শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ২৩:২৬

ব্ল্যাকমেইলের চরম পরিণতি

মির্জা মেহেদী তমাল

ব্ল্যাকমেইলের চরম পরিণতি

গত ১২ ফেব্রুয়ারি নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী ইয়োগেন গোনছালভেসের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। হত্যার পর থেকেই এর প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের জন্য র‌্যাব-৩

গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রাখে। এরই ধারাবাহিকতায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ১৬ ফেব্রুয়ারি রাতে উত্তর মুগদা এলাকা থেকে নটর ডেম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইয়োগেন হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী ও হত্যাকারী তার বান্ধবী সখিনা বেগম সবিতাকে গ্রেফতার করা হয়। সবিতা স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি পাস করে ঢাকা জজ কোর্টে শিক্ষানবিস। তিনি একটি কোচিং সেন্টারে পড়াতেন। সবিতাকে জিজ্ঞাসাবাদের পর অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য বের হয়ে আসে। সবিতার সঙ্গে ২০১৩ সালে অ্যাডভোকেট জাফরুল্লাহ রাসেল নামে এক ব্যক্তির পরিচয় হয় স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি র‌্যাগ ডে অনুষ্ঠানে। কিছুদিন পর রাসেলের সঙ্গে সবিতার সমস্যা সৃষ্টি হয়। এক পর্যায় ইয়োগেনকে সাক্ষী করে ২০১৭ সালের ২৯ আগস্ট সবিতা শাহবাগ থানায় মামলা করেন। একই বছর আরও একটি পিটিশন মামলাও করেন সবিতা। যা এখনো বিচারাধীন আছে। ইয়োগেনকে সাক্ষী করে মামলা করার পর থেকে সে নানাভাবে সবিতার কাছ থেকে অর্থ নেয়। যা সবিতা মেনে নিতে পারছিলেন না। পরে এর জের ধরেই এই হত্যাকা  ঘটান সবিতা। হত্যার জন্য ব্যবহৃত জিনিসপত্র পুরান ঢাকা থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি কেনা হয়। হত্যার দিন নিজের পরিচয় গোপন করার জন্য সবিতা বোরকা পরে ভাড়া বাসায় আসেন। পরে ইয়োগেনকে খুন করে রাতে অন্য জামা পরে বাসা থেকে বেরিয়ে যান। ইয়োগেনের সঙ্গে সবিতার ২০১৩ সালে পরিচয়। ২০১৭ সালের দিকে ইয়োগেন নটর ডেম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন তাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ হয়। সবিতার দায়ের করা অ্যাডভোকেট জাফর উল্লাহ রাসেলের বিরুদ্ধে মামলার সাক্ষী ছিল ইয়োগেন। এরপর থেকেই ইয়োগেন সবিতার সঙ্গে ব্ল্যাকমেইল করতে থাকে। টাকা দাবি করতে থাকে। যার শেষ পরিণতি হয় খুনোখুনির মধ্য দিয়ে।

অ্যাডভোকেট জাফর উল্লাহ রাসেল স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে এলএলবি পাস করেন। স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ধানমন্ডি ক্যাম্পাসে সবিতার সঙ্গে জাফর উল্লাহর পরিচয় হয়। পরবর্তীতে সবিতা আজীবন রক্তদাতা সদস্য কার্ড সংগ্রহ করেন। ইয়োগেন ও ওই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জাফরের সঙ্গে কাজ করত। কিন্তু একটা সময় জাফর উল্লাহ নানাভাবে প্রতারণা করতে থাকে সবিতার সঙ্গে। এ বিষয়ে সবিতা বেশ কয়েকটি মামলা দায়ের করেন। যার সাক্ষী ইয়োগেন। এরপর থেকেই ইয়োগেন সবিতার কাছে টাকা দাবি করত। টাকা না দিলে ইয়োগেন সবিতাকে বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি প্রদর্শন করত। বিভিন্ন বিষয়ে জাফর ও ইয়োগেনের মধ্যে মতপার্থক্য থাকায় ইয়োগেন জাফরের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে রাজি হয়। কিন্তু সাক্ষ্য দিতে রাজি হওয়ার পর ইয়োগেনের আশঙ্কা ছিল জাফর তার ক্ষতি করতে পারে। এজন্য ইয়োগেন সবিতাকে অনুরোধ করেছিল তাকে একটি পৃথক বাসা ভাড়া করে দেওয়ার জন্য। যাতে ইয়োগেনের পরিবার এসব ঝামেলা থেকে মুক্ত থাকে। সবিতা ইয়োগেনকে জানান, পৃথক বাসা ভাড়া নিতে হলে অর্ধেক ভাড়া ইয়োগেনকে বহন করতে হবে। কারণ জাফরের সঙ্গে ইয়োগেনেরও স্বার্থ জড়িত। গত জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সবিতা এবং তার মা শামসুল হকের বাসা, ৭৭/এ, ৯ নম্বর হিরাঝিল মসজিদ গলি, সবুজবাগ, ঢাকা ভাড়া বাবদ ৫ হাজার টাকা অ্যাডভান্স করে। কিন্তু গত ২ ফেব্রুয়ারি ইয়োগেন মার্চের ভাড়া বাবদ অ্যাডভান্স আট হাজার টাকা সবিতার কাছে দাবি করে। এ ছাড়াও মোবাইল বিল ও নেশার টাকা বাবদ প্রতিদিনই ইয়োগেন ২/৩ বার করে সবিতার কাছে টাকা চাইত।

পরবর্তীতে সবিতা চরম বিরক্ত হয়ে ইয়োগেনকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। এজন্য গত ৫ ফেব্রুয়ারি তিনি পুরান ঢাকা থেকে সাড়ে ৪০০ টাকা দিয়ে কালো ও সবুজ রঙের ১টি ব্যাগ এবং সাড়ে ৬০০ টাকা দিয়ে ১টি বঁটি কিনে ইয়োগেনকে হত্যা করার সুযোগ খুঁজতে থাকেন। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ইয়োগেন সবিতার সঙ্গে কোর্টে দেখা করতে রাজি হয়। তারপর ইয়োগেনকে সঙ্গে করে তার ভাড়া করা বাসায় যাওয়ার কথা বলে সবিতা তার মোবাইল ফোন বন্ধ করে দেন এবং ইয়োগেনকে হিরাঝিল গলির মাথায় বিকাল সাড়ে ৩টায় অপেক্ষা করতে বলেন। এরপর বাসাবো টেম্পুস্ট্যান্ড থেকে একটি প্রাণের লাচ্ছি ক্রয় করে এবং মুগদা হাসপাতালের টয়লেটে গিয়ে বোরকা পরে নেন। তিনি হিরাঝিল গলির মাথায় এসে ইয়োগেনসহ হিরাঝিল মসজিদ গলির বাসায়, সবুজবাগে প্রবেশ করেন।

বাসায় প্রবেশের পর ইয়োগেন পিপাসা পাওয়ায় জুস কিনতে বাইরে যায়। এই ফাঁকে সবিতা প্রাণের লাচ্ছি জুসের সঙ্গে চেতনানাশক ওষুধ মিশিয়ে নেন। এরপর ইয়োগেন জুস কিনে বাসায় ফিরে আসার পর একটি প্লাস্টিকের ওয়ানটাইম গ্লাসে করে লাচ্ছি খেতে দেন এবং ওই দৃশ্যগুলো ইয়োগেনের মোবাইলে রেকর্ড করেন। এরপর ইয়োগেনের মোবাইল হতে ইউটিউব চ্যানেলে ৪টি ভিডিও আপলোড করে ভিডিওগুলো মোবাইল হতে ডিলিট করে দেন। ইয়োগেন অচেতন হলে তার হাত-পা মুখ কাপড় দিয়ে বেঁধে ফেলেন। তারপর বঁটি দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকেন। কোপানোর এক পর্যায়ে ইয়োগেন চিত অবস্থা হতে উল্টে যায়। তখন সবিতা তার পিঠের ওপর এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকেন। সালোয়ার কামিজ ও ওড়না পরে খালি পায়ে বাসা থেকে বের হয়ে যান।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর