শনিবার, ২১ মে, ২০২২ ০০:০০ টা

মূল্যস্ফীতির চাপে দিশাহারা মানুষ

নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ ভয়াবহ সংকটে

রুকনুজ্জামান অঞ্জন

মূল্যস্ফীতির চাপে দিশাহারা মানুষ

রাজধানীর একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরিরত মির্জা ইলিয়াসের মাসিক বেতন প্রায় ৪০ হাজার টাকা। এই বেতন থেকে ১৫ হাজার টাকা বাড়ি ভাড়া দেওয়ার পর যে ২৫ হাজার টাকা হাতে থাকে, তা দিয়েই তার সংসারের সব খরচ, দুই মেয়ের শিক্ষা ব্যয় চালাতে হয়। কিন্তু দুই মাস ধরে সেটি সম্ভব হচ্ছে না। চাল-আটা, তেল-ডালের খরচ বেড়ে যাওয়ায় সংসারে অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে। ফলে ছোট মেয়ের প্রাইভেট টিউটরের বেতন বাকি পড়েছে। বড় মেয়েটির চোখের চিকিৎসার জন্য ডাক্তার যে ওষুধ ও টেস্ট দিয়েছিল সেটিও করা সম্ভব হয়নি। এখন সংসারের খাবার খরচ কমাবেন না-কি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের খরচ কাটছাঁট করবেন সেই চিন্তায় দিশাহারা এই বেসরকারি চাকরিজীবী। মূল্যস্ফীতির চাপ এভাবেই দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির নির্দিষ্ট আয়ের মানুষকে ভয়াবহ সংকটে ফেলে দিয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের বিকল্প নির্বাহী পরিচালক মাহবুব আহমেদ বলেন, মূল্যস্ফীতি এমন একটি সংকট যেটা সরাসরি মানুষকে দুর্ভোগে ফেলে। এক্ষেত্রে দরিদ্র ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাদের খাদ্য খরচ কমাতে হয়, অন্য খাতে খরচ কমাতে হয়। একটা অ্যাডজাস্টমেন্টে যেতে হয় অথবা অন্য কোনোভাবে আয় বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হয়। সেটিও সম্ভব না হলে সোনা-দানা বা অন্য কোনো জিনিসপত্র বিক্রি করে, ঋণধার করে সংসারের খরচ জোগাতে হয়।

সাবেক এই সিনিয়র সচিব আরও বলেন, বাংলাদেশে যে মূল্যস্ফীতি এটা মূলত আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার কারণে হচ্ছে। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ কিছু অব্যবস্থাপনাও আছে। এটা এ মুহূর্তে একটা বিরাট সমস্যা। বিশ্বব্যাপীও এটা বড় সংকট তৈরি করছে।

মূল্যস্ফীতির অস্থিরতা বিশ্বজুড়ে : বৈদেশিক মুদ্রার সংকট ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সহিংস বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে শ্রীলঙ্কায় সরকার পতন ঘটেছে। তিউনিসিয়া, ঘানা, দক্ষিণ আফ্রিকা ও মরক্কোর অবস্থাও ভালো নয় বলে অক্সফোর্ড ইকোনমিকস সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে সতর্ক করেছে। মূল্যস্ফীতির কারণে ডলারের দাম বাড়ায় ব্যাপক দরপতন ঘটেছে পাকিস্তান ও তুরস্কের মুদ্রার। পাকিস্তানে এরই মধ্যে ডলারের দাম ২০০ রুপি ছাড়িয়েছে। দেশটির সরকার বিলাসি পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করেছে। এমন কি ইউরোপ, আমেরিকা, রাশিয়ার মতো দেশগুলোতেও মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বগামী। রাশিয়ায় মূল্যস্ফীতির হার ১৭ থেকে ১৮ শতাংশের কাছাকাছি। এই দেশগুলোতে সাধারণ মানুষের মধ্যে অস্থিরতা বাড়ছে। বাংলাদেশেও মূল্যস্ফীতির প্রভাব আর ডলারের দাম নিয়ে শুরু হয়েছে অস্থিরতা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সরবরাহ চেইনে সংকট সৃষ্টি হওয়ায় সারা বিশ্বেই মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। জ্বালানি ও ভোজ্য তেলসহ কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে প্রায় দুই থেকে তিনগুণ। এর সঙ্গে ইন্দোনেশিয়ার পামতেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা এবং ভারতের গম রপ্তানি বন্ধের ঘোষণার পর বিশ্ববাজারে আরেক দফা বেড়েছে সংশ্লিষ্ট পণ্যের দাম। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) পূর্বাভাস, এ বছর খাদ্যমূল্য ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার কারণে আমদানিনির্ভর পণ্যগুলোর মূল্য সমহারে বেড়েছে দেশের বাজারে। ফলে সরকারের হিসেবে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের ধারেকাছে থাকলেও বাস্তবে সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব পড়েছে এর কয়েকগুণ বেশি।

অর্থনীতিবিদরা জানান, যেহেতু মূল্যস্ফীতি এখন এক নম্বর সমস্যা; সে কারণে প্রবৃদ্ধি অর্জনের চেয়েও সরকারকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে। কারণ সাধারণ মানুষ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশ না ৭ শতাংশ- এটা নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। কিন্তু চাল-ডাল-তেলের দাম বাড়লে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাদের দুর্ভোগ বাড়ে। এখন এই মূল্যস্ফীতি যদি নিয়ন্ত্রণ না করা যায়, তাহলে সামাজিক বৈষম্য বাড়বে, দরিদ্রতাও বাড়বে। এতে বাংলাদেশেও সামাজিক অস্থিরতা তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। 

