শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ২৫ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৪ নভেম্বর, ২০২০ ২৩:২১

ক্রাইম প্যাট্রল দেখে খুনি রাহানুর

ভাবিই ছিলেন মূল টার্গেট, ৩৫ দিনের মাথায় চার্জশিট

নিজস্ব প্রতিবেদক

ক্রাইম প্যাট্রল দেখে খুনি রাহানুর

সাতক্ষীরার ফোর মার্ডার মামলার আসামি এই হত্যাকান্ডের পরিকল্পনা ও কৌশল রপ্ত করেছিলেন ভারতীয় টিভি সিরিয়াল ক্রাইম প্যাট্রল দেখে। মালয়েশিয়া ফেরত রাহানুল ছিলেন ফেনসিডিলে আসক্ত ও বেকার। মাদকাসক্তি এবং আয়-রোজগার না থাকায় ভাবি সাবিনার তুচ্ছ তাচ্ছিল্যপূর্ণ কথা শুনতে হতো তাকে। ভাত খাওয়ার সময়ও খোটা দিতেন ভাবি। বিষয়টি কোনো ভাবেই মানতে পারতেন না রাহানুর। পাশাপাশি সন্তান না হওয়ায় অক্ষমতার দাগ লাগিয়ে ডিভোর্স দেন স্ত্রী ফাহিমা। এটি নিয়েও ছিল মানসিক চাপ। একপর্যায়ে ভাবির গঞ্জনা সহ্য করতে না পেরে তাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন রাহানুর। কিন্তু পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ভাবিসহ হত্যা করেন বড় ভাই শাহিনুর ও তাদের দুই শিশু সন্তান তাছনিম ও সিয়ামকে। এরপরেও রাহানুর স্বপ্ন দেখছিলেন, সেদিনের ঘটনায় বেঁচে যাওয়া শাহিনুরের পাঁচ মাসের শিশু মারিয়া ও ডিভোর্স হওয়া স্ত্রীকে ফিরিয়ে এনে নতুন করে সংসার বাঁধার। সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার হেলাতলা ইউনিয়নের খলসি গ্রামে চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকান্ডের এক মাস পাঁচ দিনের মাথায় গত রবিবার চার্জশিট দাখিল  করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গতকাল দুপুরে ঢাকায় সিআইডি সদর দফতরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত ডিআইজি (খুলনা ও বরিশাল অঞ্চল) শেখ ওমর ফারুক এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, মালয়েশিয়া থেকে ফিরে এসে কোনো কাজ পাচ্ছিলেন না রাহানুর। মাঝখানে কিছুদিন ড্রাইভিংয়ের কাজ করলেও আবার বেকার হয়ে পড়েন। এরপর ১০ মাস আগে স্ত্রী ফাহিমা অক্ষমতার দোহাই দিয়ে তাকে ডিভোর্স দেন। এ নিয়ে প্রচ- মানসিক কষ্টে ছিলেন তিনি। তখন থেকে বড় ভাই শাহিনুরের ঘরে খাওয়া দাওয়া করতে থাকেন। কিন্তু আয় না থাকা ও ফেনসিডিলে আশক্ত থাকায় সব সময় খোটা দিতেন ভাবি। একপর্যায়ে ভাবিকে হত্যার পরিকল্পনা করেন দুই মাদক মামলার আসামি রাহানুর। পরিকল্পনা অনুযায়ী গত ১৪ অক্টোবর রাত সাড়ে ৮টার দিকে দুই বোতল এনার্জি ড্রিঙ্ক স্পিড কিনে তাতে ঘুমের ওষুধ মেশান রাহানুর। কৌশলে তা ভাবি সাবিনা ও ভাতিজা সিয়াম ও ভাতিজি তাছনিমকে খাইয়ে দেন। এরপর বড় ভাইয়ের রুমে টিভিতে আইপিএল ক্রিকেট ম্যাচ দেখতে থাকেন। রাত ১টার দিকে বড় ভাই মাছের ঘের থেকে ফিরে তাকে টিভি দেখতে দেখে বলেন, ‘তুই বিদ্যুৎ বিল দিস না, টিভি দেখছিস কেন?’ তখন রাহানুর বলেন, ‘গত মাসে তো দিয়েছি, এ মাসেও দেব, নাও স্পিড খাও।’ শাহিনুর স্পিড খাওয়ার পর রাহানুর ঘুমাতে চলে যান। রাত সাড়ে ৩টার দিকে একটি তোয়ালে পরে চাপাতি নিয়ে রাহানুর কার্নিশ বেয়ে বড় ভাইয়ের ঘরে প্রবেশ করে দেখতে পান, রুমের দরজা খোলা রেখে শাহিনুর ফ্লোরে শুয়ে আছেন। পাশের রুমের ফ্লোরে শুয়ে আছেন ভাবি ও তিন শিশু। ভাবিকে হত্যা করলে যদি ভাই জেগে যায় এ ভয়ে আগে শাহিনুরকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন। প্রথমে শাহিনুরকে চাপাতির কোপ দিলে নড়াচড়া করে ওঠেন। পরে ভাইয়ের গলা কাটেন। এতেও ভরসা পাচ্ছিলেন না। হাতের রগ কেটে দুই পা গামছা দিয়ে বেঁধে পাশের রুমে যান। সেখানে ভাবি সাবিনাকে প্রথম কোপ দিতেই জেগে গিয়ে চেঁচামেচি শুরু করেন। পরে তার গলা কেটে হত্যা নিশ্চিত করেন। এ সময় জেগে ওঠে ভাতিজা সিয়াম ও ভাতিজি তাছনিম। হত্যাকান্ড ধামাচাপা দিতে তাদেরও হত্যা করেন রাহানুর। আরেক শিশুর বয়স পাঁচ মাস হওয়ায় হত্যা না করেই কার্নিশ বেয়ে বের হয়ে পুকুরে চাপাতি ফেলে নিজের রুমে ঘুমাতে চলে যান তিনি।

সকালে প্রতিবেশী আনিসুরকে ডেকে দরজা ভেঙে কান্নার অভিনয় করতে থাকেন রাহানুর। সিআইডি কর্মকর্তা ওমর ফারুক আরও বলেন, ঘটনার সময় পাশের ঘরে থাকলেও কিছু টের না পাওয়ায় শুরু থেকেই রাহানুরকে সন্দেহ হয় তাদের। পরে রাহানুরকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিন দিনের মাথায় দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। জিজ্ঞাসাবাদে রাহানুর সিআইডিকে বলেছেন, টিভি সিরিয়াল ক্রাইম প্যাট্রল দেখে তিনি হত্যার কৌশল শিখেছেন। পরবর্তীতে সে কৌশলে এই হত্যাকান্ড সংঘটিত করেন। তার কথা মতো রক্তমাখা তোয়ালে ও চাপাতি উদ্ধার করা হয়েছে। লাশের ভিসেরা রিপোর্টে চেতনানাশক ওষুধের অস্তিত্ব মিলেছে।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর