শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৯ এপ্রিল, ২০২১ ২৩:২৯

ঈদ ঘিরে যত শঙ্কা

মানুষের যাতায়াত সীমিতসহ আরও কিছু দিন কঠোর বিধিনিষেধ কার্যকরের তাগিদ

মাহমুদ আজহার ও রফিকুল ইসলাম রনি

ঈদ ঘিরে যত শঙ্কা
ফলের বাজারেও স্বাস্থ্যবিধি মানার বালাই নেই। গতকাল রাজধানীর কারওয়ান বাজার থেকে তোলা ছবি -বাংলাদেশ প্রতিদিন

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার কিছুটা কমে এলেও সামনে ঈদযাত্রা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। তাদের মতে, ঈদ যাতায়াতে কী পরিকল্পনা নেওয়া যায় তা এখনই ভাবতে হবে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে। বন্ধ রাখতে হবে গণপরিবহন। মানুষের যাতায়াত সীমিত রাখতে হবে। নইলে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের হার আরও বাড়তে পারে। মৃত্যুর হারও বাড়তে পারে। অবিলম্বে ‘কার্যকর’ লকডাউন বাস্তবায়নে মানুষকে অন্তত আরও কিছু দিন ‘ঘরবন্দী’ করে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

জনস্বাস্থ্যবিদদের আশঙ্কা, চলমান নামমাত্র লকডাউনের বৈজ্ঞানিক কোনো যুক্তি নেই। লকডাউনের নামে মানুষের দেদার চলাচলের প্রবণতায় দেশজুড়ে আরও বাড়বে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ। তা সামলানো সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। বিশেষ করে ঈদের পর বাংলাদেশে করোনা বড় ধরনের আঘাত করতে পারে। এজন্য সরকারকে এখনই নতুন কৌশল নিয়ে এগোতে হবে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপপরিচালক ডা. মুখলেসুজ্জামান হিরো বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘সামনে ঈদুল ফিতর। মানুষ বাড়ি যাবে। শহর থেকে গ্রাম, গ্রাম থেকে শহরে ছুটবে মানুষ। এতে যেসব এলাকা আগে সংক্রমিত হয়নি সেসব এলাকায় মানুষের মধ্যে সংক্রমণ বাড়বে। একে ঠেকাতে হলে সরকারকে আরও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। কষ্টকর হলেও প্রয়োজনে এবারও গণপরিবহন বন্ধ রাখতে হবে। নইলে পরবর্তী পরিস্থিতি সামলানো কঠিন হয়ে পড়বে।’ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনাভাইরাসের হটস্পট ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ বিভাগীয় শহরগুলো। দেশের সব জেলা থেকেই এসব এলাকায় কর্মজীবী মানুষের বসবাস। এর মধ্যে পোশাকশ্রমিকদের বড় একটি অংশ গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে বাস করে। ঈদের ছুটিতে তারা বাড়ি গেলে এ সংক্রমণ আবারও বিস্তার লাভ করতে পারে। সারা দেশে এ সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে এর ঊর্ধ্বমুখী গতির লাগাম টানা কঠিন হয়ে পড়বে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আশার কথা জানিয়ে এও বলেছেন, চলমান লকডাউনের কারণে কমেছে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার। হাসপাতালগুলোতেও রোগীর চাপ কমছে। ফাঁকা হচ্ছে আইসিইউ। এগুলো আশার কথা হলেও প্রতিবেশী ভারতের করোনা পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, দেশে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়লে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। রোগীর চাপ বাড়লে অক্সিজেন ও আইসিইউ সংকট দেখা দেয়। চিকিৎসার জন্য হাসপাতালের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে মানুষ, যেখানে আইসিইউ পাওয়া ছিল সোনার হরিণের মতো। এ পরিস্থিতি বিবেচনায় গত ১৪ এপ্রিল থেকে এক সপ্তাহের জন্য ‘কঠোর লকডাউন’ জারি করে সরকার। এক দফা বাড়ানোর পর বুধবার রাত ১২টায় শেষ হয়। এরপর এ বিধিনিষেধ আরও এক সপ্তাহ বাড়ানো হয়। তবে লকডাউনে সব বিপণিবিতান, ব্যাংক-বীমা, শেয়ারবাজার, অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট চালু রাখা হয়। কিন্তু বন্ধ রয়েছে গণপরিবহন।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার (ডবিøউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাবেক আঞ্চলিক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, ‘লকডাউনের উদ্দেশ্য মানুষের চলাচল সীমিত করে করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু বাংলাদেশে লকডাউনে অনেক কিছুই খোলা রাখা হয়। আবার রাস্তায় কোথাও কোথাও কঠোরতা অবলম্বন করা হয়। লকডাউন ন্যূনতম দুই সপ্তাহ আর আইডিয়াল হচ্ছে তিন সপ্তাহ। লকডাউনে করোনা সংক্রমণ যাতে ছড়াতে না পারে সেজন্য কোনো ধরনের শিথিলতা কাম্য নয়।’

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঈদে মানুষ বাড়ি গেলে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করে। ঈদের জামাতে নামাজ পড়ে। সেটা মসজিদেও হতে পারে বা ঈদগাহেও হতে পারে। অনেকেই কোলাকুলি করে। এবারও ঈদের নামাজ আদায়ের ব্যাপারে কিছু দিকনির্দেশনা দিয়েছে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীন ইসলামিক ফাউন্ডেশন। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এবার ঈদেও যাতায়াত ও ঘোরাঘুরি সীমিত করতে হবে। বিয়েসহ সামাজিক সব কর্মসূচি স্থগিত রাখতে হবে। পর্যটন কেন্দ্রগুলো বন্ধ রাখতে হবে। যদিও কভিড-১৯বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি পর্যটন কেন্দ্রগুলো বন্ধের সুপারিশ আগে থেকেই করে আসছে।

এদিকে দেশজুড়ে চলছে সর্বাত্মক ‘কঠোর’ লকডাউন। ৫ মে পর্যন্ত চলবে এ লকডাউন। মানুষও ছুটছে নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে। গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও বিকল্প নানা পরিবহনে রাজপথ সয়লাব। যানজটের চিরচেনা রূপে রাজধানী। শপিং মল, মার্কেট, দোকানসহ সব বিপণিবিতানে এখন উপচে পড়া ভিড়। অনেকেই মাস্ক ব্যবহার করলেও মানছে না সামাজিক দূরত্ব। কেউ কেউ থুতনিতে মাস্ক পড়ছে। মুভমেন্ট পাস ছাড়াই চলছে সবাই। পুলিশের তল্লাশি চৌকিগুলোতেও নেই আর নজরদারি। স্বাস্থ্যবিধি মানার জন্য বিভিন্ন সংস্থার অভিযানও থেমে গেছে। রাজধানীজুড়েই যানজট। রাস্তায় মানুষের ঢল।

সরেজমিন দেখা গেছে, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে চলমান ‘লকডাউনে’ গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও সরকারি-বেসরকারি যানবাহনে সয়লাব ঢাকার রাজপথ। ব্যক্তিগত গাড়ি, পণ্যবাহী গাড়ি, সিএনজি রিকশাসহ নানা পরিবহনে যানজটের চিরচেনা দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। গতকাল রাজধানীর কুড়িল বিশ্বরোড, শাহজাদপুর, বাড্ডা, রামপুরা, মালিবাগ, মৌচাক, কাকরাইল, বিজয়নগর, পল্টন, মগবাজার, শাহবাগ, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, বিজয় সরণি, সাত রাস্তার মোড়সহ বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা গেছে যানজটের পুরনো দৃশ্য। দেদার প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, মিনি ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, রিকশা, ঠেলাগাড়ি। ফুটপাথেও বেড়েছে সাধারণ মানুষের চলাচল। অনেকের মুখে নেই মাস্ক। কারও কারও মাস্ক থাকলেও ছিল থুতনিতে। সামাজিক দূরত্বের বালাই ছিল না। এসবের তদারকিরও কেউ নেই। সরকারের কঠোর নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ জনস্বাস্থ্যবিদদের।

এই বিভাগের আরও খবর