শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৯ অক্টোবর, ২০২০ ২৩:৫১

চায়ের পাতায় খুশির ঝিলিক

পঞ্চগড়ে চা চাষিদের ভাগ্য পরিবর্তন হচ্ছে, সচল হচ্ছে অর্থনীতির চাকা, চা চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন অনেক তরুণ-যুবক, ন্যায্যমূল্যের বাজার ধরে রাখাই চ্যালেঞ্জ

মাহমুদ আজহার ও সরকার হায়দার, পঞ্চগড় থেকে

চায়ের পাতায় খুশির ঝিলিক
পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার দর্জিপাড়া গ্রামে একটি চা বাগানে পাতা সংগ্রহ করছেন শ্রমিকরা -বাংলাদেশ প্রতিদিন

আশরাফ হোসেন রুবেল। পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার মাঝিপাড়ায় ডাহুক নদীর তীরে সাড়ে ছয় একর জমিতে চা চাষ করেছেন এই যুবক। মাস তিনেক আগেও চা পাতার ন্যায্য মূল্য না পেয়ে হতাশায় নিমজ্জিত ছিলেন আশরাফ। তার পরিবারের মুখেও ছিল দুশ্চিন্তার ছায়া। কিন্তু এখন চা পাতার ন্যায্য মূল্য পাওয়ায় তার মুখে এখন খুশির ঝিলিক। সর্বশেষ এক রাউন্ডে তিনি প্রায় ১৪ হাজার কেজি চা পাতা বিক্রি করেন। তাতে প্রায় তিন লাখ টাকা পান তিনি। সব খরচ বাদে দুই লাখ টাকাই তিনি লাভের মুখ দেখেন। কিছুদিন আগেও তিনি এই লাভ থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন। তখন আবার ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়ায়, চা পাতার ৪০ থেকে ৬০ ভাগ পাতা কর্তন করে নিত কারখানা মালিকরা। এখন সব দুঃখ কষ্ট ছাপিয়ে ক্ষুদ্র এই চা চাষির পরিবারের মুখে ফুটেছে হাসির ঝিলিক।

শুধু আশরাফ হোসেন রুবেলই নন, তার মতো পঞ্চগড়ের হাজার হাজার চা চাষির মুখে এখন হাসি ফুটেছে। তাদের হতাশা আপাতত কেটে গেছে। কাঁচা চা পাতার ভালো মূল্য পাচ্ছেন তারা। কেজিপ্রতি চা পাতার দাম মাঝে মাঝে ওঠানামা করলেও বর্তমান দামে খুশি চা চাষিরা। ক্ষুদ্র চাষিরা বলছেন, এ রকম মূল্য চলমান থাকলে পঞ্চগড়ে চা চাষিদের ভাগ্য বদলে যাবে। বর্তমানে এক কেজি চা পাতার মূল্য ২১ থেকে ২৩ টাকা। কারখানার সংখ্যা বৃদ্ধি এবং চায়ের আন্তর্জাতিক বাজার বৃদ্ধি পাওয়ায় সঠিক মূল্য পাচ্ছেন চাষিরা। এখন সুদিন ফিরে এসেছে চা চাষিদের। চা পাতার ন্যায্য মূল্য পাওয়ায় এই করোনাকালেও পঞ্চগড়ে সচল হচ্ছে অর্থনীতির চাকা। অনেকের ভাগ্য বদলও হয়েছে। বাংলাদেশ চা বোর্ড পঞ্চগড় আঞ্চলিক অফিসের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও এক্সটেনশন অব স্মল হোল্ডিং ট্রি কাল্টিভেশন ইন নর্দান বাংলাদেশ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক কৃষিবিদ ড. মোহাম্মদ শামীম আল মামুন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, চা রপ্তানি বৃদ্ধির কারণে নিলাম বাজারে চায়ের দাম বেড়ে গেছে। এতে করে চা চাষিরা তাদের চা পাতার মূল্য পেয়ে লাভবান হচ্ছেন। নিলাম বাজারে চায়ের দাম স্থিতিশীল অথবা আরও বেড়ে গেলে কারখানা মালিকরা এই দামেই পাতা কিনবে। এতে চা চাষিরা লাভবান হওয়ায় নতুন করে চা আবাদ শুরু হয়েছে। এই দাম অব্যাহত রাখাই এখন চ্যালেঞ্জ। তেঁতুলিয়া উপজেলা পরিষদেও চেয়ারম্যান কাজী মাহমুদুর রহমান ডাবলু বলেন, আমরা ক্ষুদ্র চা চাষিদের মুখে সারা বছরই হাসি দেখতে চাই। তারা চা পাতার যাতে ন্যায্য মূল্য পান, সেজন্য আমরা চা বোর্ড, কারখানা মালিকসহ সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে বৈঠক করেছি। চা পাতার বর্তমান বাজার স্থিতিশীলতা রাখতে সব ধরনের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। জানা যায়, কিছুদিন আগেও কাঁচা চা পাতার মূল্য নিয়ে হা-হুতাশ করেছিলেন পঞ্চগড়ের চা চাষিরা। অনেকে কাঁচা চা পাতা কেটে ফেলে দিচ্ছিলেন। চায়ের চারাও বিক্রি হচ্ছিল না। চা চাষের জন্য জমি উপযোগী করে তুলেও অনেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন। কাঁচা চা পাতার মূল্য বৃদ্ধির দাবিতে সংবাদ সম্মেলনসহ নানা আন্দোলন কর্মসূচিও দিয়েছিলেন প্রান্তিক পর্যায়ের চা চাষিরা। একপর্যায়ে কৃষকদের আন্দোলনের কারণে কাঁচা চা পাতার মূল্য নির্ধারণ কমিটি জরুরি সভায় নতুন করে দামও নির্ধারণ করে দেয়। চা চাষিদের অভিযোগ, কারখানা মালিকরা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কাঁচা চা পাতার মূল্য নিয়ন্ত্রণ করে। তারা আরও বলেন, বর্তমানে কারখানাগুলোর সিন্ডিকেট ভেঙে যাওয়ায় তারা প্রতিযোগিতামূলকভাবে চা পাতা কেনা শুরু করেছে। ফলে দাম বেড়ে গেছে। এতে করে চা চাষিরা লাভবান হওয়ার পাশাপাশি আবারও নতুন করে চা চারা লাগানোর কাজও শুরু হয়েছে। চা বাগান করেছেন ৩নং তেঁতুলিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কাজী আনিসুর রহমান। তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, চা পাতার বর্তমান যে দাম  আছে তা থাকলে বাগানীদের কোনো অসস্তুষ্টি থাকবে না। এই বাজার ধরে রাখতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। তবে আমাদেরও কোয়ালিটি সম্পন্ন চা উৎপাদন করতে হবে। এক্ষেত্রে যে প্রতিবন্ধকতা রয়েছে তা দূর করতে হবে। এখন কারখানা মালিকরা কোয়ালিটিসম্পন্ন ছোট পাতা যে দামে কেনে, বড় পাতাও একই দামে কেনে। তখন কোয়ালিটি বিবেচনায় নেওয়া হয় না। কোয়ালিটিসম্পন্ন ছোট পাতার একটু মূল্য বেশি দেওয়া হলে তাহলে সবাই এ ধরনের চা পাতা উৎপাদনে প্রতিযোগিতা বাড়বে। চা বোর্ড ও চা চাষির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজার অনুসরণ করে চলতি বছর চা পাতা সংগ্রহ মৌসুমের শুরুতে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি জেলা কাঁচা চা পাতার মূল্য নির্ধারণ কমিটির সভায় প্রতি কেজি কাঁচা চা পাতার মূল্য নির্ধারণ করা হয় ১৪ টাকা। শুরুতে কারখানাগুলো এই দামেই চা পাতা কিনলেও গত ২৫ জুন থেকে তারা ১৩ টাকা ৫০ পয়সা দরে পাতা কেনা শুরু করে। শুধু ১২ টাকা কেজিতে নয় কারখানায় আনা পাতার ৪০-৬০ শতাংশ পাতার ওজন বাদ দিয়ে তারা পাতা কিনতে থাকে। এতে করে প্রতি কেজি কাঁচা চা পাতার দাম পড়ে ৮/৯ টাকা বা তারও কম। এ নিয়ে আন্দোলনে নামেন ক্ষুদ্র চা চাষিরা। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৯ জুন জেলা কাঁচা চা পাতার মূল্য নির্ধারণ কমিটি জরুরি সভায় বসে। সভায় চলতি ২০২০-২১ নিলাম বর্ষের পাঁচটি নিলামের গড়মূল্য অনুযায়ী কমিটি প্রতি কেজি কাঁচা চা পাতার মূল্য নির্ধারণ করে ১৩ টাকা ৫০ পয়সা। কিছুদিন এই দামেই কারখানাগুলো পাতা কিনলেও আগস্ট মাসের শেষের দিক থেকে কারখানাগুলোতে কাঁচা চা পাতার দাম বাড়াতে থাকে। সেপ্টেম্বর মাসের শুরুর দিকে কারখানাগুলো প্রতি কেজি কাঁচা চা পাতা ৩০-৩৫ টাকা দরে কিনে। বর্তমানে ২১ থেকে ২৩ টাকা দরে চা পাতা কিনছে।

