শিরোনাম
প্রকাশ : ৩ জুলাই, ২০২০ ২০:৫২

‘এই পথে আজ জীবন দেবো, রক্তের বদলে ফাঁসি নেবো’

এফ এম শাহীন

‘এই পথে আজ জীবন দেবো, রক্তের বদলে ফাঁসি নেবো’

আরিফ রায়হান দ্বীপ। ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি শাহবাগে যে গণজাগরণের সূচনা হয়েছিল, দ্বীপ ছিল সেই জাগরণের সামনের সারির যোদ্ধা। নিজ হাতে প্ল্যাকার্ডে  "এই পথে আজ জীবন দেবো, রক্তের বদলে ফাঁসি নেবো" লিখে রাজপথে এসে দাঁড়িয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের ঋণ শোধাতে। কি নির্মম সত্য যে, তার বুকের তাজা রক্তের বদলেই একাত্তরের খুনিদের ফাঁসি দেখেছিল বাংলাদেশ! দ্বীপের বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে ৭১ এর গণহত্যাকারীদের কিছু ফাঁসি হয়েছে ঠিকই কিন্তু দ্বীপের খুনিদের শাস্তি নিশ্চিত করা যায়নি এ দেশে। আমরা নিষিদ্ধ করতে পারিনি সেই খুনি স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তিকে। প্রিয় সহযোদ্ধা শহীদ আরিফ রায়হান দ্বীপের হত্যাকাণ্ডের সপ্তম বছর পেরিয়ে অষ্টমে এসে দাঁড়িয়ে স্মরণ করছি এই জাগরণ যোদ্ধাকে ।

সেদিন শাহবাগ প্রজন্ম চত্বর হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশ আর বাংলাদেশ হয়েছিল শাহবাগ। সেদিন লাখো দ্বীপের মুখে সেই কবিতার ধ্বনি ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’। একুশের চেতনার সাথে উচ্চারিত হয় আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার মুখে। মুক্তিযোদ্ধা পরিবার ও শহীদদের সন্তানরা এসে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য রাখেন এবং আমাদের আন্দোলন চালিয়ে যেতে ভীষণ রকম উৎসাহ যোগান। মা-বোনেরা ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন শাহবাগের তরুণদের সাথে কণ্ঠ মেলাতে। শিক্ষকের হাত ধরে স্কুল থেকে আসে শিশুরা। হাতে প্ল্যাকার্ড “রাজাকারের ফাঁসি চাই।” কচি গলায় জোরে উচ্চারণ ‘জয় বাংলা’। প্রিয়জনের সাথে গভীর রাতে এসে গৃহবধূ শ্লোগান দেয় ‘রাজাকারের ফাঁসি চাই’।      

ইতিহাসে ঠাঁই করে নিল শাহবাগ। শাহবাগ স্মরণকালের বৃহত্তম গনজমায়েতে রূপ নিল। বাংলা মটর থেকে টিএসসি আর মৎস্য ভবন থেকে কাঁটাবন এক জনসমুদ্রে পরিণত হয়। কয়েক লাখ মানুষের গগণবিদারী শ্লোগানে কম্পিত শাহবাগ। শাহবাগ থেকে জন্ম হল প্রজন্ম চত্বরের। শহীদ জায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী ঘোষণা করেন, ‘আজ থেকে শাহবাগের আরেক নাম প্রজন্ম চত্বর। ড. জাফর ইকবাল স্যারের ধারণা ভুল প্রমাণিত করলো ৮ ফেব্রুয়ারির সমাবেশ। স্যার স্বীকার করে নিলেন আমি এত দিন তরুণ প্রজন্মকে ভুল ভেবেছি, তোমাদের দেশপ্রেম আমাকে ভুল প্রমাণিত করেছে। যে সকল পাকিস্তানি দালালদের নাম আমরা মুখে নিতে পারতাম না, সে দালালদের তোমরা তুই রাজাকার বলছ, আমাদেরকে দিয়েও বলাচ্ছো। স্যার নিজেও স্লোগান ধরে স তে সাঈদী তুই রাজাকার, ক তে কাদের মোল্লা তুই রাজাকার, গ তে গোলাম আযম তুই রাজাকার, ন তে নিজামী তুই রাজাকার তুই রাজাকার। এই সমাবেশ থেকে লক্ষ লক্ষ তরুণ শপথ গ্রহণ করে একাত্তরের ঘৃণ্য রাজাকার, আলবদর, গণহত্যা ও ধর্ষণকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

তারা দৃঢ় কণ্ঠে উচ্চারণ করে, খুনি কাদের মোল্লাসহ চিহ্নিত সকল যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া এই আন্দোলন চলবে। সেই সাথে যুদ্ধাপরাধী সংগঠন জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করতে হবে। জামায়াত-শিবিরের সকল আর্থিক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে হবে। মহান মুক্তিযুদ্ধে যেমন প্রবাসী বাঙালিরা বসে ছিল না, তেমনই শাহবাগের দাবির সাথে তারাও বিশ্বের বিভিন্ন শহরে একত্রিত হয়। ২২ দেশের প্রায় ৪৪টি শহরে জড়ো হয় তারা যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে। বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের সাথে বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করে একাত্তরের ঘৃণ্য খুনিদের ফাঁসির দাবিতে। বাসা থেকে মায়েরা খাবার রান্না করে পাশের সন্তানদের হাতে তুলে দেন। ভাগ করে খায় সবাই কারো কোন অভিযোগ নেই, নেই কোন বিরক্তি। রাত-দিন ক্লান্ত শরীর তবুও থামাতে পারে না চলতে থাকে শ্লোগান, গান, কবিতা, নাটক, ব্যঙ্গচিত্র প্রদর্শনী। এর মধ্য দিয়ে জেগে থাকে শাহবাগ।

তবে এসময় শুরু হয় নানা চক্রান্ত, স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত শিবিরের সাথে যুক্ত হয়ে ধর্মের নামে রাজনীতি করে হেফাজতে ইসলাম। তারা আঘাত হানতে থাকে একের পর এক। গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম যোদ্ধা রাজিব হায়দার শোভনকে হত্যার মধ্য দিয়ে সেই আঘাতের সূচনা করে। তারা সক্রিয় করে নানা জঙ্গি গোষ্ঠী। শুরু করে দেশ-বিদেশে নানা ষড়যন্ত্র। যুক্ত হয় জামায়াতের গণমাধ্যম ও স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিকে আশ্রয় দেয়া, লালন-পালন করা বিএনপিও।

জঙ্গি জামায়াত-হেফাজতের চাপাতির নির্মম আঘাতে মৃত্যু হয় দ্বীপের। আক্রমণকারীর আঘাতে তিন মাস মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে জীবনযুদ্ধে হার মানেন শাহবাগ আন্দোলনের প্রথম পোস্টার রচয়িতা বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আরিফ রায়হান দ্বীপ। ২০১৩ সালের ২ জুলাই রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ২০১৩-এর ৯ এপ্রিল সকাল ১১ টায় নিজ ক্যাম্পাসের কাজী নজরুল ইসলাম হলের সামনে হেফাজত ইসলামের এক কর্মী চাপাতি দিয়ে তার ওপর হামলা চালায়। গুরুতর আহত দ্বীপকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করানো হলেও পরে স্কয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। আর সেখানেই তার মৃত্যু হয়। দ্বীপ বুয়েটের রশিদ হলের ৩০২ নম্বর কক্ষের আবাসিক ছাত্র ছিল। হামলায় আক্রান্ত হওয়ার কয়েকদিন পূর্বে ক্যাম্পাসে হেফাজতে ইসলামের নামধারী শিবিরের এক কর্মীকে পুলিশের হাতে তুলে দেয় সে। ওই ঘটনার পর থেকেই নানাভবে তাকে হত্যার হুমকি দেয়া হচ্ছিল।

দ্বীপের ওপর হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে গোয়েন্দা পুলিশ ওই বছরের ১৭ এপ্রিল মেজবাহ উদ্দীন মেজবাহ নামে বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের চতুর্থ বর্ষের এক ছাত্রকে গ্রেফতার করে। আর ওই মেজবাহ পুলিশের কাছে দ্বীপের ওপর হামলার দায়ও স্বীকার করেন। বুয়েটের নিজস্ব তদন্ত কমিটির রিপোর্টে দ্বীপের ওপর হামলার ঘটনায় মেজবাহ জড়িত থাকার বিষয় প্রমাণিত হওয়ায় বুয়েট প্রশাসন মেজবাহকে বহিষ্কার করে। কিন্তু তার কিছুদিন পরে কাদের ইশারায় সেই মেজবাহ ছাড়া পেয়ে যায় তা জানা যায়নি। 

আজ আরিফ রায়হান দ্বীপরা হারিয়ে যায় আর জঙ্গিরা পায় পুরস্কার! স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় থেকে জঙ্গিদের আলোর পথে ফিরিয়ে আনতে দেখি ৫ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয় আর এদিকে তাদের হাতে নির্মম হত্যার শিকার হয়ে ওয়াসিকুর বাবুদের মরদেহ দাফনের কাপড় কিনতে পারে না তার পরিবার। তাদের ভয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয় জাগরণ যোদ্ধারা। যে তরুণ প্রজন্ম বারবার এই অপশক্তিকে রুখে দাঁড়িয়েছে তাদেরকে নানা ভাবে হেনেস্থার শিকার হতে হয়। বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ধারণ করে যারা এখনো লড়াইয়ে সামিল আছে, জামায়ত-হেফাজত, জঙ্গিদের বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রের সকল অবক্ষ্যের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে কথা বলছে তারা আজ বড্ড অনিরাপদ। ক্ষমতা আর অর্থের মোহে তাদেরকে দূরে ঠেলে দিয়ে এক লোভি সাম্প্রদায়িক প্রজন্ম তৈরি করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে এক দল দেশবিরোধী চক্র। তারা আজ মুজিব কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সকল অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে মরিয়া।   

নির্মম হলেও সত্য আজ স্বাধীনতাবিরোধী জঙ্গি খুনিদের অনুসারীদেরকে ক্ষমতার চেয়ার কিংবা ব্যবসা বানিজ্য, রাজনীতি ও সামাজিকভাবে পূনর্বাসনের প্রকল্প চালু রেখে কোন বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে চলেছি আমরা। আপোষের হাত বাড়িয়ে লাখ লাখ দ্বীপের রক্তের সাথে বেইমানি করে বাঙালির গর্বের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে দূরে ঠেলে কোথায় যাচ্ছি আমরা। যত উন্নয়ন বা প্রবৃদ্ধির কথাই বলা হোক না কেন, সাম্প্রদায়িক শক্তির বীজে বেড়ে ওঠা জঙ্গিবাদের থাবায় একদিন সবই ভেস্তে যাবে এবং মনে রাখা দরকার তাদের চাপাতির কোপের রেঞ্জের বাইরে কোন প্রগতিশীলই নয়।  

ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তে ভেজা মাটিতে হাজার হাজার দ্বীপের বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে ৭১ এর গণহত্যাকারীদের কিছু ফাঁসি হয়েছে ঠিকই কিন্তু আমরা জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা, তাঁর আজীবন সংগ্রামে অর্জিত বাংলাদেশ বিনির্মাণে রাষ্ট্র ও রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ করতে পারিনি সেই একাত্তরের খুনি, ধর্ষণকারী স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তিকে ।   

আরিফ রায়হান দ্বীপ- সহযোদ্ধারা তোমায় ভোলেনি। তোমার রক্তদানের ইতিহাস জেনে নিশ্চয়ই প্রজন্ম তাদের লড়াই অব্যাহত রাখবে। তারা বারবার প্রতিরোধ গড়ে তুলবে এই অন্ধকার শক্তির উৎসের বিরুদ্ধে মানবতার জন্য-মুক্তিযুদ্ধের জন্য-প্রগতির জন্য ।   

লেখক : সাধারণ সম্পাদক, গৌরব ৭১। সংগঠক, গণজাগরণ মঞ্চ।

বিডি-প্রতিদিন/শফিক


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর