শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৭ এপ্রিল, ২০২১ ২৩:২১

হেফাজতের ৩১৩ অর্থদাতা চিহ্নিত

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তান্ডবে গ্রেফতার ৬, ওসি বদলি, জামিয়ার ২০ ছাত্র বহিষ্কার, হেফাজতের পক্ষে লেখায় তিন ছাত্রলীগ নেতা বহিষ্কার, হেফাজতের আরেক নেতা টাঙ্গাইলে গ্রেফতার

নিজস্ব প্রতিবেদক

হেফাজতে ইসলামকে অর্থ জোগান দিয়ে বিভিন্ন সময় সহযোগিতা করেছেন এমন ৩১৩ জনকে চিহ্নিত করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এসব টাকা মামুনুল হকের দুই ব্যাংক হিসাবে জমা হয়েছে। গতকাল দুপুরে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) এ কে এম হাফিজ আক্তার সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমরা ৩১৩ ব্যক্তিকে শনাক্ত করেছি যারা হেফাজতকে বিভিন্ন সময় অর্থ দিয়েছেন। মামুনুল হকের দুই ব্যাংক হিসাবে ৬ কোটি ৪৭ লাখ টাকা লেনদেনের হিসাব পাওয়া গেছে।’ গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, এখন পর্যন্ত হেফাজতের তান্ডবের ঘটনায় ২১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন একজন। রিমান্ডে রয়েছেন আটজন। হেফাজতের প্রতিটি ঘটনার তদন্ত চলছে। যাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাচ্ছে তাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত এটা পরিষ্কার যে পরিকল্পনামাফিক তারা নাশকতার কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। সবচেয়ে দেখার বিষয় হচ্ছে, রাজনৈতিক দলের নেতা হয়েও একটি অরাজনৈতিক প্ল্যাটফরম ব্যবহার করে অপকর্মগুলো করেছেন।

হেফাজতে ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা আমির প্রয়াত আল্লামা আহমদ শফীকে পদ থেকে সরিয়ে দিতে জুনায়েদ বাবুনগরীর বাসায় বৈঠক হয়েছিল বলেও মামুনুল হক পুলিশকে জানিয়েছেন। অর্থ ব্যয়ের খাতের বিষয়ে হাফিজ আক্তার বলেন, ‘বড় একটি অংশের টাকা বিদেশ থেকে এসেছে। তবে যারা টাকাগুলো পাঠিয়েছেন তাদের অর্থের উৎস সম্পর্কে আমরা খোঁজ নিচ্ছি। দেশে কিংবা বিদেশে তাদের কর্মকান্ডের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।’

এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, জুনায়েদ বাবুনগরীর ছেলের বিয়েতে একটি বৈঠক হয়েছিল। ওই বৈঠকে আহমদ শফীকে সরিয়ে দিয়ে বাবুনগরী আমির হিসেবে নিজেকে আবির্ভাব করার পরিকল্পনা করেন। পরে হাটহাজারী মাদরাসায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে শফী অনুসারীদের মাদরাসা থেকে বিতাড়িত করেন। এসব বিষয়ে আরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মামুনুল হককে পুনরায় রিমান্ডে আনা হতে পারে বলেও তিনি জানান। প্রসঙ্গত, ১৮ এপ্রিল মোহাম্মদপুরের জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদরাসা থেকে মামুনুল হককে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। মতিঝিল শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতের তান্ডব ও গেল ২৬ মার্চ বায়তুল মোকাররমের ঘটনার পৃথক দুই মামলায় বর্তমানে তিনি সাত দিনের রিমান্ডে আছেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তান্ডবের ঘটনায় গ্রেফতার ৬ :  ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তান্ডবের ঘটনায় হওয়া মামলায় আরও ছয়জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। সোমবার সকাল থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত পরিচালিত অভিযানে জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়। এ নিয়ে তান্ডবের ঘটনায় ৩৭৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গতকাল সকালে জেলা পুলিশের বিশেষ শাখা থেকে গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে পাঠানো প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, তান্ডবের ভিডিও ফুটেজ ও স্থিরচিত্র দেখে ২৮ মার্চ হেফাজতের ডাকা হরতালে জেলা শহরের টি এ রোড এলাকায় তান্ডবে জড়িত থাকায় সাদেকপুর ইউনিয়ন ছাত্র ওলামা ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক কারি মো. মোজাম্মেল হক ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের আশুগঞ্জে অবরোধ ও টায়ারে আগুন দিয়ে পিকেটিং করায় আশুগঞ্জ উপজেলা হেফাজতে ইসলাম ও ইমাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মুফতি ওবায়দুল্লাহসহ ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার সবাই হেফাজতে ইসলামের কর্মী।

জামিয়ার ২০ ছাত্রকে বহিষ্কার : এদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হেফাজতে ইসলামের কর্মী-সমর্থকদের চালানো তান্ডবে জড়িত অভিযোগে ২০ মাদরাসাছাত্রকে বহিষ্কার করেছেন কর্তৃপক্ষ। সোমবার তাদের বহিষ্কার করা হয়। তারা সবাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরের জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদরাসার ছাত্র। মাদরাসার সিনিয়র শিক্ষক আবদুল হক বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

বহিষ্কৃত ছাত্ররা হলেন- কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের সভাপতি আশেকে এলাহী, সাধারণ সম্পাদক আবু হানিফ, মিছবাহ উদ্দিন, আশরাফুল ইসলাম, আলাউদ্দিন, মকবুল হোসেন, রফিকুল ইসলাম, মুবারক উল্লাহ, বুরহানুদ্দীন, আবদুল্লাহ আফজাল, জুবায়ের, হিজবুল্লাহ রহমানী, শিব্বির আহমেদ, জুবায়ের, ইফতেখার আদনান, সাইফুল ইসলাম, সোলাইমান, রাকিব বিল্লাহ, তারিক জামিল ও কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক মো. হাবিবুল্লাহ বাহার। তাদের বয়স ২০ থেকে ২২ বছর। এর আগে ৫ এপ্রিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেস ক্লাবে এসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তান্ডবের ঘটনায় দলীয় কোনো নেতা-কর্মী বা মাদরাসাছাত্র জড়িত নয় বলে দাবি করেন হেফাজতে ইসলামের সদ্যবিলুপ্ত কেন্দ্রীয় কমিটির নায়েবে আমির মাওলানা সাজিদুর রহমান। ওই দিন তান্ডবে ক্ষতিগ্রস্ত প্রেস ক্লাব পরিদর্শনে আসে হেফাজতে ইসলাম ও জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদরাসার প্রতিনিধি দল। এর আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের বিরোধিতা করে ২৬ থেকে ২৮ মার্চ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ব্যাপক তান্ডব চালান হেফাজতে ইসলামের কর্মী-সমর্থকরা। এসব ঘটনায় ৫৫টি মামলা হয়েছে।

হেফাজতের পক্ষ নিয়ে লেখালেখি, ছাত্রলীগের তিন নেতা বহিষ্কার : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে হেফাজতের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন লেখালেখি করার অভিযোগে গোপালগঞ্জে তিন ছাত্রলীগ নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তারা হলেন গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার উলপুর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জামিল আহমদ ও ফয়সাল সরদার এবং ক্রীড়া সম্পাদক শেখ রোমান আহম্মেদ। গতকাল গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা ছাত্রলীগ সভাপতি শরিফুল ইসলাম সিকদার ও সাধারণ সম্পাদক মোল্লা রনি হোসেন কালু স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ তথ্য জানানো হয়েছে। ওই বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, ওই তিন নেতাকে দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ওসিকে রংপুরে বদলি : ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হেফাজতে ইসলামের তান্ডবের এক মাসের মাথায় সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুর রহিমকে রংপুর রেঞ্জে বদলি করা হয়েছে। সোমবার বিকালে পুলিশ সদর দফতর থেকে এক আদেশে তাকে রংপুর রেঞ্জে সংযুক্ত করা হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অপরাধ) মো. রইছ উদ্দিন ওসি রহিমের বদলির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

হেফাজতের আরেক নেতা টাঙ্গাইলে গ্রেফতার : টাঙ্গাইল থেকে নুরুল ইসলাম নোমানী নামে হেফাজতে ইসলামের আরেক নেতাকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। সোমবার রাতে তাকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার ব্যক্তি হেফাজতের নেতা বলে দাবি করছে পুলিশ। তিনি রাজধানীর ভাসানটেক এলাকার একটি জামে মসজিদের খতিব বলে জানা গেছে।

গতকাল ডিবির মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার মো. আসাদুজ্জামান রিপন গণমাধ্যমকে বলেন, নুরুল ইসলাম শাপলা চত্বর ও মোদিবিরোধী বিক্ষোভ মামলার আসামি। তাকে ডিবি কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।