সংকট বাড়ছে বাংলাদেশেও : নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম দফায় দফায় বাড়ার পরও সরকারি পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী গত মার্চ মাসের তুলনায় এপ্রিল মাসে দেশে খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি কমেছে। গত বুধবার প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, এপ্রিলে খাদ্যপণ্যে ৬ দশমিক ২৪ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়েছে। মার্চ মাসে এই হার ছিল ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ। তবে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে মূল্যস্ফীতি কিছুটা বেড়ে ৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ হয়েছে বলে জানিয়েছে সরকারি সংস্থাটি। মাহবুব আহমেদ বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ে পরিসংখ্যান ব্যুরোর এই তথ্য বাস্তবতা নির্দেশ করে না। বাস্তবে মূল্যস্ফীতি অনেক বেশি। বিবিএস যখন পরিসংখ্যানটা নিয়েছে, সেটা আগের ডাটা- তারা এতদিনে প্রকাশ করেছে। বর্তমান ডাটা যখন হিসাব করা হবে, তখন মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে। এই বাস্তবতা স্বীকার করেই সরকারের এমন উদ্যোগ নেওয়া উচিত যাতে মূল্যস্ফীতির প্রভাব দরিদ্র মানুষের ওপর কমানো যায়। মূল্যস্ফীতির এই হিসাব নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন নাগরিক প্ল্যাটফরমের কনভেনর ও বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। সম্প্রতি নাগরিক প্ল্যাটফরম আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, বিবিএসের দেওয়া মূল্যস্ফীতির হিসাব বাস্তবসম্মত ও বিজ্ঞানসম্মত নয়। মূল্যস্ফীতি এখন ১২ শতাংশ হওয়া অসম্ভব কিছু নয়। দেবপ্রিয় বলেন, বিবিএস ২০০৫-২০০৬ সালের ভোক্তাদের মাথায় রেখে মূল্যস্ফীতি ঠিক করে। ১৭ বছর পরে সেই মানুষদের পরিবর্তনকে তারা ধরছে না। গ্রামপর্যায়ে মূল্যস্ফীতি শহরের চেয়ে বেশি। দেবপ্রিয় আরও বলেন, বিশ্ববাজারে বৃদ্ধি পাওয়া উচ্চ মূল্যের পণ্য বাংলাদেশে এখনো আসেনি। সেই পণ্য দেশে এলে দাম আরও বাড়বে। পাশাপাশি টাকার বিনিময় হারের অবমূল্যায়ন হতে থাকলে অবশ্যই আমদানি করা সুদের পণ্যের দাম বাজারে আরও বেশি হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বেশি থাকায় বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের বেশি ডলার খরচ করে পণ্য আমদানি করতে হচ্ছে। ফলে বাড়তি দামে আনা পণ্য যখন দেশে সরবরাহ করা হচ্ছে, তখন তার দামও পড়ছে বেশি। আবার আমদানি ব্যয় বাড়ার কারণে ডলারের চাহিদা বাড়ছে। এতে ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাচ্ছে। টাকার মান কমে গেলে রপ্তানি খাত সুবিধা পেলেও সমস্যায় পড়ে আমদানি খাত। বাংলাদেশ যেহেতু আমদানিনির্ভর দেশ সে কারণে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে পণ্যের দাম বেড়ে যায়। এতে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ে নিম্ন আয়ের মানুষ।

যেভাবে চাপে ফেলে মূল্যস্ফীতি : ধরা যাক একটি পরিবারে মাসে এক কেজি ডাল লাগে। প্রতি কেজি ডালের দাম ১৩০ টাকা হিসাবে ওই পরিবারের ১৩০ টাকা খরচ বরাদ্দ রয়েছে। এখন ওই ডালের দাম বেড়ে ১৬০ টাকায় উঠলেও ওই পরিবারের যদি আয় না বাড়ে, তবে হয় পরিবারটির ডালের ব্যবহার কমাতে হবে, অথবা তাকে বাড়তি আরও ৩০ টাকা যোগ করতে হবে। এই যে এক কেজি ডাল যে দামে কেনা হতো এখন কিনতে গিয়ে তার চেয়ে আরও বাড়তি ৩০ টাকা দিতে হচ্ছে, এটিই মূল্যস্ফীতি। এর ফলে পরিবারটিকে হয় ডাল ব্যবহারে খরচ বাড়াতে হবে, নয়তো ডালের ব্যবহার কমাতে হবে। বাংলাদেশের নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের আয় মূল্যস্ফীতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে না বলে এক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে খাদ্যপণ্যের ব্যবহার কমাতে হয়। এতে তার পুষ্টির অভাব সৃষ্টি হয়। পরিবারটি যে অবস্থায় ছিল মূল্যস্ফীতি তাকে সেই অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে দারিদ্র্যের দিকে নিয়ে যায়।

মাহবুব আহমেদ বলেন, আন্তর্জাতিক সংকটের কারণে উ™ভূত মূল্যস্ফীতি সামাল দিতে সরকার এরই মধ্যে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। বিদ্যুৎ, সার ও জ্বালানি তেলে ভর্তুকি বাড়িয়েছে। এই ভর্তুকি অব্যাহত রাখতে হবে। যদিও ভর্তুকি অনেক বেশি কিন্তু আপাতত এটা আরও কিছু দিন চালিয়ে যেতে হবে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য যেগুলো স্বল্পমূল্যে দরিদ্র মানুষকে দেওয়া হচ্ছে, সেটাও অব্যাহত রাখতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম সম্প্রসারণ করতে হবে। আগামী বাজেটে এ জন্য সরকারের প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রাখতে হবে। এ ছাড়া নীতিনির্ধারণী সুদের হার এবং আমাদের মুদ্রাবিনিময় হারকে এমনভাবে সমন্বয় করতে হবে যেন এ দুটো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।

এই বিভাগের আরও খবর

সর্বশেষ খবর