শিরোনাম
প্রকাশ : ১০ এপ্রিল, ২০২১ ২০:৩৬
প্রিন্ট করুন printer

পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচন

চতুর্থ দফায় ভোটগ্রহণে সহিংসতার বলি ৫; দুঃখ প্রকাশ মোদির, অমিত শাহ'র পদত্যাগ দাবি মমতার

দীপক দেবনাথ, কলকাতা

চতুর্থ দফায় ভোটগ্রহণে সহিংসতার বলি ৫; দুঃখ প্রকাশ মোদির, অমিত শাহ'র পদত্যাগ দাবি মমতার

প্রথম তিন দফার ভোট মোটামুটি শান্তিপূর্ণ হলেও পশ্চিমবঙ্গে চলমান বিধানসভা নির্বাচনের চতুর্থ দফার ভোটগ্রহণকে কেন্দ্র করে শনিবার ১০ এপ্রিল সহিংসতার বলি হলো ৫ জন, আহত আরও ৪ জন। 

এই দফায় পাঁচ জেলার ৪৪ আসনে ভোট নেওয়া হয়। এর মধ্যে দক্ষিণবঙ্গের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলায় ১১ টি, হুগলি জেলায় ১০ টি, হাওড়ায় ৯ টি এবং উত্তরবঙ্গের আলিপুরদুয়ার জেলায় ৯ টি ও কোচবিহার জেলার ৫ টি কেন্দ্রে ভোট নেওয়া হয়। 

কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে সকাল ৭ টা থেকে সন্ধ্যা ৬.৩০ পর্যন্ত ভোট নেওয়া হলেও বেলা বাড়তেই একাধিক জায়গা থেকে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটতে থাকে। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে যায় উত্তরবঙ্গে কোচবিহার জেলা। কার্যত রক্তবন্যা বয়ে যায় এই জেলার শীতলকুচি এলাকায়।

এদিন সকাল ৮ টা নাগাদ প্রথম সহিংসতার ঘটনা ঘটে। জীবনে প্রথমবার ভোট দিতে এসে আনন্দ বর্মন নামে ১৮ বছরের এক তরুণ গুলিবিদ্ধ হয়। গুলি চালানোর অভিযোগ ওঠে তৃণমূল আশ্রিত দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে। জানা গেছে, শীতলকুচির পাগলাপীর এলাকায় একটি বুথে ভোটের লাইনে দাঁড়ানো ওই তরুণের পিঠে গুলি লাগে। এই মৃত্যুর সত্যতা স্বীকার করে জেলার পুলিশ সুপার দেবাশিস ধর জানান ‘এই ঘটনায় আমরা দুইজনকে আটক করেছি।’ এই ঘটনার পরই মৃতের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। মৃতের বাবার দাবি তার ছেলে বিজেপি সমর্থক। অন্যদিকে তৃণমূলের দাবি মৃত যুবক তাদের দলের সমর্থক।
 
এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই পরে শীতলকুচিতেই ফের গুলি চালানোর ঘটনা ঘটে। শীতলকুচি বিধানসভা কেন্দ্রের মাথাভাঙার জোরপাটকি গ্রাম পঞ্চায়েতের ৫/১২৬ নম্বর বুথের সামনে গুলিবিদ্ধ হয়ে আরও চার (৪) জনের মৃত্যু হয়, আহত হয় আরও চারজন। তাদেরকে মাথাভাঙা মহকুমা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তৃণমূলের দাবি নিহত ৪ জনই তাদের দলের সমর্থক। এই ঘটনায় ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। গুলি চালানোর অভিযোগ উঠেছে কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে। ওই ঘটনার পরই অ্যাকশন টেকেন রিপোর্ট চেয়ে পাঠায় নির্বাচন কমিশন। এরপর রাজ্যের বিশেষ নির্বাচনী পুলিশ পর্যবেক্ষক বিবেক দুবের তরফে কমিশনের কাছে যে রিপোর্ট পেশ করা হয় তাতে বলা হয় এদিন সকালে ভোটগ্রহণ পর্ব শুরু হওয়ার কিছু পরেই শীতলকুচির জোড়াপাটকির ওই বুথে বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। একসময় ওই বুথটি ঘিরে ফেলে বেশ কিছু মানুষ। এর মধ্যে কয়েকজন মানুষ ওই বুথে প্রহরারত কেন্দ্রীয় বাহিনীর অস্ত্র ছিনতাইয়ের চেষ্টা করে। আর তখনই আত্মরক্ষার্থে বাধ্য হয়েই কেন্দ্রীয় বাহিনীকে গুলি চালাতে হয়। আর এই মৃত্যুর পরই সরগরম হয়ে উঠেছে রাজ্য-রাজনীতি। ওই ঘটনার পরই ১২৬ নম্বর বুথটিতে ভোটগ্রহণ স্থগিতের নির্দেশ দেয় কমিশন। 

শীতলকুচিতে ৫ জনের মৃত্যুর ঘটনায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকেই দায়ী করলেন রাজ্যটির ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেস প্রধান মমতা ব্যানার্জি। এদিন উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বনগাঁ ও হালিশহরে দুইটি পৃথক নির্বাচনী জনসভা থেকে মমতা বলেন, ‘আজ কোচবিহারে দিল্লির পুলিশ আমার পাঁচ ভাইকে মেরে দিয়েছে, খুন করেছে। আমি তার নিন্দা করছি। সকালে আরও একজনকে মেরেছিল। আমি বলছি এর জন্য কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীই দায়ী। আমি তার পদত্যাগ দাবি করছি।’ 

