শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৪ নভেম্বর, ২০১৯ ২৩:৪৫

হত্যার জট খুলল ৩০ বছর পর

ছিনতাই নয়, দুই খুনি ছিল ভাড়াটে । জবানবন্দিতে চাঞ্চল্যকর তথ্য

নিজস্ব ও আদালত প্রতিবেদক

হত্যার জট খুলল ৩০ বছর পর
সগিরা মোরর্শেদ

চাঞ্চল্যকর সগিরা মোর্শেদ সালাম হত্যা মামলায় দুই আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। আসামিরা হলেন মারুফ রেজা ও আনাস মাহমুদ রেজওয়ান। গতকাল মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পরিদর্শক রফিকুল ইসলাম আসামিদের আদালতে হাজির করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি রেকর্ড করার আবেদন করেন। পরে তাদের জবানবন্দি রেকর্ড করেন ঢাকা মহানগর হাকিম তোফাজ্জল হোসেন।

পিবিআই প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার জানান, ১৯৮৯ সালের ২৫ জুলাই মেয়েকে স্কুল থেকে আনতে গিয়ে হত্যার শিকার হন সগিরা মোর্শেদ। পরে তার স্বামী আবদুছ ছালাম চৌধুরী রমনা থানায় মামলা করেন। এ মামলায় মন্টু নামে একজনকে দায়ী করে অভিযোগপত্র দাখিল করে ডিবি পুলিশ। মামলাটি দীর্ঘদিন আদালতে চাপা পড়ে থাকার পর চলতি বছর ১১ জুলাই পিবিআইকে তদন্ত করার নির্দেশ দেয় আদালত।

ওই দুই আসামি ছাড়া এর আগে নিহতের ভাশুর ডা. হাসান আলী চৌধুরী ও তার স্ত্রী সায়েদাতুল মাহমুদা শাহীন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তারা কারাগারে আছেন। সগিরা মোর্শেদ হত্যা মামলায় চার আসামিই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলেন। দুই কিলার মারুফ ও আনাসকে ২৫ হাজার টাকা দিয়ে ভাড়া করেছিলেন নিহতের ভাশুর ডা. হাসান। তিনি স্ত্রী শাহীনের প্ররোচনায় এ কাজ করেন বলে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছেন।

আদালত সূত্র জানায়, আসামিরা খুনের কথা স্বীকার করে জবানবন্দিতে বলেছেন, সগিরা মোর্শেদ সালাম মালিবাগ মোড়ের পেট্রলপাম্প থেকে মৌচাকের গলি দিয়ে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে যাচ্ছিলেন। সিদ্ধেশ্বরীর মাঝামাঝি পৌঁছালে সিদ্ধেশ্বরী কালিমন্দির থেকে একটি মোটরসাইকেলে দুই ব্যক্তি তার রিকশা অনুসরণ করছিল। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দুই বিল্ডিং আগে মোটরসাইকেল দিয়ে তারা সগিরা মোর্শেদের রিকশাকে ব্যারিকেড দেয়। মোটরসাইকেলের দুজনের নাম আনাস ও মারুফ। মারুফ এ সময় সগিরা মোর্শেদের ব্যাগ টান দিয়ে নিয়ে নেন এবং তার হাতের বালা ধরে টানাটানি করেন। তখন সগিরা মোর্শেদ তাদের সঙ্গে তর্ক-বিতর্ক করেন। এ সময় আনাসকে চিনে ফেলেন সগিরা মোর্শেদ। মুহূর্তেই মারুফ রিভলভার বের করে গুলি চালান। গুলি সগিরা মোর্শেদের ডান হাতে লাগে। মারুফ পরে আরেকটি গুলি করলে গুলিটি সগিরা মোর্শেদের বুকের বাঁ পাশ ভেদ করে রিকশার হুড ছিদ্র হয়ে বের হয়ে যায়। মারুফ আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য আরও একটি ফাঁকা গুলি করেন। পরে মারুফ ও আনাস মোটরসাইকেলে সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজ হয়ে শান্তিনগরের দিকে পালিয়ে যান। অন্যদিকে সগিরা মোর্শেদকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এর আগে সগিরা মোর্শেদ ও ডা. হাসানের স্ত্রী তার জা শাহীন রাজারবাগে একই বাসায় থাকতেন। ময়লা ফেলাকে কেন্দ্র করে জা শাহীনের সঙ্গে সগিরার ঝগড়া হয়। পরে ডা. হাসান ২৫ হাজার টাকায় সগিরা মোর্শেদকে খুন করার জন্য মারুফকে ভাড়া করেন। নগদে ১৫ হাজার টাকা দেওয়া হয় খুনিকে। খুনের পর দেওয়া হয় বাকি ১০ হাজার টাকা। মামলা সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৯ সালের ২৫ জুলাই বিকাল ৫টার দিকে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে সগিরা মোর্শেদ সালামকে খুন করা হয়। এ ঘটনায় রমনা থানায় অজ্ঞাতদের বিরুদ্ধে মামলা করে সগিরা মোর্শেদের স্বামী আবদুছ ছালাম চৌধুরী। পরে অজ্ঞাত কারণে মিন্টু ওরফে মন্টু নামে একজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ১৯৯১ সালের ১৭ জানুয়ারি আসামি মন্টুর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে আদালত এবং সাতজন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। সাক্ষ্যে বাদীপক্ষ থেকে বলা হয়, তদন্তকালে আসামি মন্টু এবং তৎকালীন (১৯৮৯) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর জেনারেল (অব.) মাহমুদুল হাসানের নিকটাত্মীয় মারুফ রেজা গ্রেফতার হন। কিন্তু মারুফের নাম বাদ দিয়েই ওই সময় অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। সাক্ষ্য গ্রহণ চলাকালে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনে আদালত অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেয়।

ওই আদেশের বিরুদ্ধে মারুফ রেজা রিভিশন আবেদন করায় ১৯৯১ সালের ২ জুলাই হাই কোর্ট মামলাটির অধিকতর তদন্তের আদেশ এবং বিচারকাজ ছয় মাসের জন্য স্থগিত করেন। একই সঙ্গে অধিকতর তদন্তের আদেশ কেন বাতিল করা হবে না সে বিষয়ে রুল জারি করে হাই কোর্ট। জারি করা রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ওই মামলার বিচারকাজ স্থগিত থাকবে বলে পরের বছর ২৭ আগস্ট আদেশ দেয় হাই কোর্ট। সেই থেকে মামলার তদন্ত কার্যক্রম বন্ধ থাকে। সম্প্রতি সগিরা মোর্শেদ হত্যা মামলাটি অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় আদালতের নজরে আনলে স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার হয়ে যায়। পরে মামলাটি পিবিআই তদন্ত শুরু করে। চলতি মাসের ১০ তারিখ আনাস, ১১ তারিখ ডা. হাসান ও তার স্ত্রী শাহীন এবং ১৩ তারিখ মারুফকে গ্রেফতার করে পিবিআই। চারজনই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।         


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর