শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ২৩:১০

খুনের পর সিগারেটের প্যাকেটে সুইসাইড নোট

মির্জা মেহেদী তমাল

খুনের পর সিগারেটের প্যাকেটে সুইসাইড নোট
Google News

সাত সকালে এক নারীর লাশ গাছের ডালে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখে লোকজনের ভিড় লেগে যায়। এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে লাশ উদ্ধারের খবর রটে যায়। পুলিশও খবর পেয়ে হাজির। গ্রামবাসীর ভিড় সামাল দিতে পুলিশের বেশ বেগ পেতে হয়। লাশ নামানোর আগে কেউ চিনতে পারছিল না ২৮ বছরের নারীকে। পুলিশ একপর্যায়ে দড়ি কেটে গাছ থেকে লাশটি নামিয়ে আনে। সালোয়ার-কামিজ পরা নারীকে মাটিতে শুইয়ে রাখে। ভিড় করা মানুষের কাছে পুলিশের জিজ্ঞাসা, আপনারা কি কেউ এ নারীকে চেনেন। মানুষের ভিতরে তখন গুঞ্জন। কেউ কথা বলছিল না। কয়েক মুহূর্ত পর ভিড়ের মধ্য থেকে এক যুবক বলে ওঠেন, স্যার আমি চিনি। সবার দৃষ্টি তখন ওই যুবকের দিকে। পুলিশ তাকে সামনে আসতে বলে। যুবকটি পুলিশের সামনে এসে দাঁড়ায়। বলে, আমি চিনি। উনার নাম আকলিমা। তার বাড়ি পার্শ্ববর্তী কিশামত কামারবাড়ি গ্রামে। বাবার নাম আবেদ আলী। কোনোরকম ঝক্কি ঝামেলা ছাড়াই পুলিশ গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করা অজ্ঞাত নারীর পরিচয় পেয়ে যায়। এরপর শুরু হয় সুরতহাল রিপোর্ট তৈরির কাজ।

দুই মহিলা পুলিশ সদস্য সুরতহাল রিপোর্ট তৈরির কাজ শুরু করেন। শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন রয়েছে কি না তা পরীক্ষা করছিলেন তারা। এ সময় সালোয়ার-কামিজের ফিতার গিটে হাত দিতেই কিছু একটা গুঁজে রাখা আছে বলে টের পান নারী পুলিশ সদস্য। তা বের করে এনে দেখেন ‘ডার্বি’ ব্র্যান্ডের সিগারেটের প্যাকেটের ভিতরে থাকা রুপালি রঙের ফয়েল পেপারের একটি টুকরো। ফয়েল পেপারের অপর পাশের সাদা অংশে কলম দিয়ে লেখা ‘আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়’। একটি সুইসাইড নোট। পুলিশ ভাবে, আত্মহত্যার আগে আকলিমা সুইসাইড নোট লিখে রাখেন। পুলিশ আকলিমার দেহ পরীক্ষা করতে গিয়ে কয়েক জায়গায় নখের আঁচড়ের দাগ দেখতে পায়। এ আঁচড়ের দাগ পুলিশকে ভাবিয়ে তোলে। পুলিশের সন্দেহ হয়, এটি আত্মহত্যা না-ও হতে পারে। ইতিমধ্যে খবর পেয়ে ছুটে এসেছেন আকলিমার বাবা আবেদ আলী, মা এবং ভাইয়েরা। তারা আকলিমার মৃতদেহের সামনে এসে আহাজারি করতে থাকেন। পুলিশ লাশ উদ্ধারের পর ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়।

২০১২ সালে তার বিয়ে হয় দিনাজপুরের পার্বতীপুরের শরিফুল ইসলামের সঙ্গে। কিন্তু যৌতুকের জন্য আকলিমাকে চরম নির্যাতনের শিকার হতে হতো। মুখ বুঝে সহ্য করতেন আকলিমা। ২০২০ সালের আগস্টের ২০ তারিখে তার স্বামী আর শ্বশুর মিলে প্রচ  মারধর করে। পরে বাসা থেকে আকলিমাকে বের করে দেয়। আকলিমা সৈয়দপুরে তার বাবার বাড়ি চলে যায়। সেখানেও সমস্যা। আকলিমা তার সম্পত্তি ভাগ করে দিতে বলায় তার ভাই তাকে শ্বশুরবাড়ি ফিরে যেতে বলে। আকলিমার মা ছেলের পক্ষ নেয়। কী করবে আকলিমা বুঝতে পারছিল না। শ্বশুরবাড়িতে নির্যাতনের শিখার হয়ে এলো বাবার বাড়িতে। সেখানেও তার কোনো মূল্যায়ন নেই। বেরিয়ে যেতে বলেছে এখান থেকেও। দুই দিন পর ২২ আগস্ট মন খারাপ করে বাড়ির বাইরে ঘোরাফেরা করছিল আকলিমা। পরদিন সকালে খবর পাওয়া যায়, আকলিমার লাশ ঝুলছে গাছের ডালে। সঙ্গে পাওয়া গেছে সুইসাইড নোট।

লাশ উদ্ধারের পর আকলিমার মা বাদী হয়ে সৈয়দপুর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। আসামি করা হয় আকলিমার স্বামী শরিফুল ইসলামসহ অজ্ঞাত কয়েকজনকে।

আকলিমার খুনের ঘটনাটি পুলিশকে ভাবিয়ে তুলেছে। বাবার বাড়িতে আসার দুই দিনের মধ্যেই আকলিমার লাশ উদ্ধার হলো। স্বামীর বাড়ি পার্বতীপুর। আর খুন হলো সৈয়দপুর। সন্দেভাজন আসামি শরিফুলের বাড়ি থেকে ঘটনাস্থল অনেক দূর। এরপরও পুলিশ শরিফুলকে খুনি হিসেবে সন্দেহ করে তদন্তকাজ এগিয়ে নেয়। কিন্তু সিগারেটের কাগজে সুইসাইড নোটের কী হবে? খুনে কি আকলিমার ভাই জড়িত? এমন প্রশ্ন পুলিশের তদন্তে চলে এসেছে। পুলিশ আকলিমার বাবা-মা আর ভাইকেও জেরা করে। তাদের বক্তব্য হলো, আকলিমা বাসা থেকে বেরিয়ে গেছে। তাদের ধারণা ছিল, আকলিমা তার শ্বশুরবাড়ি ফিরে গেছে। পুলিশ তাদের বক্তব্যে সন্তুষ্ট হয়।

পুলিশ আকলিমার পারিবারিক কলহের পুরনো ইতিহাস জানতে পেরে একরকম নিশ্চিত হয়, তার স্বামী এ খুনের ঘটনায় জড়িত। যৌতুকের কারণে তাকে হত্যা করা হতে পারে। পুলিশ এমন ধারণা থেকে অভিযান চালায় পার্বতীপুরে। ধরে নিয়ে আসে শরিফুলকে। নানা কায়দায় জেরা করা হয় শরিফুলকে। কিন্তু খুনের কোনো তথ্য পায় না পুলিশ। পুলিশের হাতে চলে আসে ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট। তাতে বলা হয়েছে, আকলিমা গ্যাং রেপের শিকার হয়েছে। ধর্ষণের পর তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশ এবার ভীষণ চিন্তিত। এবার তাদের কাজ বেড়ে যায়। যেহেতু স্বামীর সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পাওয়া যায়নি, আবার ময়নাতদন্ত রিপোর্টে গ্যাং রেপের কথা উল্লেখ রয়েছে, খুনের তদন্তের পরিধি তাদের বাড়াতে হবে। কিন্তু কোন উপায়ে? যদিও পুলিশের হাতে একটি সূত্র রয়ে গেছে। সেই সুইসাইড নোট। যদিও পুলিশের আগে থেকেই সন্দেহ ছিল, সুইসাইড নোটটি আকলিমার লেখা নাও হতে পারে। কারণ, আত্মহত্যার আগে কেউ সুইসাইড নোট লিখতে চাইলে বাসা থেকেই লিখে আনার কথা। অধূমপায়ী একজন নারীর কাছে ডার্বি সিগারেটের প্যাকেট থাকার কথা নয়। ঘটনাস্থলেও কোনো কলম খুঁজে পাওয়া যায়নি যে, প্রমাণ করে সেখানেই বসে আকলিমা লিখেছে। এসব নিয়ে চিন্তা করতে গিয়ে নতুন পরিকল্পনা নেয় পুলিশ। যেহেতু গ্যাং রেপের শিকার হয়েছেন আকলিমা, পুলিশের সন্দেহ একই গ্রামের লোকজন জড়িত তাতে। পুলিশ এবার ধূমপায়ীদের টার্গেট শুরু করে। গ্রামের যারা ধুমপায়ী এবং ডার্বি সিগারেটে অভ্যস্ত তাদের খেঁঁজ করতে থাকে। এ কাজটি করতে গিয়ে পুলিশের কয়েককজন সদস্য রাখালের ছদ্মবেশ নেন। পুলিশ ডার্বি সিগারেটে অভ্যস্ত গ্রামবাসীদের শনাক্ত করতে থাকে। কিন্তু সমস্যা হলো হাতের লেখাও মিলতে হবে। হাতের লেখা মেলানোর জন্য ভিন্ন পথে যায় পুলিশের দল।