পরে বিকালে শিলিগুড়িতে একটি সংবাদ সম্মেলন করে মমতা বলেন ‘বাংলা দখলের জন্য সহিংসতার রাজনীতি করছে বিজেপি। অমিত শাহ’এর নির্দেশেই কেন্দ্রীয় বাহিনী গুলি চালিয়েছে।’ তার বক্তব্য ‘যখন বিজেপি গণতান্ত্রিক উপায়ে ভোটে জিততে পারে না, তখন এসব করে। অন্যায় করে লোক মেরে বলছে আমি আত্মরক্ষার জন্য করেছি।’ 

শীতলকুচির এই ঘটনায় তৃণমূলের নারী সাংসদ মহুয়া মৈত্র ট্যুইট করে লিখেছেন ‘নির্বাচন কমিশন কেন্দ্র সরকারের হাতে পুতুলে পরিণত হয়েছে। এই মৃত্যুর জন্য কমিশনই দায়ী।’ 

অন্যদিকে শিলিগুড়িতে বিজেপির এক জনসভায় উপস্থিত হয়ে শীতলকুচিতে গুলি চলার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এই ঘটনায় মমতা ব্যানার্জিকে নিশানা করে মোদি বলেন ‘কোচবিহারে যা হয়েছে, তা অত্যন্ত দুঃখের। যাদের মৃত্যু হয়েছে, তাদের মৃত্যুতে আমি দুঃখপ্রকাশ জানাই। বিজেপির সমর্থন দেখে দিদি ও তার গুন্ডারা ভয় পেয়ে গিয়েছে। পরাজয় আসন্ন বুঝেই দিদি এতটা নিচে নেমেছে। কিন্তু দিদি ও তার দলের কর্মী গুন্ডাদের বলে দিতে চাই যে, এই জিনিস আর চলতে পারে না।’ দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যাবস্থা নিতে নির্বাচন কমিশনের প্রতিও আর্জি জানান মোদি। 

আবার এই মৃত্যুর পিছনে বাংলার সংকীর্ণ রাজনীতিকেই দায়ী করেছে কংগ্রেস। দলের লোকসভার সাংসদ অধীর রঞ্জন চৌধুরী জানান ‘এটা নির্বাচন কমিশনের তৎপরতার অভাব। কমিশন বাংলার মাটির কথা বুঝতেই পারছে না। শান্তিশৃঙ্খলা ভোট করানোর জন্য যে সমস্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করার দরকার নির্বাচন কমিশন তাতে একদম ব্যর্থ। 

তবে কেবল কোচবিহারই নয়, রাজ্যের হুগলি জেলার ব্যান্ডেলে হামলার শিকার হন চুঁচুড়ার বিজেপি প্রার্থী লকেট চট্টোপাধ্যায়। ব্যান্ডেলের ৬৬ নম্বর বুথে রিগিং’এর অভিযোগ পেয়ে সেখানে গেলে তাকে হেনস্থা করা হয়, তার গাড়িও ভাঙচুর করা হয়। 

কলকাতার কসবার ধানকল এলাকায় বেশ কয়েকটি বাড়িতে ঢুকে ভোটার কার্ড কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিজেপির অভিযোগ তৃণমূলের বিরুদ্ধে। 

প্রাণে মেরে ফেলার আশঙ্কায় মাথায় হেলমেট পরেই ভোট ময়দানে কোচবিহারের নাটাবাড়ি কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী ও রাজ্যের মন্ত্রী রবীন্দ্রনাথ ঘোষ। তার অভিযোগ বিজেপির দিকেই। যদিও এই অভিযোগ করেছে বিজেপি। 

যাদবপুরের কে.কে.দাস কলেজে সংযুক্ত মোর্চার প্রার্থী সুজন চক্রবর্তীর পোলিং এজেন্টকে বুথে ঢুকতে বাধা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। এমনকি তাকে মারধরও করা হয় বলে অভিযোগ। 

চতুর্থ দফার ভোটের জন্য ১৫৯৪০ টি ভোটগ্রহণ কেন্দ্র খোলা হয়েছিল। এদফায় ভোটারের সংখ্যা ছিল ১,১৫,৯৪,৯৫০ জন। চতুর্থ দফায় ৩৭৩ জন প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারিত হয়। যার মধ্যে ছিলেন একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, রাজ্যটির একাধিক মন্ত্রী, সাবেক মন্ত্রীদের পাশাপাশি অভিনয়, ক্রিড়া সহ বিভিন্ন পেশার সেলিব্রেটিরা। 

এদিন ভোট শুরুর আগে প্রধানমন্ত্রী ট্যুইট করে জানান ‘পশ্চিমবঙ্গে চতুর্থ দফার ভোট শুরু হয়েছে। আজকের ভোটদাতাদের কাছে রেকর্ড সংখ্যায় ভোটদানের আহ্বান জানাচ্ছি। তরুণ ও নারী ভোটারদেরও বিপুল সংখ্যায় ভোটদানের অনুরোধ জানাচ্ছি।’ 

পশ্চিমবঙ্গে ২৯৪ টি আসনের জন্য আট দফায় ভোট নেওয়া হচ্ছে। পঞ্চম দফায় আগামী ১৭ এপ্রিল ৪৫ টি আসনে ভোট নেওয়া হবে। শেষ দফার ভোটগ্রহণ আগামী ২৯ এপ্রিল। 

বিডি-প্রতিদিন/সালাহ উদ্দীন

এই বিভাগের আরও খবর