শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ২৩:৪১

পাচারকারী হিমুতেই সর্বনাশ

ব্রুনাইয়ে পাচার ৪০০ জন, হাতিয়ে নিয়েছেন ৩৩ কোটি টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক

পাচারকারী হিমুতেই সর্বনাশ

ঋণ ও জমিজমা বিক্রি করে ব্রুনাইয়ে যাওয়ার জন্য টাকা দিয়েছিলেন ৬০ জন। উদ্দেশ্য বিদেশ গিয়ে ভাগ্য ফেরাবেন। কিন্তু ব্রুনাই গিয়ে কোনো কাজ না পেয়ে উল্টো মানবেতর জীবনযাপন শুরু হয়। বাধ্য হয়ে নিজ খরচে দেশে ফিরতে হয় তাদের। পরে জানা যায় ২০১৯ সালে ব্রুনাইয়ে মানব পাচারের মূল হোতা মেহেদী হাসান বিজনের কোম্পানির নামে ভুয়া ডিমান্ড লেটার সংগ্রহ করে ৬০ জনকে ব্রুনাই পাঠায় শেখ আমিনুর রহমান হিমু। ব্রুনাইয়ে চাকরি দেওয়ার নামে মোট ৪০০ লোকের কাছ থেকে প্রায় ৩৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। অথচ তার নিজের কোনো রিক্রুটিং লাইসেন্স নেই, হিমু নজরুল ইন্টারন্যাশনাল সার্ভিস ও হাইওয়ে ইন্টারন্যাশনাল আরএল ব্যবহার করে ব্রুনাইয়ে মানব পাচার করেন। গতকাল বিকালে রাজধানীর টিকাটুলীতে র‌্যাব-৩ কার্যালয়ে এসব কথা জানান র‌্যাব-৩-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল রাকিবুল হাসান। ব্রুনাইয়ে মানব পাচারের ঘটনায় অসংখ্য ভুক্তভোগী র‌্যাব-৩ কার্যালয়ে অভিযোগ করেন। এরই ভিত্তিতে গতকাল দুপুরে রাজধানীর কাফরুল এলাকায় অভিযান চালিয়ে মানব পাচারকারী শেখ আমিনুর রহমান হিমু এবং তার সহযোগী মো. নুর আলম ও বাবলুর রহমানকে গ্রেফতার করে র‌্যাব-৩-এর সদস্যরা। এ সময় হিমুর কাছে একটি বিদেশি পিস্তল ও গুলি ভর্তি ম্যাগাজিন পাওয়া যায়। সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব-৩-এর অধিনায়ক বলেন, ব্রুনাইয়ে মানব পাচারের মূলহোতা মেহেদী হাসান বিজন ও আবদুল্লাহ আল মামুন অপুর অন্যতম সহযোগী হিমু। তিনি দীর্ঘদিন দেশের বাইরে অবস্থান করছিলেন এবং বিজনের সঙ্গে তার ব্যবসায়িক সম্পর্ক। গ্রেফতার হিমু বিজনের চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে ব্রুনাইয়ে মানব পাচার করতেন। হিমু নিজেকে সংসদ সদস্য পরিচয় দিতেন। এ পরিচয়ে তিনি দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বেকার যুবকদের টার্গেট করে ব্রুনাইয়ে উচ্চ বেতনের চাকরির লোভ দেখাতেন। ব্রুনাইয়ে চাকরির কথা বলে প্রতিজনের কাছ থেকে ৩/৪ লাখ টাকা করে নিতেন। কিন্তু ব্রুনাইয়ে কোনো চাকরি না পেয়ে উল্টো জেল খেটে দেশে ফিরতেন ভুক্তভোগীরা। র‌্যাব-৩ প্রধান বলেন, বাংলাদেশি দালাল হিমু ব্রুনাইয়ে ভালো ভালো কোম্পানির কথা বলে মানব পাচার করতেন। কিন্তু ব্রুনাইতে সেসব কোম্পানির কোনো খোঁজ মেলেনি। ব্রুনাইতে প্রায় ২৫ হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক অবস্থান করছেন। এসব শ্রমিকের একটি বড় অংশ মানব পাচারকারী চক্রের মাধ্যমে ব্রুনাই গিয়ে বর্তমানে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ব্রুনাইয়ে বাংলাদেশি মালিকানায় প্রায় তিন হাজার কোম্পানি নিবন্ধিত আছে। যার অধিকাংশই নামসর্বস্ব। এসব কোম্পানি ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে দুর্নীতির মাধ্যমে ব্রুনাই থেকে কর্মসংস্থান ভিসা লাভ করে তা দালালদের মাধ্যমে বাংলাদেশে বিক্রি করে। ব্রুনাইতে যাওয়ার জন্য ১ লাখ ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা থাকলেও মোটা অঙ্কের টাকায় ব্রুনাই যেতে হয়। লে. কর্নেল রাকিবুল হাসান বলেন, আইন অনুসারে ব্রুনাইতে একজন কর্মী সর্বোচ্চ দুই বছর থাকতে পারেন। দুই বছরে অভিবাসন ব্যয়ের টাকা তুলতে না পেরে ভিসার মেয়াদ অতিক্রান্ত করে বাংলাদেশে ফিরে না এসে মানব পাচার চক্রের মাধ্যমে দুই হাজার ব্রু ডলার দিয়ে পার্শ্ববর্তী প্রদেশ হয়ে মালেশিয়ায় পাচার হয়ে যাচ্ছে। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের নামে বর্তমানে কোনো ভিসা দেওয়া হয় না। ব্রুনাই বর্তমানে আন্তর্জাতিক মানব পাচার কার্যক্রমের রুট এবং গন্তব্য হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। রিক্রুটিং এজেন্ট, বাংলাদেশি দালাল মিলে একটি সংঘবদ্ধ চক্র কাজ করছে। এদের উদ্দেশ্য হলো শ্রমিকদের কাছ থেকে মাসিক সুবিধা আদায় করা, শারীরিক নির্যাতন করা এবং তাদের বেকার রেখে দেশে ফিরতে যেতে বাধ্য করা। যাতে তাদের ওয়ার্ক ভিসার বিপরীতে এভাবে আরও কর্মী আনতে পারে। র‌্যাবের এ কর্মকর্তা বলেন, বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের সঙ্গে প্রতারণা ও নির্যাতনসহ বহুমুখী অপরাধ প্রবণতার কারণে ব্রুনাইয়ে সক্রিয় ভিসা দালাল চক্রের মূল হোতা বিজনসহ সাতজনের পাসপোর্ট বাতিলের বিষয়ে বাংলাদেশ হাইকমিশন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানায়। পরবর্তীতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে পাসপোর্ট অধিদফতর বিজনসহ সাতজনের পাসপোর্ট বাতিল করে। মাসে ৪০ হাজার টাকার বেতন, থাকা-খাওয়া, সঙ্গে বোনাস-এমন লোভনীয় চাকরির প্রলোভনে ৩/৪ লাখ টাকার বিনিময়ে ব্রুনাইয়ে মানব পাচার করত হিমু আর তার সহযোগীরা। হিমু কখনো সংসদ সদস্য, কখনো বা অক্সফোর্ড থেকে ডিগ্রি নেওয়া প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী পরিচয় দিয়ে নিজের এজেন্সির মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে অসংখ্য মানুষকে ব্রুনাইয়ে চাকরি দেওয়ার কথা বলে প্রতারণা করেছেন। গত ১০ সেপ্টেম্বর ব্রুনাইয়ে মানব পাচারের শিকার ভুক্তভোগীরা জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ব্রুনাইয়ে অবস্থানকারী বাংলাদেশি দালাল বিজনকে গ্রেফতারের দাবিতে মানববন্ধন করেন। বিজনের নামে দেশে ২০টি মামলা হয়েছে এবং বর্তমানে তিনি বাংলাদেশে আত্মগোপনে আছেন। ব্রুনাইয়ে নামসর্বস্ব তিন হাজার ভুয়া এজেন্সির বিরুদ্ধে শিগগিরই প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে বলেও জানায় র‌্যাব।


আপনার মন্তব্য