষণা দিলেন- এ অপমান তারা সইবেন না, করবেন ধর্মঘট। পরদিন কোর্ট বসার সঙ্গে সঙ্গেই আমি প্রকাশ্য আদালতে বিজ্ঞ অ্যাটর্নি জেনারেলকে নির্দেশ দিয়েছিলাম- হাসপাতাল মালিকদের দ্বিধাহীন ভাষায় বলে দিতে যে, হরতালে গেলে আমরা আদালত অবমাননার অপরাধে তাদের জেলে পাঠাব। এই  নির্দেশনা শোনার পর তারাও লেজ গুটিয়েছিলেন। আমার সঙ্গে দ্বিতীয় বিচারপতি ছিলেন মাননীয় বিচারপতি গোবিন্দ ঠাকুর। অধিদফতরের দ্বিতীয় ব্যাখ্যা আরও ভয়ঙ্কর এ জন্য যে, তা মন্ত্রণালয়ের শীর্ষজন দুর্নীতির ইঙ্গিতই বহন করে, নইলে কেন তারা লাইসেন্সহীন হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি করতে বলবেন, যা চুক্তি আইনের দৃষ্টিতে অবৈধ এবং অচল। তাদের কথায় আঙ্গুলি যায় মন্ত্রী সচিবের ওপর। শাহরিয়ার কবির বিশ্ব ভ্রমণ করা প্রজ্ঞাবান মানব হিতৈষী বিধায় বিশ্ব আন্তর্জাতিক বিষয়ের ওপর তার জ্ঞান অপরিসীম। তিনি যে চয়নসমূহ উচ্চারণ করেছেন তা অত্যন্ত সঙ্গত। আমার জীবনের এক বড় সময় ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠিত একটি সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলাম। বিধায় আমার নিজ অভিজ্ঞতার আলোকেই বলতে পারি, শাহরিয়ার কবিরের শঙ্কা কত নির্ভুল। তিনি যথার্থই বলেছেন, এর ফলে বাংলাদেশ একটি অবিশ্বাস্য জাতি হিসেবে বিশ্বময় পরিচিত হবে। বিদেশে আমাদের শ্রম বাণিজ্য, রপ্তানি বাণিজ্য পড়বে বড় রকমের ধাক্কায়, আমাদের বিমান কালো তালিকাভুক্ত হতে পারে বহু দেশে, আমাদের লোকেরা ছাত্র বা ভ্রমণ ভিসা পেতেও ঝামেলা পোহাবেন। আমাদের জনদরদি প্রধানমন্ত্রী গত এক দশক নিরলস কার্যক্রম, মানবতা, দূরদৃষ্টি এবং বিচক্ষণতাসহ বহু গুণে গুণান্বিত হয়ে অর্জন করেছেন সারা পৃথিবীর ঈর্ষণীয় প্রশংসা, অকুণ্ঠ শ্রদ্ধাবোধ এবং বহু সম্মাননা তাকে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি দেশকে তুলে দিয়েছেন গৌরবময় উচ্চতায়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কতিপয় লোভী, অদক্ষ ব্যক্তির জন্য যদি সেই গৌরবে ধস নামে তা হবে করোনার চেয়েও ক্ষতিকর জাতীয় দুর্যোগ। নঈম সাহেব আওয়ামী লীগে সুযোগসন্ধানী অনুপ্রবেশকারী বলে যাদের প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী তাদের একজন বলে আওয়ামী লীগের আদেশের প্রতি তার আনুগত্য না থাকাই স্বাভাবিক, যা তিনি ডেঙ্গু মহামারীর সময় মালয়েশিয়া বেড়াতে গিয়ে প্রমাণ করেছেন। আর স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালকের পিতা শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। বিএনপির সময় অনেক গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ছিলেন।  তিনি যে বিএনপি আমলে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় প্রতিষ্ঠিত ছিলেন রেকর্ডই তা বলে। তার পিতা যে শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান  ছিলেন তার প্রমাণ আমার কাছে রয়েছে বলেই আমি এটি লিখতে সাহস পাচ্ছি। নইলে তো মানহানি মামলা খেতে হবে।

হাসপাতালগুলো নারাজ থাকলেও চিকিৎসকরা এবং চিকিৎসা কর্মীরা কখনো নারাজ ছিলেন না, যদিও তাদের উপযুক্ত প্রতিরক্ষা সামগ্রী দেওয়া হয়নি, যা তারা প্রমাণ করেছেন অন্যতম সম্মুখে যোদ্ধা হিসেবে জীবন বাজি রেখে করোনা রোগীদের চিকিৎসা করে, অনেকে নিজের জীবন রেখে চিকিৎসা দান করে। অনেক ডাক্তার, নার্স তো মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন। লোভী হাসপাতাল মালিকরা নারাজ ছিলেন সরকারকে ব্ল্যাক মেইল করার জন্য, যাতে মদদ দিয়েছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্তারা মুনাফায় ভাগ বসানোর জন্য। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের গৌরব ফিরিয়ে আনার জন্য এদের সবাইকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে, বিশ্বকে দেখাতে হবে এদের শাস্তি দেওয়া হয়েছে। তবেই বিশ্বে আমাদের পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি ফিরবে।

লেখক : সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর