শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১১ মে, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১০ মে, ২০২১ ২৩:১৯

সরকার-ব্যাংকের সহায়তা না পেলে শিল্প ধ্বংস হবে

------ মোস্তফা কামাল মহিউদ্দিন

সরকার-ব্যাংকের সহায়তা না পেলে শিল্প ধ্বংস হবে
Google News

সরকার ও ব্যাংকগুলোর সহায়তা না পেলে শিল্পকারখানা বাঁচবে না, বরং শিল্প ধ্বংস হবে বলে মনে করেন বাংলাদেশ পেপার মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএমএ) মহাসচিব মোস্তফা কামাল মহিউদ্দিন। এই শিল্পোদ্যোক্তা মনে করেন, দেশি-বিদেশি চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র বন্ধ না করা গেলে দেশের  স্বয়ংসম্পূর্ণ কাগজশিল্প বন্ধ হয়ে যাবে। শিল্প সুরক্ষা না পেলে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ ফিরিয়ে দেওয়া কঠিন হবে। এর সঙ্গে স্বার্থান্বেষী মহলের অসাধু কর্মকান্ড, বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার অপব্যবহার, অবৈধভাবে আমদানি ও বাজারজাতকরণে দেশের স্বয়ংসম্পূর্ণ কাগজশিল্প এখন বিপর্যয়ের মুখোমুখি। চোরাচালান ও শুল্ক ফাঁকিতে অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে কাগজশিল্প। একটি কুচক্রী মহল পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণের নামে দেশীয় মিল থেকে কাগজ সংগ্রহ না করে বিনা শুল্কে আমদানির আত্মঘাতী উদ্যোগ নিয়েছে। এতে শিল্পের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে। এ কাগজ খোলাবাজারে বিক্রি হতে পারে। এতে রাজস্ব ক্ষতি আরও বাড়বে। দেশের অর্থ বিদেশে চলে যাবে।

গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। মোস্তফা কামাল মহিউদ্দিন কাগজশিল্পের অবদান তুলে ধরে বলেন, দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে কাগজশিল্প। দেশে ছোট-বড় মিলে ১০৬টি কাগজ উৎপাদনকারী শিল্প প্রকল্প রয়েছে, যার বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা ১৬ লাখ টন, যা স্থানীয় চাহিদার তুলনায় ২ দশমিক ৫০ গুণ বেশি। এক দশক আগেও যেখানে আমদানির মাধ্যমে চাহিদা পূরণ করা হতো, সেখানে বর্তমানে সব ধরনের কাগজ ও কাগজ-জাতীয় পণ্য উৎপাদনে দেশ সক্ষমতা অর্জন করেছে। দেশের কাগজকলগুলো সব ধরনের কাগজ ও কাগজ-জাতীয় পণ্যের চাহিদা মিটিয়ে বিশ্বের প্রায় ৩০টি দেশে রপ্তানি করছে। কাগজ উৎপাদন বাংলাদেশে বর্তমানে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ শিল্প খাত।

তিনি বলেন, কাগজশিল্প ও সভ্যতা উন্নয়নের সূচক। শিক্ষা-সংস্কৃতির বিকাশ ছাড়াও দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে কাগজশিল্প খাত অবদান রাখছে। কাগজশিল্প খাতে প্রত্যক্ষভাবে ১৫ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। পরোক্ষভাবে ৬০ লাখ মানুষের জীবিকা নির্ভর করছে। প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকার পুঁজি বিনিয়োগ হয়েছে। দেশের ৩০০ উপশিল্পের সম্পৃক্ততা রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- মুদ্রণ, প্রকাশনা, কালি প্রস্তুত, ডেকোরেশন, প্যাকেজিং ও বাঁধাই শিল্প খাত। আমদানিবিকল্প শিল্প হিসেবে এ খাত বিশাল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় করছে। কাগজশিল্প প্রকল্পগুলো রিসাইক্লিং পদ্ধতিতে বাতিল কাগজ ব্যবহার করে কাগজ উৎপাদন করে থাকে। ফলে দেশের মূল্যবান বনজ সম্পদ রক্ষা পাচ্ছে এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকছে। তবু এ শিল্পের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। সামনে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ঘটানোর যে পরিকল্পনা তা নস্যাৎ করতে সব ক্ষেত্র থেকে এ গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। এ শিল্প এখন বিপন্ন হওয়ার সম্মুখীন। অন্যান্য শিল্প খাতও ধ্বংসের পথে।

