শিরোনাম
প্রকাশ : ১৯ নভেম্বর, ২০২০ ০৯:৩৭
আপডেট : ১৯ নভেম্বর, ২০২০ ০৯:৪২

কাবাঘরে হাজরে আসওয়াদ প্রতিস্থাপনে বিশ্বনবীর সমাধান

মুফতি রুহুল আমীন কাসেমী

কাবাঘরে হাজরে আসওয়াদ প্রতিস্থাপনে বিশ্বনবীর সমাধান

পবিত্র মক্কা শহরে অবস্থিত আল্লাহর ঘর বায়তুল্লাহ  শরিফের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে মাতাফ থেকে দেড় মিটার উঁচুতে প্রতিস্থাপিত, ৮ ইঞ্চি দৈর্ঘ্য ও ৭ ইঞ্চি প্রস্থের হাজরে আসওয়াদ বা কালো পাথর। হাদিসের বর্ণনায় বেহেশতি পাথর। নবীজি (সা.) বলেন, এই বেহেশতি পাথরের আলো যদি নিভিয়ে দেওয়া না হতো, তাহলে সূর্যের আলোও তার সামনে ম্লান হয়ে যেত। যা পৃথিবীর সর্বপ্রথম মানব-মানবী হজরত আদম ও হাওয়া (আ.) থেকে এই পৃথিবীতে বিদ্যমান রয়েছে। প্রাক-ইসলামী পৌত্তলিক সমাজেও এ পাথরকে সম্মান করা হতো যথাযথ মর্যাদায়। আগে এ পাথরটি শুভ্র ও আলোকময় ছিল। চুম্বনকারী ইমানদারের গুনাহ শুষে নিয়ে এ পাথরটি কালো আকার ধারণ করেছে।

তখন ৬০৫ খ্রিস্টাব্দ। প্রিয় নবী বিশ্বনবী মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ৩৫ বছর বয়সে পদার্পণ করলেন। মা-বাবা, দাদা হারানো যুবক ‘মুহাম্মদ’ মক্কার কোরাইশদের মাঝে সর্বোচ্চ আদর্শ, সচ্চরিত্র, সম্মান, বিশ্বস্ততায়, প্রশংসিত ও আল আমিন উপাধিতে ভূষিত হয়ে কোরাইশ বংশের সবার হৃদয়ের মণিকোঠার সিংহাসনে আরোহিত। ঠিক তখনই কোরাইশ বংশের সব গোত্র সম্মিলিতভাবে আপন মনে কাবাঘর পুনর্নির্মাণের অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ সম্মানের কাজ করে চলছে। কোথাও পারস্পরিক হিংসা বিদ্বেষ ও বিভেদ পরিলক্ষিত হয়নি। কিন্তু সমস্যা বেধে গেল হাজরে আসওয়াদ পুনঃস্থাপন করাকে কেন্দ্র করে। প্রতি গোত্রই হাজরে আসওয়াদ পুনঃস্থাপনের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে বদ্ধপরিকর। এ নিয়ে বাগ্বিতন্ডা চরম আকার ধারণ করল। কেননা সব গোত্রের লোকের দৃষ্টিতেই হাজরে আসওয়াদ স্থাপনই  প্রকৃত প্রাধান্যের নিদর্শন। অতএব প্রতিটি গোত্রের লোকেরা নিজ ধারণা অনুযায়ী এ বিরল মর্যাদা লাভের দাবিতে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করল। কোরাইশদের সব গোত্রেরই উগ্র রণমূর্তি দেখে মক্কা নগরীর লোকেরা আতঙ্কে শিউরে উঠল। এভাবেই চার দিন অতিবাহিত হয়ে গেল। কোনোভাবেই কোনো মীমাংসার লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল না। আরবের প্রথা অনুসারে রক্তপূর্ণ পাত্রে হাত ডুবিয়ে কোরাইশরা মৃত্যুর প্রতিজ্ঞা করল। চারদিকে অস্ত্রের ঝনঝনানি শুরু হয়ে গেল। এ সময় জলদগম্ভীর স্বরে উচ্চারিত হলো স্থির হও, স্থির হও, আমার কথা শোনো- এই বলে দীর্ঘ শূদ্র বৃদ্ধ আবু উমাইয়া উভয় বাহু ঊর্ধ্বে তুলে বললেন, স্থির হও, শান্ত হও। এ বৃদ্ধের স্বর শুনে সবাই ঘুরে দাঁড়াল। তিনি বললেন, একটা ভালো কাজ, ভালোয় ভালোয় সমাধানের পর তোমরা মন্দের অশুভ সূচনা কোরো না। শোনো, যে আগামীকাল ভোরে সবার আগে কাবা চত্বরে প্রবেশ করবে, এ বিবাদের মীমাংসার দায়িত্ব তার ওপর অর্পণ করে তোমরা তোমাদের এ কলহের অবসান ঘটাও। বৃদ্ধ আবু উমাইয়ার প্রস্তাবে সবাই সম্মত হয়ে রুদ্ধশ্বাসে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগল, পরদিন ভোরে কে সর্বপ্রথম কাবা চত্বরে প্রবেশ করে। সব পক্ষই নানাবিধ  চিন্তাভাবনায় অস্থির। হাজরে আসওয়াদ স্থাপনের গৌরব মর্যাদা ও সম্মান কার পক্ষে যাবে? সবাই অপলক নেত্রে পথের দিকে চেয়ে আছে। এমন সময় হঠাৎ অজস্র কণ্ঠধ্বনি উঠল- মারহাবা মারহাবা, এ যে আমাদের ‘আল আমিন’ আমরা এর সব ফয়সালায় সম্মত আছি। আমাদের কারও কোনো আপত্তি নেই।

