শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৬ এপ্রিল, ২০২১ ২৩:১৯

গণপদত্যাগ ঠেকাতে কমিটি বিলুপ্তি

দাবি বাবুনগরীর অনুসারীদের, হেফাজতের আহ্বায়ক কমিটিতে পরিবারতন্ত্রের অভিযোগ

মুহাম্মদ সেলিম, চট্টগ্রাম

গণপদত্যাগ ঠেকাতে কমিটি বিলুপ্তি

নানা সংকট নিয়ে টালমাটাল হেফাজতে ইসলামের সিনিয়র নেতাদের পদত্যাগ ঠেকাতেই বিলুপ্ত করা হয় কেন্দ্রীয় কমিটি। তবে আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর অনুসারীদের দাবি, হেফাজতে ইসলামের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের গ্রেফতার ঠেকানোর অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। কমিটি বিলুপ্তির পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে সরগরম হেফাজতে ইসলামের দুই গ্রুপ। হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্তি ঘোষণার পর রাতভর চলে আহ্‌বায়ক কমিটি ঘোষণা নিয়ে নাটক। দুই দফায় পাঁচ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করা হয়। ওই কমিটি নিয়েও শুরু হয়েছে অসন্তোষ। গঠিত আহ্‌বায়ক কমিটির পাঁচজন সদস্যের মধ্যে চারজনই আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর নিকটাত্মীয়। আহ্‌বায়ক কমিটি নিয়ে আত্মীয়করণ হওয়ায় এটাকে ‘ফটিকছড়ি সমিতি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন আল্লামা শফী অনুসারীরা।

হেফাজতে ইসলামের সাবেক যুগ্ম-মহাসচিব মাওলানা মাঈনুদ্দীন রুহী বলেন, ‘হেফাজতে ইসলামের কথিত কমিটির অনৈতিক কর্মকান্ডের কারণে পুরো দেশে আলেম সমাজ বাবুনগরীর কমিটিকে বয়কট করছে। অনেকে পদত্যাগ করেছেন এরই মধ্যে। দেশের সব শীর্ষস্থানীয় আলেমের গণপদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার কথা ছিল। এমন পরিস্থিতিতে নিজেদের সম্মান রক্ষা করতে কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আগে থেকেই হেফাজতে ইসলামের এ কমিটিকে আমরা অবৈধ বলে আসছি। কারণ মৃত্যুর আগে আল্লামা শফী হেফাজতে ইসলামের কমিটি গঠন করে দিয়েছেন। আল্লামা শফীর গঠন করা হেফাজতে ইসলামের কার্যক্রম শিগগিরই শুরু হবে।’ বাবুনগরীর অনুসারী এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘গণগ্রেফতার বন্ধের জন্য সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে। দেওয়া হয় সমঝোতার প্রস্তাব। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে সমঝোতা কিংবা নমনীয় হওয়ার কোনো আশ্বাস পাওয়া যায়নি। উল্টো তাদের দেওয়া হয় কড়া বার্তা। সব শেষ শনিবার রাতে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এক নেতার সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসেন হেফাজতে ইসলামের নেতারা। ওই বৈঠকে হেফাজত নেতাদের কাছে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করা হয়। কোনো উপায় না পেয়ে শীর্ষস্থানীয় নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার ঠেকানোর কৌশলের অংশ হিসেবে কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে।’ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেদ্র মোদির বাংলাদেশ সফর ঘিরে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় হেফাজতে ইসলামের নেতা-কর্মীদের চালানো তান্ডব, যুগ্ম-মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হকের সোনারগাঁ কান্ড, আল্লামা আহমদ শফীকে ‘হত্যা’র দায়ে আমির আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীসহ শীর্ষ নেতারা অভিযুক্ত এবং শীর্ষ নেতাদের নামে শতাধিক নাশকতার মামলার খড়্্গ- এসব ঘটনায় চরম সংকটে রয়েছে হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ নেতৃত্ব। এরই মধ্যে পদত্যাগ করেছেন অনেকে। পদত্যাগের ঘোষণার অপেক্ষায় ছিলেন আরও বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতা। ফলে চরম আকার ধারণ করে সংকট। এমন পরিস্থিতি গণপদত্যাগ ঠেকাতে কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। আল্লামা আহমদ শফীর ছেলে এবং হেফাজতে ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা প্রচার সম্পাদক মাওলানা আনাস মাদানী বলেন, ‘বিলুপ্ত হওয়া হেফাজতে ইসলামের কমিটি গঠনের সময় সাংগঠনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। আবার বিলুপ্তির সময় একই রকম পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। অবৈধ এ কমিটির বিষয়ে আমরা এতদিন যা বলে আসছি, বিলুপ্ত করার মাধ্যমে তা সঠিক ছিল বলে প্রমাণিত হয়েছে।’

আহ্‌বায়ক কমিটিতে পরিবারতন্ত্র : রবিবার রাতে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে হেফাজতে ইসলামের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণার পর শুরু হয় আহ্‌বায়ক কমিটি ঘোষণা নিয়ে নাটক। গভীর রাতে আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর পক্ষ থেকে তিন সদস্যবিশিষ্ট আহ্‌বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়, যাতে উপদেষ্টা হিসেবে রাখা হয় বাবুনগরীর মামা ও বিলুপ্ত কমিটির প্রধান উপদেষ্টা আল্লামা মহিবুল্লাহ বাবুনগরীকে। আমির হিসেবে ঘোষণা করা হয় আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীকে। মহাসচিব করা হয় বাবুনগরীর নিকটাত্মীয় আল্লামা নুরুল ইসলাম জিহাদীকে। ভোররাতে আরেক দফা সম্প্রসারণ করা হয় আহ্‌বায়ক কমিটি। এবার মহাসচিব দুই সদস্যের নাম যুক্ত করেন। এতে বাবুনগরীর নিকটাত্মীয় আল্লামা সালাউদ্দিন নানুপুরী এবং অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান চৌধুরীকে সদস্য হিসেবে সংযুক্ত করা হয়। হেফাজতে ইসলামের সাবেক যুগ্ম-মহাসচিব মাওলানা মাঈনুদ্দীন রুহী বলেন, ‘কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্তির পর রাতেই আহ্‌বায়ক কমিটির নামে নাটক শুরু করা হয়। দুই দফায় পাঁচজনের নাম ঘোষণা করেন, যার মধ্যে চারজনই আমিরের নিকটাত্মীয়। এটাকে হেফাজতে ইসলামের কমিটি না বলে ফটিকছড়ি সমিতি বলাই শ্রেয়।’ সদ্য বিলুপ্ত কমিটির শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুফতি হারুন ইজহার বলেন, ‘আমাদের দাবি থাকবে ত্যাগী ও হাক্কানি আলেমদের নিয়ে হেফাজতে ইসলামের কমিটি পুনর্গঠন হোক। যেখানে ব্যক্তি ও দলীয় বিবেচনায় কাউকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে না। সংগঠনের জন্য ত্যাগ ও মেধার ভিত্তিতে পদ দেওয়ার বিষয়টি মূল্যায়িত হবে।’