Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper

শিরোনাম
প্রকাশ : ২ নভেম্বর, ২০১৯ ১৪:৪০
আপডেট : ২ নভেম্বর, ২০১৯ ১৪:৪৫

স্বপ্ন বাস্তবায়নে স্বপ্ন

মুসতাক মুকুল

স্বপ্ন বাস্তবায়নে স্বপ্ন

অনেকটা স্বপ্নের মতো মনে হয়। ঘরের আঙ্গিনায় যেখানে নরম ঘাস আর আগাছার বাস ছিল সেখানে একসময় যে ছোট্ট ছোট্ট কুমড়ো, ঢেরস, মরিচসহ নানা সবজি চারা রোপন হয়েছিলো, আজ তা পরিণত হয়ে ফুলে ফলে এতোটাই সমৃদ্ধ হয়েছে যে স্বপ্নের মতোই মনে হয়। ভাঙাঘরের ফাঁক গলে আকাশের চাঁদ দেখে নানা অনিশ্চয়তায় নিশুতি রাত আতঙ্কে কাটতো, বৃষ্টির পানি যে ঘরে ঢুকতো বীর দর্পেই সেখানে আজ পরিপাটি টিনের ঘর। ভিতরে আসবাবপত্রে পরিচ্ছনতার ছাপ। উঠোনের একপাশে নানা জাতের সবজির বাগান সারিবদ্ধ করে সাজানো। মাথার উপরে উঠোনজুড়ে মাচায় ঝুলছে অসংখ্য নানা আকারের বাহারি কুমড়ো। বাড়ির পাশেই পুকুরে খেলা করে নানা প্রজাতির মাছ। তাদের সাথে পাল্লা দিয়ে সাতার কাটে হাঁসের দল। সারাদিনের জলকেলি শেষে সন্ধ্যায় উঠে আসে নিজ খোঁয়াড়ে। ওদের খোঁয়াড়ে ঢুকতে দেখে বাছুর ছানা আনন্দে মাথা নাড়ে। খোঁয়ারের পাশেই গোয়াল ঘর, তাতে যাবর কাটে মা গরুটি। সন্ধ্যের আঁধার দূর হয় ঝকঝকে বিদ্যুৎ বাতির আলোতে। ক্লাস টুতে পড়া বড়ভাই পাঠশালায় পড়ুয়া ছোট বোনকে নিয়ে পড়তে বসে। মা নন্দিতা মণ্ডল দুই ছেলে মেয়েকে পরম যত্নে মানুষ করছেন। সন্তানদের জন্য কোন কিছুর কমতি রাখছেন না। ছেলে মেয়েদের নিয়ে তার বড় স্বপ্ন। অথচ এই কয়েকবছর আগেও সন্তানদের মুখে দুমুঠো ভাত ঠিকমতো তুলে দিতে পারেন পারতেন না। ২০১৪ থেকে ২০১৯। মাত্র কয়েক বছর, এর মাঝেই নিজের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটিয়েছেন এই মা । সফল করে তুলেছেন নিজের লালিত স্বপ্ন । 

এক সময়ের সহায় সম্বলহীন নন্দিতা মণ্ডল সরকারের স্বপ্ন মা প্যাকেজের আওতায় তেইশ হাজার টাকায় একটি বকনা গরু পেয়েছিলেন। এখন তার দুইটি গরু। গরুর দুধ বিক্রি করে তিনি বাড়ির পাশে পুকুরে মাছ চাষ করেন, হাঁসমুরগী পালন করে তা বিক্রি করেন, ডিম বিক্রি করে অর্থ পান, ছেলে মেয়েদের নিয়মিত ডিম খাওয়ান। পুকুরে মাছ চাষ করে সেখান থেকে ভালো আয় করেন এবং পরিবারের সকলের জন্য পুকুরের মাছ হতে আমিষের যোগান দেন। এসব থেকে উপার্জিত টাকা দিয়ে বাড়ির পাশে ধানী জমি বন্ধক নিয়ে ধান চাষ করেন। বাড়ির আঙ্গিনা, পুকুর পাড়সহ বসতভিটার পরিত্যক্ত জায়গায় সবজি চাষ করেন। সবজি নিজেরা খান এবং বাজারে বিক্রি করে আয়ও করেন। স্বামী দিনমজুরের কাজ বাদ দিয়ে নিজের জমিতে কৃষি কাজে যুক্ত হয়েছেন, পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসা করছেন এবং তা থেকে ভালো আয় করছেন। দুই ছেলেমেয়েকে  স্কুলে পাঠাচ্ছেন। এখন তাদের সুখের সংসার।

