শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ১৩ মে, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১২ মে, ২০১৯ ২৩:৫৩

অষ্টম কলাম

মূল্য নেই, হতাশায় পাকা ধানে আগুন

প্রতিদিন ডেস্ক

মূল্য নেই, হতাশায় পাকা ধানে আগুন

শ্রমের মূল্য ধানের মূল্যের দ্বিগুণ হওয়ায় ন্যায্য মূল্য না পেয়ে টাঙ্গাইলে পাকা ধানে আগুন দিয়েছেন কৃষক। শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলায় দুই মণ ধানে ৮০ কেজির স্থলে ৮৩ কেজি ধান দিতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষক। ধানের বাজারদর কম হওয়ায় এটি কৃষকের ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধানের দাম কম হওয়ায় খরচের টাকা ওঠা নিয়ে হতাশায় ভুগছেন রাজশাহীর কৃষকরা। আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

টাঙ্গাইল : টাঙ্গাইলে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে ৫০০ টাকায়। অন্যদিকে একজন শ্রমিকের মজুরি দিনে ৮৫০ টাকা। এতে প্রতি মণ ধানে কৃষককে গুনতে হচ্ছে লোকসান। ফলে কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। ধানের ন্যায্য মূল্য না পেয়ে টাঙ্গাইলের কালিহাতীর আবদুল মালেক সিকদার নামের এক কৃষক নিজের পাকা ধানে আগুন দিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। রবিবার দুপুরে উপজেলার পাইকড়া ইউনিয়নের বানকিনা এলাকায় তিনি ধানখেতে পেট্রল দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেন। পাকা ধানে আগুন দেখে অনেকেই ছুটে আসেন। এ বিষয়ে মালেক সিকদার বলেন, ‘প্রতি মণ ধানের দামের চেয়ে একজন শ্রমিকের এক দিনের মজুরি দ্বিগুণ। এবার ধান আবাদ করে আমরা মাঠে মারা পড়েছি। তাই মনের দুঃখে পাকা ধানে আগুন দিয়েছি।’ এদিকে কালিহাতীর আউলটিয়া গ্রামের মিজানুর রহমান মজনু নামের আরেক কৃষক তার খেতের পাকা ধান এলাকাবাসীকে বিনা মূল্যে দিয়ে দিয়েছেন। এলাকাবাসী ধান কেটে অর্ধেক অংশ নিজে এবং বাকি অর্ধেক অংশ খেতমালিককে দিয়ে দিচ্ছেন। অন্যদিকে জেলার মির্জাপুর উপজেলায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সেখানে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে ৫৫০ টাকায়। বিপরীতে শ্রমিকের দিনমজুরি ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা। রকিবুল ইসলাম নামের এক চাষি বলেন, ‘বীজতলা থেকে শুরু করে প্রতি মণ ধান ঘরে তুলতে হাজার টাকার ওপরে খরচ হয়। কিন্তু ধান বিক্রি করছি এর অর্ধেক দামে। এবার আমরা পথে বসে গেছি।’ কয়েকজন কৃষক আক্ষেপ করে বলেন, ‘কৃষককে ধানের ন্যায্য দাম দিয়ে বাঁচাতে হলে সরকারের সুদৃষ্টি প্রয়োজন।’

এ বিষয়ে কালিহাতী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এ এম শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতি বিঘা জমিতে ধানের উৎপাদন খরচ ১৩ থেকে ১৪ হাজার টাকা। ধানের বর্তমান বাজারমূল্যে প্রতি বিঘায় ২ থেকে ৩ হাজার টাকা কৃষকের লোকসান হচ্ছে। এমতাবস্থায় সরকারকে কৃষিকাজে যান্ত্রিকীকরণ ও ভর্তুকির পরিমাণ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। তবেই কৃষক উপকৃত হবে।’

নালিতাবাড়ী (শেরপুর) : শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলায় দুই মণ ধানে ৮০ কেজির স্থলে ৮৩ কেজি ধান দিতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষক। এই তিন কেজি অতিরিক্তি ধান নেওয়াকে স্থানীয়ভাবে ‘ঢলতা’ বলা হয়। ধানের বাজারদর কম হওয়ায় এই ‘ঢলতা’ কৃষকের ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিষয়টি সমাধানের দাবি জানিয়েছেন এলাকার কৃষকসমাজ।