মোস্তফা কামাল মহিউদ্দিন বলেন, বিশ্বের সব দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতি ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। ১০৬টি কাগজশিল্প কারখানার মধ্যে প্রায় ৮০টি বন্ধ হয়ে গেছে। বন্ধ হওয়ার কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে- গত দেড় বছরে স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। ফলে কাগজের ব্যবহার নেই বললেই চলে। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও কাগজের ব্যবহার সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। সারা বছরে মাত্র এক থেকে দেড় টন কাগজ উৎপাদন হচ্ছে। আবার কাগজ উৎপাদনের কাঁচামাল পাল্পসহ অন্যান্য উপকরণের দাম বিশ্ববাজারে বেড়েছে। উৎপাদনকারী দেশগুলো পাল্পের দাম প্রতি টনের ৪০০ মার্কিন ডলার থেকে বাড়িয়ে ৯০০ ডলার করেছে। এর সঙ্গে বিভিন্ন দেশে লকডাউনের কারণে কনটেইনার পাওয়া যাচ্ছে না। পেলেও ভাড়া নিচ্ছে কয়েক গুণ বেশি। রপ্তানিকারকরা শিপমেন্ট করতে পারছেন না। এমনকি চার থেকে ছয় মাসেও কোনো কোনো কাঁচামাল আমদানি করা যাচ্ছে না। একসময় রিসাইক্লিং পদ্ধতিতে ওয়েস্ট পেপার বা ব্যবহৃত কাগজ দিয়ে নতুন করে কাগজ উৎপাদন করা যেত। করোনায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ব্যবহৃত কাগজ রপ্তানি বন্ধ করেছে।

বিপিএমএ মহাসচিব বিদ্যমান সমস্যা দূরীকরণে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, যেমন সহায়তা দরকার সরকার তা দিচ্ছে না। বাড়তি ভ্যাট ও কর আদায় হচ্ছে। ব্যাংকগুলো সুদ মওকুফ করছে না। এ ছাড়া ব্যাংকগুলো মূলধনি ঋণ ও প্রণোদনার ঋণ দিচ্ছে না। উচ্চ হারের গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিলে লোকসান গুনতে হচ্ছে। ভৌতিক ও উদ্ভট বিলে বিপাকে পড়েছেন শিল্পোদ্যোক্তারা। বিগত দিনে পাঠ্যপুস্তকে ব্যবহারের জন্য দেশি মিলগুলো গুণগত মানসম্পন্ন কাগজ সরবরাহ করে এসেছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কাগজশিল্প আমদানিবিকল্প, রপ্তানিমুখী ও পরিবেশবান্ধব শিল্প খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। প্রতি বছর দরপত্রের মাধ্যমে এনসিটিবি ৮০ হাজার টন কাগজ ও ৪০ কোটি মুদ্রিত বই কেনে। বিপিএমএ সদস্যরা ২০ বছর ধরে এনসিটিবির চাহিদা অনুযায়ী মানসম্পন্ন কাগজ সঠিক মূল্যে যথাসময়ে সরবরাহ করে আসছে। বন্ড সুবিধায় আমদানি হওয়া কাগজ ও কাগজ-জাতীয় পণ্য খোলাবাজারে বিক্রি হচ্ছে। এতে সরকার প্রতি বছর বড় অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে।

মোস্তফা কামাল মহিউদ্দিনের মতে, বন্ড সুবিধায় আমদানি হওয়া কাঁচামাল হিসেবে কাপ স্টোক পেপার, ওজিআর পেপার, স্টিকার পেপার, আর্ট পেপার কার্ড, ডুপ্লেক্স বোর্ড, কোটেড পেপার, লাইনার পেপার, মিডিয়াম পেপার, প্যাকিং পেপারের আমদানি শুল্ক-কর ২৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হোক। বন্ড সুবিধায় বিনা শুল্কে আমদানি হওয়া কাগজ খোলাবাজারে বিক্রি বন্ধে এনবিআর বিভিন্ন সময় ব্যবস্থা নিলেও অবৈধ কার্যকলাপ বন্ধ হয়নি। কিন্তু সরকার বিপুল অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে। বিপুল সম্ভাবনাময় কাগজশিল্প রক্ষায় বন্ড সুবিধার কাগজ আমদানি বন্ধ করা প্রয়োজন। বিনা শুল্কে কাগজ আমদানির সুযোগ দেওয়া হলে স্থানীয় ও আমদানি হওয়া কাগজের মধ্যে তীব্র বৈষম্যের সৃষ্টি হবে।

এই বিভাগের আরও খবর