সমাজে নন্দিতাদের পরিবার অনুকরণীয় হয়ে উঠেছে। তাদের দেখাদেখি গ্রামের অনেকেই গাভী, হাঁসমুরগী পালন, সবজি চাষে উৎসাহিত হচ্ছে। ছোট পরিবার, যৌতুক, পরিষ্কার পরিচ্ছনতা, স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিন ব্যবহার, বাল্যবিবাহ ইত্যাদি নানা বিষয়ে তারা প্রতিবেশীদের পরামর্শ দিচ্ছেন।

শুধু নন্দিতা মণ্ডলই নয় গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের ৬০ জন মা স্বপ্ন প্যাকেজ কর্মসূচির আওতায় এমন সহযোগিতা পেয়েছেন। দেশের ১০টি জেলার ১০ টি উপজেলায় দারিদ্র্য বিমোচনে মাতৃত্বকালীন ভাতা প্রাপ্তদের জন্য প্যাকেজ কর্মসূচি চালু করে মহিলা ও শিশু বিষয়ক অধিদপ্তর। এ কর্মসূচির আওতায় প্রত্যেক মাকে স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিন, আবাসন জীবিকায়ন উপকরণ, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্ড, শিক্ষা ও বিনোদন কার্ড প্রদান করা হয়। স্বপ্ন মা’দের সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য মা ও শিশুর যত্ন, স্বাস্থ্যবিধি, পরিবার পরিকল্পনা, যৌতুক, বাল্যবিবাহ এবং আয় বৃদ্ধিমূলক দক্ষতা উন্নয়নের জন্য হাঁস মুরগি পালন, গরু ও ছাগল পালন, মাছ চাষ, শাক- সবজি চাষ, ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রভৃতি বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিনসহ আবাসন উপকরণের জন্য প্রত্যেকে মাকে ২৫ হাজার টাকা  বা সম মূল্যের উপকরণ প্রদান যা তারা অংশীদারিত্বের ভিক্তিতে স্থাপনের সুযোগ পেত। জীবিকায়ন উপকরণ বিতরণে প্রত্যেক মাকে ২৩ হাজার টাকা বা সমমূল্যের উপকরণ প্রদান এবং এখানেও তাদের অংশীদারিত্বের সুযোগ ছিল।

সরকারিভাবে এই স্বপ্ন প্যাকেজ উন্নয়ন মডেলটি মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর দেশের সাতটি বিভাগের ১০টি উপজেলায় ২০১৪-২০১৬ অর্থবছরে সাগ্রহে বাস্তবায়ন করে। এ কর্মসূচির মাধ্যমে উপজেলাগুলো থেকে প্রথম সন্তান বা ঊর্ধ্বে দ্বিতীয় সন্তানের মা এমন ৭০০ দরিদ্র মাতৃত্বালীন ভাতা ভোগী মা’কে স্বপ্ন প্যাকেজের আওতায় নেওয়া হয়। যার সুফল ভোগ করছে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী। গোপালগঞ্জ টুঙ্গিপাড়া উপজেলার  গোপালপুর গ্রামের নন্দিতা মণ্ডলের ন্যায়  একই গ্রামের কণিকা মণ্ডল, যমুনা টিকাদারসহ পাটগাতি ইউনিয়নের  বর্ণমালা পারৈ, সীমা রানী মণ্ডল, সেনের চরের সীমা, কুশলী ইউনিয়নের তুর্কি বেগমের বাড়ী সরেজমিনে ঘুরে স্বপ্ন প্যাকেজের সফল বাস্তবায়ন পরিলক্ষিত হয়েছে। এই প্রজেক্টটির সফলতা দেশের বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষাপটে আরো বিস্তৃত পরিসরে নিয়মিতভাবে চালু রাখলে এসডিজি’র যে লক্ষ্য মাত্রা তা পূরণ তরান্বিত হবে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

লেখক : সাংবাদিক

বিডি প্রতিদিন/ফারজানা


আপনার মন্তব্য