পুলিশ তার কিছু সদস্যকে দিয়ে গ্রামে একটি খবর ছড়িয়ে দেয়। ডার্বি সিগারেট কোম্পানির হয়ে একটি জরিপ শুরু হবে। কোম্পানি থেকে সঠিক তথ্যদাতাদের ১ লাখ টাকা পুরস্কৃত করা হবে। এমন খবর রটিয়ে পুলিশ সদস্যরাই ছদ্মবেশ নিয়ে ডার্বি ব্র্যান্ডের ধূমপায়ীদের তথ্য নিতে থাকে। ধূমপায়ীদের কাছ থেকে নাম-ঠিকানা নিজেদের হাতে লিখে নেয়। এমন ৫০ থেকে ৬০ জনের তথ্য পুলিশ পায়। যারা নিজের হাতেই নাম-ঠিকানা লিখে দিয়েছেন। এবার হাতের লেখাগুলো পরীক্ষার পালা। সুইসাইড নোটের হাতের লেখার সঙ্গে এই ৫০-৬০ জনের মধ্যে কারও হাতের লেখা মিলে গেলেই পুলিশ সাকসেস। ভীষণ টেনশন নিয়ে পুলিশ কর্মকর্তারা সুইসাইড নোটের হাতের লেখার সঙ্গে মিলিয়ে দেখছে ডার্বি ব্র্যান্ডের ধূমপায়ীদের হাতের লেখা। পুলিশ একটি হাতের লেখার সঙ্গে সুইসাইড নোটের লেখার সঙ্গে মিল খুঁজে পায়। পুলিশ দেরি করেনি। সেই রাতেই অভিযান চালায়। গ্রাম থেকে তুলে নিয়ে আসে আনোয়ারুল ইসলাম নামে এক যুবককে।

কীরে, ধর্ষণ করলি আবার খুনও করে ফেললি। কে কে কাজটা করলি তোরা? তাড়াতাড়ি বল। পুলিশের জেরার শুরুটাই ছিল এমন। হঠাৎ এমন প্রশ্ন শুনে ভ্যাবাচ্যাকা খায় আনোয়ারুল। সে জবাবে বলে, স্যার কী বলছেন আপনারা। আমি কিছু জানি না। পুলিশ বলে, তুই জানবি, আবার যারা ছিল তারাও জানবে। নয়তো তোরা যা করেছিস, তোর ওপর সেগুলোই হোক। দাঁড়া ব্যবস্থা করছি। পুলিশের এমন হুমকিতে আর থেমে থাকেনি আনোয়ারুল। বলে দেয় সব কিছু।

আনোয়ারুল বলে, সেই রাতে আকলিমাকে মন খারাপ করে তাদের বাড়ির সামনে বসে থাকতে দেখে। সে আকলিমার সামনে গিয়ে বলে, কিরে আকলিমা, বসে আছিস কেন মন খারাপা করে। আকলিমা বলে, না চিন্তায় আছি। আমার একটা জমি বিক্রি করতে হবে। শ্বশুরবাড়িতে টাকা না নিয়ে যাওয়া যাবে না। আনোয়ারুল বলে, জমি বিক্রি করবি ভালো কথা। আমার এক বন্ধুই তো জমি কিনবে। তুই থাক। আমি দেখছি বন্ধুকে খবর দেই। নগদ বিক্রির ব্যবস্থা করে দেব। এমন কথা শুনে খুশি হয় আকলিমা। সেখানে বসেই অপেক্ষায় থাকে। ঘণ্টাখানেক পর আনোয়ারুল আবারও আসে। এসে বলে, চল আমার সঙ্গে। তোর সঙ্গে কথা বলিয়ে দেব। আকলিশা বলে, এখানেই নিয়ে আসো। আমি যাব না। আনোয়ারুল বলে, আমি ওদের সামনে দাঁড় করিয়ে রেখেছি। চল তো। নয় তো তোর জমি বিক্রি হবে না। এ কথা শুনে আকলিমা তার সঙ্গে একটু এগিয়ে যায়। মৎস্য খামারের পাশে নিয়ে যায় আকলিমাকে। সেখানে আগে থেকেই ছিল আনোয়ারুলের বন্ধু শুভ ও মো. হৃদয়। আকলিমা যেতেই তারা তিনজন সেখানে জাপটে ধরে। মুখ চেপে তারা তিনজন পালাক্রমে ধর্ষণ করে। আকলিমা এ সময় চিৎকার করে বলতে থাকে সব ঘটনা বলে দেবে। থানায় যাবে। এতে তারা আকলিমাকে শ্বাসরোধ করে সেখানেই হত্যা করে। একটি দড়ি দিয়ে গলায় বেঁধে গাছের ডালের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখে। আনোয়ারুল তার পকেটে রাখা ডার্বি সিগারেটের প্যাকেট বেড় করে লেখে- ‘আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়’। হত্যাকা কে ভিন্ন খাতে নিতে তার এ পরিকল্পনা। পুলিশ এসব শুনে বাকি দুজনকে গ্রেফতারে অভিযান চালায়। কারাগারে আটক আকলিমার স্বামী শরিফুল মুক্তি পায়।