শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৯ এপ্রিল, ২০২১ ২৩:৩৩

কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে ঢেলা মাছের পোনা উৎপাদন

মাহমুদ আজহার

কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে ঢেলা মাছের পোনা উৎপাদন

বিলুপ্তপ্রায় ঢেলা মাছের কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে দেশে প্রথমবারের মতো পোনা উৎপাদনের সফলতা অর্জন হয়েছে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) বিজ্ঞানীরা ময়মনসিংহে স্বাদুপানি গবেষণা কেন্দ্রে গত দুই বছর টানা গবেষণা করে এ সফলতা অর্জন করেন। গবেষণায় দেখা যায়, একটি স্ত্রী ঢেলা মাছ প্রায় ৬-৮ গ্রাম ওজনের হলেই প্রজনন উপযোগী হয়। প্রজনন উপযোগী পুরুষ ঢেলা মাছ আকারে অপেক্ষাকৃত ছোট (৪-৫ গ্রাম) হয়। প্রকৃতিতে স্ত্রী ঢেলা মাছের চেয়ে পুরুষ ঢেলা অপেক্ষাকৃত কম পাওয়া যায়। প্রকৃতিতে স্ত্রী ও পুরুষ ঢেলাপ্রাপ্তির

অনুপাত হচ্ছে ৪:১ অর্থাৎ ৪টি স্ত্রী ঢেলার সঙ্গে মাত্র একটি পুরুষ ঢেলা থাকে। অন্য মাছের মতো এখন ঢেলা মাছও চাষাবাদের চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘পুষ্টিসমৃদ্ধ ঢেলা মাছের কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পোনা উৎপাদন কৌশল উদ্ভাবিত হওয়ায় মাঠপর্যায়ে এর পোনা উৎপাদন ও প্রাপ্যতা সহজতর হবে। ঢেলা মাছকে সহজেই চাষের আওতায় আনা সম্ভব হবে।’

ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা যায়, স্থানীয় ব্রহ্মপুত্র নদসহ বিভিন্ন উৎস্য থেকে ঢেলা মাছের পোনা সংগ্রহ করে কেন্দ্রের পুকুরে তা নিবিড়ভাবে প্রতিপালন করা হয়। প্রতিপালনকালে এর খাদ্য ও খাদ্যাভ্যাস পরীক্ষা করা হয়। এরপর সে অনুযায়ী খাবার সরবরাহ করা হয়। বছরব্যাপী জিএসআই ও হিস্টোলজি পরীক্ষণের মাধ্যমে এর সর্বোচ্চ প্রজনন মৌসুম নির্ধারণ করা হয়। হিস্টোলজি পরীক্ষাকালে দেখা যায়, ঢেলা মাছের সর্বোচ্চ প্রজনন মৌসুম হচ্ছে মে-জুন মাস। তবে এপ্রিল মাসের শেষের দিক থেকে এর প্রজননকাল শুরু হয়। ডিম ধারণক্ষমতা হচ্ছে প্রতি গ্রামে ৭০০-৮০০টি।

জানা যায়, পুষ্টিসমৃদ্ধ ঢেলা মাছের পোনা উৎপাদনের গবেষক দলে ছিলেন কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এ এইচ এম কোহিনুর, প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শাহ আলী, ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. সেলিনা ইয়াসমিন ও বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. রবিউল আওয়াল। তাদের গবেষণায় ১০ জোড়া ঢেলা মাছকে হরমোন প্রয়োগ করা হয়। হরমোন প্রয়োগের ৮-৯ ঘণ্টা পর ডিম ছাড়ে। ২২ ঘণ্টা পর নিষিক্ত ডিম থেকে রেণু পোনা উৎপাদিত হয়। এ সময় ডিম নিষিক্ততার পরিমাণ ছিল প্রায় শতকরা ৮০ ভাগ। উৎপাদিত পোনা বর্তমানে ইনস্টিটিউটের হ্যাচারিতে প্রতিপালন করা হচ্ছে।

জানা যায়, অন্যান্য দেশীয় মাছের তুলনায় ঢেলা মাছে প্রচুর খনিজ পদার্থ আছে। প্রতি ১০০ গ্রাম ঢেলা মাছে ভিটামিন এ ৯৩৭ আই ইউ, ক্যালসিয়াম ১২৬০ মি.গ্রাম এবং জিঙ্ক ১৩.৬০%, যা অন্যান্য দেশীয় মাছের তুলনায় অনেক বেশি। ভিটামিন এ শিশুদের রাতকানা রোগ থেকে রক্ষা করে, ক্যালসিয়াম হাড় গঠনে সহায়তা করে। তাছাড়া জিঙ্ক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, যা করোনার সময়ে খুবই উপযোগী।

মৎস্য ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা বলেন, একসময় দেশের নদ-নদী ও হাওর বিলে প্রচুর পরিমাণে ঢেলা মাছ পাওয়া যেত। পরবর্তীতে জলবায়ু পরিবর্তন, অতি আহরণ ও জলাশয় সংকোচনের কারণে ঢেলা মাছের প্রজনন ও বিচরণ ক্ষেত্র বিনষ্ট হয়ে যায়। এ মাছটি বিলুপ্তির তালিকায় চলে আসে। ফলে ঢেলা মাছ এখন প্রায় দু®প্রাপ্য এবং উচ্চমূল্যে বাজারে বিক্রি হয়। ইনস্টিটিউট কর্তৃক কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পোনা উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হওয়ায় ঢেলা মাছকে সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে এবং চাষের মাধ্যমে এর উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।

এদিকে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট গবেষণা পরিচালনা করে পাবদা, গুলশা, টেংরা, বৈরালীসহ ইতিমধ্যে ২৪টি দেশীয় ও বিলুপ্তপ্রায় মিঠা পানির মাছের প্রজনন ও চাষাবাদ কৌশল উদ্ভাবন করেছে। ফলে এসব মাছের উৎপাদন ও প্রাপ্যতা সম্প্রতি বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিসংখ্যান মতে, ২০০৮-২০০৯ সালে চাষের মাধ্যমে দেশীয় ছোট মাছের উৎপাদন ছিল ৬৭ হাজার মে. টন। পোনা উৎপাদন ও চাষাবাদ প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হওয়াতে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৮-১৯ সালে হয়েছে ২ লাখ ৫০ হাজার মে. টন। গত ১২ বছরে চাষে দেশীয় মাছের উৎপাদন বেড়েছে ৪ গুণ। ইনস্টিটিউটে বর্তমানে পিয়ালী, কাজলী, বাতাসি, কাকিলা, রানী ও গাং টেংরাসহ আরও ১০টি মাছ নিয়ে গবেষণা পরিচালনা করা হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে মৎস্য ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ আরও বলেন, ‘বিপন্ন প্রজাতির সব দেশীয় মাছকে খাবার টেবিলে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশক্রমে ইনস্টিটিউটে সাম্প্রতিককালে ছোট মাছের গবেষণা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।’

এই বিভাগের আরও খবর