পঞ্চগড় সদর উপজেলার জগদল এলাকার চা চাষি স্কুল শিক্ষক নুর নবী জিন্নাহ জানান, দুই একর জমিতে চা লাগিয়েছি। কিছু দিন আগে সঠিক মূল্য না পেয়ে চা পাতা কেটে ফেলে দিয়েছিলাম। বর্তমানে ভালো দাম পাচ্ছি। এই দাম চলতে থাকলে কোনো সমস্যা নেই। তেঁতুলিয়ার চা চাষি মেহেদী হাসান মামুন জানান, বর্তমানে বাজার ভালো। কিন্তু কতদিন থাকে এটাই চিন্তার ব্যাপাার। এই মূল্য থাকলে চা চাষিরা লাভবান হবে। নাম গোপন রাখার শর্তে একটি চা কারখানার এক কর্মকর্তা জানান, নিলাম বাজারে কিছুটা দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় কারখানাগুলোও বেঁধে দেওয়া দামের চেয়ে বেশি দামে পাতা কিনছে। আমরা প্রতি কেজি ২০ টাকা দরে পাতা কিনলে অন্য কারখানা কিনছে ২১ টাকায়। এভাবেই পাতার দাম বাড়ছে। বাধ্য হয়ে আমরাও বেশি দামে পাতা কিনছি। কারখানা তো বন্ধ রাখা যাবে না।

বাংলাদেশ চা বোর্ড সূত্র জানায়, পঞ্চগড় জেলায় ২০০০ সালে চা চাষ শুরু হয়। বর্তমানে নিবন্ধিত চা চাষি রয়েছেন ৮৯১ জন। অনিবন্ধিত ৫ হাজার ১৮ জন। নিবন্ধিত ৯টি, অনিবন্ধিত ১৯ চা বাগানসহ ৭ হাজার ৫৯৮ একর জমিতে চা চাষ হচ্ছে। গত বছর ১৮টি চা কারখানায় ৪ কোটি ৪৫ লাখ ৪০ হাজার ১১০ কেজি কাঁচা চা পাতা থেকে ৯২ লাখ ৪৯ হাজার ৩২৫ কেজি চা উৎপাদন হয়েছে। এবার কোটি কেজি উৎপাদন ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

তেঁতুলিয়া সদর উপজেলার ক্ষুদ্র চা চাষি জোবায়েদ ইকবাল রাহেল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, চা পাতার বর্তমান বাজার মূল্যে আমি খুশি। কিছুদিন আগেও অনেকেই চা চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন। এখন অনেক তরুণ চা চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছে। এতে একদিকে যেমন বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে, অন্যদিকে দেশের সর্বোত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের মানুষের ভাগ্যের চাকা সচল হবে।


আপনার মন্তব্য