যুবক আল আমিন দৃঢ় পায়ে এগিয়ে এলেন, অত্যন্ত শান্তশিষ্টভাবে সবার বক্তব্য শুনলেন। বিষয়টির জটিলতা ও ভয়াবহতা অনুধাবন করে, বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়ে বললেন, যেসব গোত্র হাজরে আসওয়াদ স্থাপনের মর্যাদালাভে আগ্রহী তারা নিজ নিজ গোত্রের একজন প্রতিনিধি নির্বাচিত করুক। পরামর্শ মোতাবেক প্রতি গোত্রই নিজ নিজ প্রতিনিধি নিযুক্ত করল। আল আমিন নিজের গায়ের চাদরখানা খুলে মাটিতে বিছিয়ে দিলেন, এরপর হাজরে আসওয়াদ নিজ হাতে তাতে রেখে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বললেন, তোমরা প্রত্যেকেই এ চাদর ওঠাও এবং সবাই মিলে হাজরে আসওয়াদকে কাবার পাশে নিয়ে যাও। সে মোতাবেক কাজ করা হলো। এরপর যুবক আল আমিন সেটি নিজ হাতে তুলে কাবার পূর্ব-দক্ষিণ কোণে স্থাপন করে দিলেন। এভাবেই বিশ্বনবীর দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণতায় সমগ্র আরব জাতি আসন্ন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ থেকে রক্ষা পেল এবং যুবক আল আমিনের ভূয়সী প্রশংসা করতে করতে সন্তুষ্টচিত্তে সবাই যার যার ঘরে ফিরে গেল। বর্তমানে এ পাথরটি অগ্নিকান্ডের দুর্ঘটনায় ভেঙে আট টুকরোয় পরিণত হয়েছে এবং ভেঙে যাওয়া টুকরোগুলো একসঙ্গে চুনাপাথরে রুপার ফ্রেমে বাঁধাই করে পুনঃস্থাপন করা হয়েছে। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া-২/২৬৩)

এ ঘটনার পাঁচ বছর পরই আল্লাহর রসুলকে নবুয়তের সম্মানে সম্মানিত করা হয়। নাজিল হয় তাঁর ওপর ঐশীবাণী আল কোরআন। সমগ্র মানব জাতিকে এক আল্লাহর প্রতি ইমান এনে, তাঁরই ইবাদত করার প্রতি আহ্বান করলেন বিশ্বমানবতার মুক্তির দিশারি উম্মতের কান্ডারি মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।


আপনার মন্তব্য