মঙ্গলবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৪ ০০:০০ টা

ব্লক ইটে ঝুঁকছে বাংলাদেশ

অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স

জিন্নাতুন নূর

বাংলাদেশে বায়ুদূষণের অন্যতম প্রধান কারণ ইটভাটা থেকে সৃষ্ট ধোঁয়া। পরিবেশ দূষণ রোধে সরকারি নির্মাণকাজে পোড়ামাটির ইটের বদলে ব্লক ইট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রচলিত ইটের বিকল্প হিসেবে ব্লক ইট ব্যবহারের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাধিকবার নির্দেশ দিয়েছেন। সরকার ২০২৮ সালের মধ্যে পোড়া ইটের বদলে শতভাগ ব্লক ইট ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে। সরকারি নির্মাণে ব্লক ইট ব্যবহারের ব্যাপারে সংশোধিত রোডম্যাপ অনুমোদন করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে সারা দেশের অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়। অর্থাৎ পরিবেশ দূষণ থেকে বেরিয়ে আসতে ব্লক ইটের দিকে ঝুঁকছে বাংলাদেশ। পরিবেশ অধিদফতরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বর্তমানে সরকারি যে ভবনগুলোর অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে, সেগুলো নির্মাণে ব্লক ইট ব্যবহারের বিষয়টি উল্লেখ করা হচ্ছে। নতুন যে প্রকল্পগুলো আসছে সেখানেও ব্লক ব্যবহার করা হবে। সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল বিভাগ তাদের প্রকল্প পরিকল্পনায় ব্লক ব্যবহারের বিষয়টি উল্লেখ করছে।

সাধারণত দেশে বাড়িঘর নির্মাণ ও সরকারি ভবনের দেয়াল, সীমানাপ্রাচীর, গ্রামীণ সড়ক নির্মাণে পোড়া মাটির ইট ব্যবহার করা হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এসব ইট তৈরির জন্য কৃষিজমির ওপরের অংশ থেকে মাটি কেটে নেওয়া হয়। এতে কৃষিজমির উর্বরতা নষ্ট হয়। ইট পোড়ানোর সময় ভাটার চিমনি থেকে নির্গত ধোঁয়া পরিবেশদূষণের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এ জন্য প্রচলিত ইটের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে ২০২৭ সালের মধ্যে সরকারি উন্নয়নকাজে শতভাগ ব্লক ইট ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। আগে এই লক্ষ্যমাত্রা ২০২৫ সাল পর্যন্ত নির্ধারণ করা হলেও ব্লক ব্যবহারের ধীরগতির কারণে লক্ষ্যমাত্রা পরে ২০২৭ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এরই মধ্যে ২০১৯ সালে ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন করা হয়েছে। সংশোধিত আইনে সরকারি নির্মাণ, মেরামত ও সম্প্রসারণের কাজে ব্লক ইটের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এরই মধ্যে দায়িত্ব গ্রহণের পর নতুন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী পরিবেশ দূষণ রোধে ১০০ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। এর অংশ হিসেবে তিনি ঢাকা ও তার আশপাশে ৫০০ অবৈধ ইটভাটা গুঁড়িয়ে দেওয়ার কথা বলেছেন। তিনি জানান, ২০২৮ সালের পর দেশে মাটির তৈরি ইট আর থাকবে না। সব জায়গায় বালু ও সিমেন্টের তৈরি ব্লক ইট ব্যবহার করতে হবে। চার বছরের মধ্যে এসব ইট পোড়ানো বন্ধ করার জোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

সাবের হোসেন চৌধুরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ব্লক ইটের সুবিধা হচ্ছে এখানে কৃষি মাটি ব্যবহার করা যাবে না। প্রতি বছর ১৩ কোটি ম্যাট্রিক টন মাটি সনাতন পদ্ধতিতে ইট পোড়ানোর কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। ব্লক ইটে বালু, ফ্লাই অ্যাশ আছে। এতে কৃষিকাজে ব্যবহৃত মাটি বেঁচে যাচ্ছে। ব্লক ইটে কোনো দূষণ হয় না। কারণ এটি পোড়ানো হয় না। এরই মধ্যে বেশ কয়েকজন উৎপাদনকারী ব্লক ইট উৎপাদনে এগিয়ে এসেছেন। তাদের কাজের পরিধি বাড়াচ্ছেন। বর্তমানে তারা ৩০০ কোটি ব্লক ইট উৎপাদন করতে পারেন। ঢাকার আশপাশে আমরা যে ৫০০ ইটভাটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছি তারা গড়ে প্রতি বছর ৫০ লাখ পোড়ানো ইট উৎপাদন করেন। যা চলে বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত। এই ৫০০ ইটভাটা বছরে ২৫০ কোটি ইট উৎপাদন করে। অন্যদিকে এই ৫০০ ইটভাটার পোড়ানো ইটের চেয়ে ব্লক ইট পরিমাণে বেশি উৎপাদিত হচ্ছে। আমরা সরববরাহ ও চাহিদার মধ্যে সমন্বয় রাখতে চাচ্ছি। অর্থাৎ যে পরিমাণ পোড়ানো ইট কমে যাচ্ছে আমরা তার চেয়ে বেশি ব্লক ইট উৎপাদন করছি। ব্লক উৎপাদনকারীরা জানান, চাহিদা থাকলে তারা এক বছরের মধ্যে এক হাজার কোটি পিস ব্লক ইট উৎপাদন করতে পারবেন। সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে স্থানীয় সরকার, শিক্ষা অধিদফতর, স্বাস্থ্য আমাদের মূল ব্যবহারকারী। তাদের সঙ্গে আমরা সমন্বয় করেছি। এবার স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার কিলোমিটার সড়ক ব্লক ইটে তৈরি করবে। সরকার নিজেই যদি ব্লক ইট ক্রয় শুরু করে তাহলে একপর্যায়ে এর ব্যবহার বাড়বে এবং খরচও কমবে। জানা যায়, আদালতের হিসাবে দেশে ২ হাজারের মতো অবৈধ ইটভাটা রয়েছে। ঢাকার চারপাশে ১ হাজার অবৈধ ইটভাটা রয়েছে। ১০০ দিনের কর্মসূচিতে দিনে গড়ে তিন থেকে চারটি ইটভাটা গুঁড়িয়ে দেওয়ার কথা বলেছেন পরিবেশমন্ত্রী। সে হিসাবে ১০০ কর্মদিবসে লক্ষ্য হচ্ছে ৫০০ ইটভাটা গুঁড়িয়ে দেওয়া। তিনি আরও জানান, আমরা সংশোধিত একটি রোডম্যাপ তৈরি করেছি। সে অনুযায়ী ২০২৮ সালে আমরা পোড়ানো ইটের বদলে শতভাগ ব্লকে চলে যেতে পারব। এ ক্ষেত্রে উন্নয়ন কাজ যেন বাধাগ্রস্ত না হয় এবং ইটের দাম যাতে বেড়ে না যায় সেদিকে লক্ষ্য রাখা হবে।

ব্যবহার বাড়ছে ব্লক ইটের : সাধারণত ব্লক হচ্ছে বালু, সিমেন্ট, ফ্লাই অ্যাশ বা অন্য কোনো উপাদানে তৈরি করা ইট যা মাটি ছাড়াই এবং না পুড়িয়ে তৈরি করা যায়। হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট গত কয়েক দশক ধরে প্রচলিত পরিবেশবান্ধব ব্লক ইট উদ্ভাবন করছে। সেখানকার কর্মকর্তাদের মতে, এই ব্লক মূল্যসাশ্রয়ী, ওজনে হালকা, ভূমিকম্প, আগুন ও লবণাক্ততা প্রতিরোধী, অতি উষ্ণ ও অতি শীতল আবহাওয়ার বিপরীতে নাতিশীতোষ্ণ পরিবেশ দেয়। এ ছাড়া এসব ব্লক তৈরিতে কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি ব্যবহারের পরিবর্তে নদীর তলদেশের মোটা বালু ও সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দেশের সব সরকারি নির্মাণকাজে অন্তত ৬০ শতাংশ ব্লক ইট ব্যবহার করার কথা থাকলেও প্রচারণা কম থাকায় এর ব্যবহার বাড়ছে ধীরে ধীরে। সরকারি নির্মাণকাজের বড় অংশই বাস্তবায়ন করে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর। সংস্থাগুলোর নির্মাণকাজে ব্লক ইটের ব্যবহার আরও বাড়ানো প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। এ সম্পর্কে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের প্রকৌশলীরা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, আগের থেকে ব্লক ইটের ব্যবহার বেড়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকারি কাজের রেট শিডিউলে ব্লক ইট ধরা না থাকায় তা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। তবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর কিছু প্রকল্পের উন্নয়নকাজে পোড়া মাটির ইটের পরিবর্তে বিভিন্ন ধরনের ব্লক ইট ব্যবহার করছে। পরিবেশ অধিদফতরের উপপরিচালক (বায়ুমান ব্যবস্থাপনা) মোহাম্মদ আবদুল মোতালিব বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এখন সরকারি যে প্রকল্পগুলো নির্মাণ হবে সেখানে আর পুরনো ইট ব্যবহারের সুযোগ নেই। সরকারি দফতরগুলো ব্লক ইটের ব্যবহার জানলেও সাধারণ মানুষ এখনো এ ব্যাপারে তেমন জানেন না। তাই সরকারি বিভিন্ন বিভাগকে ব্লক ব্যবহারের প্রচারণা চালাতে নির্দেশ দেওয়া আছে। জানা যায়, সারা দেশে পরিবেশবান্ধব ব্লক উৎপাদনের জন্য ২০৯টি ব্লক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। অন্যদিকে ইট তৈরির জন্য সারা দেশে প্রায় ৮ হাজারের বেশি ইট ভাটা। এসব ভাটায় বছরে প্রায় ২২ দশমিক ৭১ বিলিয়ন পোড়া ইট হয়। এ জন্য ২৫ বিলিয়ন কিউবিক ফুট টপ সয়েল পোড়াতে ৩ মিলিয়ন টন কয়লা ও ১ দশমিক ৯ মিলিয়ন টন জ্বালানি কাঠ পোড়ানো হয়। যা থেকে মারাত্মক ক্ষতিকর ৯ দশমিক ৮ মিলিয়ন টন গ্রিন হাউস গ্যাস হয়। বাংলাদেশে প্রতিবছর কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ প্রায় ৪০ মিলিয়ন টন, যার ২২ দশমিক ৫ শতাংশের নিঃসরণ হয় ইট ভাটা থেকে।

সর্বশেষ খবর