উপজেলা কৃষি কার্যালয় ও কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি বোরো মৌসুমে উপজেলায় ৫৪ হাজার ৫০০ একর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে। এক একর ধান চাষ করতে কৃষকের খরচ হয়েছে স্থানভেদে ৩২ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। বর্তমানে একজন শ্রমিকের পারিশ্রমিক হচ্ছে এক হাজার টাকা। কিন্তু বাজারে এক মণ চিকন ধান বিক্রি হচ্ছে ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা আর মোটা ধান বিক্রি হচ্ছে ৪২০ থেকে ৪৬০ টাকা। ৮০ কেজি ধানে দুই মণ হলেও স্থানীয়ভাবে ৮৩ কেজি ধানে দুই মণ ধরছেন আড়তদাররা। এমনিতে কৃষক বাজারে ধানের দাম পাচ্ছেন না। তার ওপর দুই মণ ধানে অতিরিক্ত তিন কেজি ধান দিতে হচ্ছে। ঢলতার নামে অতিরিক্ত তিন কেজি ধান কৃষকের ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষকরা এই অতিরিক্ত তিন কেজি ধান দিতে আপত্তি জানিয়েও কোনো সমাধান পাচ্ছেন না। কৃষকরা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে এর একটি স্থায়ী সমাধান চান।

উপজেলার বিন্নিবাড়ী গ্রামের কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘এমনিতেই বাজারে ধানের দাম পাই না। তার ওপর দুই মণ ধানে তিন কেজি বাড়তি ধান দিওন লাগে। আমরা এর একটা সমাধান চাই। কৃষকদের কথা বিবেচনা করে স্থায়ী একটা সমাধান করা প্রয়োজন।’

নালিতাবাড়ী খাদ্যশস্য ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবুল কালাম বলেন, ‘সব আড়তদারের সম্মতিক্রমে বস্তার ওজন অনুযায়ী এক কেজি । আর ধানের ঘাটতির জন্য ‘‘ঢলতা’’ হিসেবে দুই মণ ধানে দুই কেজিসহ  ৮৩ কেজি ধান নেওয়া হয়। বাইরের কেউ ধান কিনতে চাইলে স্থানীয় আড়তদারদের মাধ্যমে কিনতে পারেন।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফুর রহমান বলেন, ‘কৃষকদের কাছ থেকে ৮০ কেজির স্থলে ৮৩  কেজি ধান নেওয়া হয় বলে শুনেছি। আড়তদারদের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টির স্থায়ী সমাধানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

রাজশাহী : চলতি মৌসুমে ধানকাটা শ্রমিকের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। চড়া দামেও মিলছে না শ্রমিক। এদিকে ধানের দাম কম হওয়ায় খরচের টাকা ওঠা নিয়ে হতাশায় ভুগছেন কৃষকরা। সব মিলিয়ে খেতের পাকা ধানই এখন কৃষকের বোঝা হয়ে উঠেছে। ধানকাটা শ্রমিকের সংকট ও মজুরি বেশি হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন রাজশাহীর চাষিরা। ফলে সঠিক সময়ে ধান গোলায় তুলতে পারছে না তারা। ধানকাটা শ্রমিকদের প্রতিদিন সাড়ে ৪০০ টাকা পারিশ্রমিক দিতে হচ্ছে। এক বিঘা জমির ধান কাটতে অন্তত চারজন শ্রমিক লাগে। আর টাকা ?দিতে না চাইলে এক মণে ৬ কেজি ধান দিতে হচ্ছে রাজশাহীর তানোরের চাষিদের। চাষি মোহাম্মদ মোকলেসুর রহমান জানান, প্রাপ্য মজুরির চেয়ে বেশি দামেও মিলছে না শ্রমিক। স্থানীয়দের পাশাপাশি বাইরের এলাকা থেকে ধান কাটার জন্য লোক আসত। ফলে শ্রমিক সংকট হতো না। কিন্তু এবার এ চিত্র একেবারে পাল্টে গেছে। তিনি জানান, চাষাবাদে প্রতি বিঘায় খরচ পড়েছে সাত-আট হাজার টাকা। বর্তমানে বাজারে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে সাড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায়। এতে উৎপাদনের চেয়ে খরচ বেশি হওয়ায় লোকসান গুনতে হচ্ছে কৃষকদের।


আপনার মন্তব্য