শিরোনাম
শুক্রবার, ৮ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ টা

নৌকার দৌড়ে এগিয়ে বিতর্কিতরা

নৌকা চান রোহিঙ্গাদের ভোটার করা চেয়ারম্যান, রাজাকারের নাতি, বিএনপি নেতা, নারী নির্যাতন মামলার আসামি জেলা সাধারণ সম্পাদকের স্বাক্ষর জাল করে তালিকা পাঠালেন পিরোজপুরের সভাপতি আউয়াল

রফিকুল ইসলাম রনি

নৌকার দৌড়ে এগিয়ে বিতর্কিতরা

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীক প্রত্যাশী বিতর্কিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর কার্যালয়ে অভিযোগের স্তূপ। নৌকাপ্রত্যাশী অনেক প্রার্থীর বিরুদ্ধে রয়েছে টাকার বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের ভোটার বানানোর অভিযোগ। নৌকা পেতে চান যুদ্ধাপরাধীর সন্তান ও নাতিরা। এ ছাড়া ধর্ষণ মামলার আসামি, দলীয় নেতা-কর্মীদের হত্যার মদদদাতা, আগে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়া, সরকারি অর্থ লোপাটসহ নানা অভিযোগে অভিযুক্তরাও প্রার্থী হতে চান। একই সঙ্গে পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের স্বাক্ষর জাল করে কেন্দ্রে তালিকা পাঠানোরও অভিযোগ রয়েছে জেলা সভাপতির বিরুদ্ধে। তৃণমূল নেতা-কর্মীরা অভিযোগ করেছেন, স্থানীয় এমপি ও কিছু প্রভাবশালী নেতাকে ‘ম্যানেজ’ করে বিতর্কিতরাই নৌকা পাওয়ার দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন। যে কোনো মূল্যে নৌকা পেতে তারা মরিয়া। তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত লবিংয়ে ব্যস্ত। বিএনপি দলীয়ভাবে অংশগ্রহণ না করায় ‘নৌকা’ পেলেই বিজয় চূড়ান্ত মনে করছেন তৃণমূল নেতারা। তাই নৌকার জন্য মরিয়া তারা।

গতকাল দ্বিতীয় ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চূড়ান্ত মনোনয়ন শুরু করেছে আওয়ামী লীগ। সকালে গণভবনে সভানেত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে সংসদীয় বোর্ড এবং স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধি মনোনয়ন বোর্ডের যৌথ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে একটি সংসদীয় আসনের উপনির্বাচনের প্রার্থী, দুটি উপজেলা, ১১টি পৌরসভার মেয়র এবং রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়। মনোনয়ন নিয়ে অভিযোগের স্তূপ দলীয় সভানেত্রীর কার্যালয়ে। এসব অভিযোগপত্রে উঠেছে বিতর্কিতদের দৌড়ঝাঁপের চিত্র।

সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার ধুবিল ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে জামায়াত নেতার ছেলে মিজানুর রহমান তালুকদারকে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী করা হয়েছে। এ নিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। তার বাবা একসময় জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এমনকি ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগ না করেও ছাত্রলীগ নাম ব্যবহার করে ফেস্টুন দেওয়ায় নেতা-কর্মীরা চরম ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন। তার পরিবার জামায়াত-শিবির, বিএনপি এমনকি হিজবুত তাওহীদের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত রয়েছে বলে অভিযোগ। এ নিয়ে এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। বান্দরবানের লামা উপজেলার রূপসীপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী বর্তমান চেয়ারম্যান ছাচিং প্রু মারমা। তাঁর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ছয়টি অভিযোগ করা হয়েছে। এগুলো হলো- ধর্ষণ, টাকার বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের ভোটার করা ও জন্মসনদ বাণিজ্য, ভূমিহীনদের ঘর দিতে ঘুষ নেওয়া, সাংবাদিক নির্যাতন, রাস্তার ক্ষতিপূরণের টাকা আত্মসাৎ, সৌরবিদ্যুতের প্যানেল বিতরণে বাণিজ্য। এর মধ্যে ধর্ষণ ও সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় মামলা হয়েছে।

সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার খাজরা ইউপির বর্তমান চেয়ারম্যান শাহনেওয়াজ ডালিম। তিনি গদাইপুর গ্রামের রাজাকার ও যুদ্ধাপরাধী মামলার আসামি মৃত মোজাহার সরদারের ছেলে। তার বড় ভাই মৃত আ ম আবদুল আলীম সরদার আশাশুনি উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ছিলেন। মেজো ভাই জুলফিকার আলী জুলি আশাশুনি       উপজেলা বিএনপির যুগ্ম-সম্পাদক, সেজো ভাই আবদুস সালাম বাচ্চু উপজেলা বিএনপির সদস্য। রাজাকার সন্তান দলীয় মনোনয়ন চাওয়ায় এলাকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। খাজরা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল কুদ্দুস বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘ডালিমের বাবা মোজাহার সরদার ছিলেন কুখ্যাত রাজাকার। মুক্তিযুদ্ধের সময় নওশেরকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে সেনা ক্যাম্পে নির্মমভাবে হত্যা করেন রাজাকার মোজাহার সরদার। ২০০৯ সালে মোজাহার সরদারের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা হয়েছিল। মামলা শেষ হওয়ার আগেই তিনি মারা গেছেন। বঙ্গবন্ধুর নৌকা কোনো স্বাধীনতাবিরোধী পরিবারের সন্তান পাক রণাঙ্গনের একজন যোদ্ধা হিসেবে তা চাই না।’ শাহনেওয়াজ ডালিম ৮ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শরবতকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা মামলার প্রধান আসামি। ২০২০ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার বাসা থেকে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছিলেন। ডালিম পাঁচটি বোমা বিস্ফোরণ মামলা, তিনটি হত্যা-ধর্ষণ ও আগুনে পুড়িয়ে হত্যা মামলা এবং একাধিক চাঁদাবাজি মামলার আসামি। তার বিরুদ্ধে এলাকায় ঘের মালিকদের থেকে লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। ডালিম আসন্ন ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে আবারও মনোনয়ন চেয়েছেন। এ নিয়ে এলাকাবাসী ও দলীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়ে ডালিমের ফোন নম্বরে একাধিকবার কল এবং এসএমএস পাঠালেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। কক্সবাজারের রামু উপজেলার জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান কামাল শামসুদ্দিন আহমেদ প্রিন্স। তার বিরুদ্ধে দলীয় সভানেত্রীর কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক শামসুল আলম। প্রিন্সের বিরুদ্ধে দলীয় নেতা-কর্মী হত্যাকারীদের মদদদান, প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর প্রদানে প্রতিজন থেকে ১০ হাজার করে টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেছেন তিনি। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের মামলা রয়েছে। বিতর্কিত এ ব্যক্তিকে নৌকা না দেওয়ার জন্য দলীয় সভানেত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তিনি। পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুল হাকিম হাওলাদারের স্বাক্ষর জাল করে কেন্দ্রে তালিকা জমা দেওয়া হয়েছে। সেখানে জেলা সভাপতি এ কে এম আবদুল আউয়ালের স্বাক্ষরও রয়েছে। তবে জেলা সভাপতি এ নিয়ে মুখ খোলেননি। সাধারণ সম্পাদকের স্বাক্ষর জাল করার বিষয়টি প্রথমে বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আফজাল হোসেনকে জানিয়েছেন। পরে দলের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম ও সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে অবহিত করেছেন। এ প্রসঙ্গে অ্যাডভোকেট আবদুল হাকিম হাওলাদার অভিযোগ করে বলেন, ‘জেলা থেকে যে তালিকা জমা দেওয়া হয়েছে সে তালিকায় আমি স্বাক্ষর করিনি।’ বিষয়টি নিয়ে জেলা সভাপতির সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি। এ প্রসঙ্গে জেলা সভাপতি এ কে এম আবদুল আউয়ালকে একাধিকার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার পূর্ব জুড়ী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে বিজয়ী হন সালেহ উদ্দিন আহমেদ। তিনি এর আগেও দুবার চেয়ারম্যান ছিলেন। কিন্তু এবার তৃণমূল আওয়ামী লীগের প্রস্তাবিত প্রার্থী তালিকায় নাম নেই তাঁর। স্থানীয় এমপি ও মন্ত্রীর সঙ্গে দূরত্ব থাকায় তাঁকে এ তালিকায় রাখা হয়নি বলে জানিয়েছেন একাধিক সূত্র। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ও সিলেট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদকের কাছে আলাদা অভিযোগপত্র পাঠিয়েছেন সালেহ উদ্দিন। ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার তালমা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী ফিরোজ খান। তাঁর বিরুদ্ধেও লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগ দেওয়া হয়েছে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুর রহমানের কাছেও। লিখিত অভিযোগে ফিরোজ খানকে নগরকান্দা উপজেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি এবং তিনি রাজাকার পরিবারের সদস্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার দোয়ারাবাজার ইউনিয়ন পরিষদে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী আবুল মিয়া। আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে জমা দেওয়া একটি লিখিত অভিযোগে আবুল মিয়াকে রাজাকারের নাতি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও একজন মুক্তিযোদ্ধাকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ তোলা হয়েছে।

সর্বশেষ খবর