শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ১০ ডিসেম্বর, ২০২০ ২৩:৫১

শামসুল আলম বেলাল ও

সাউথ এশিয়া ইস্টারডে টুডে টুমরো

সাউথ এশিয়া ইস্টারডে টুডে টুমরো

সাংবাদিক শামসুল আলম বেলাল। ব্যবহারিক সাংবাদিকতায় তাঁর অবদান প্রশংসনীয়। সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী চেতনা ও সামগ্রিকভাবে বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনা বিস্তারে তাঁর প্রশংসনীয় ভূমিকা আছে। সাংবাদিকতায় বস্তুনিষ্ঠতা প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি একজন বড় মাপের মানুষ। তাঁর জন্ম কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার লুদিয়ারা গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। বাবা-মা’র নয় সন্তানের মধ্যে তিনি তৃতীয়। ছেলেবেলা থেকে তিনি ছিলেন ডানপিঠে। শিক্ষক, সহপাঠীর কাছে তিনি সমাদর পেলেও একাডেমিক পড়াশোনা কখনই মসৃণ ছিল না। মনের অস্থিরতা ও তারুণ্য কখনো কখনো বাধা দিয়েছে। সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান হিসেবে ছেলেবেলায় তাঁর মনে রোপিত হয় শিল্প-সংস্কৃতির বীজ। গান, নাটক, যাত্রা, সিনেমা সবকিছু আপন করে নিয়েছিলেন। ছেলেবেলায় বেঞ্জো, হারমোনিয়াম, গিটার এবং বাঁশের বাঁশি বাজানো শিখেছিলেন। হিন্দি, উর্দু, বাংলা গান গাইতেন। সাংস্কৃতিক সংগঠক ও মঞ্চ অভিনেতা হিসেবে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন ১৫ বছর। এ সময় ২৪টি মঞ্চনাটকে অভিনয় ও একটি নাটকের নির্দেশনা দেন। যাত্রাশিল্পী হিসেবে মঞ্চে অভিনয় করেছেন। পরবর্তীকালে নয়টি টেলিভিশন নাটক ও চারটি সিনেমায় তাঁর অভিনয় প্রতিভার প্রকাশ পায়। মুসলমান সমাজে তৃতীয় প্রজন্মের প্রধান সাংবাদিকদের অন্যতম শামসুল আলম বেলাল। সাংবাদিকতার জন্য অপরিহার্য সব গুণ তাঁর আছে। তাঁর সাংবাদিকতা জীবন বর্ণাঢ্য।

শামসুল আলম বেলালের পেশাগত জীবন শুরু হয়েছিল কুমিল্লার একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে। এ পেশা তাঁর ভালো লাগেনি। যোগদান করেন একটি বিজ্ঞাপন সংস্থায়। তখনো মন স্থির হয়নি কোন পেশায় তিনি স্থিত হবেন। অভিনয় ও উন্মুক্ত পেশায় যেন তাঁর আনন্দ। কিংবদন্তি চলচ্চিত্রনির্মাতা সুভাষ দত্তের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতেন। স্বপ্ন ছিল একজন চলচ্চিত্র পরিচালক হবেন। সিদ্ধান্ত নেন চলচ্চিত্র বিষয়ে ভারতের পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটে পড়তে যাবেন। ঠিক ওই সময়, ১৯৮১ সালের ৭ মে তাঁর বড় ভাই ফেরদৌস আলম দুলাল ও শ্রমিক লীগ নেতা আবদুর রহমানের মর্মান্তিক মৃত্যু সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে দেয়। ১৯৮১ সালর ১ জুলাই তিনি যোগ দেন বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায়। অতঃপর শুরু হয় তাঁর পেশাদার সাংবাদিকতা জীবন। ইংরেজি এবং বাংলা উভয় ভাষায় রাজনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি ইত্যাদি বিষয়ে নিয়মিত কলাম লিখেছেন। ইবনে সিরাজ ছদ্মনামে লেখা তাঁর কলাম ছিল জনপ্রিয়। পেশাগত জীবনে দ্য ম্যাকলিয়ানস (কানাডা) এবং দ্য পাকিস্তান উইকলিসহ (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) আন্তর্জাতিক ১২টি পত্রিকার সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। কয়েকটি বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) মিডিয়া পরামর্শক হিসেবে তিনি কাজ করেছেন। আপসহীন সাংবাদিকতার মূলমন্ত্রে দীক্ষিত শামসুল আলম বেলাল দেশের ইংরেজি সাংবাদিকতায় অগ্রগণ্য ব্যক্তি। তিনি একজন পেশাদার অনুবাদক।

সম্প্রতি শামসুল আলম বেলালের ‘সাউথ এশিয়া ইস্টারডে টুডে টুমরো’ নামে একটি গবেষণা গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। একজন ঐতিহাসিক, সমাজ বিশ্লেষক হিসেবে তিনি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি পর্যবেক্ষণ করেছেন দীর্ঘদিন। আর সে অভিজ্ঞতা থেকে তিনি রচনা করেছেন ‘সাউথ এশিয়া ইস্টারডে টুডে টুমরো’। এখানে ভারত, বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভুটান, মালদ্বীপ, নেপাল, শ্রীলঙ্কার আর্থসামাজিক ও ভূরাজনীতির বিবিধ বিষয় উঠে এসেছে। এশিয়ার সমাজ, সংস্কৃতি, প্রি-হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া, দ্য গ্রেট ইমপ্রিয়স অব এনসিয়েন্ট ইন্ডিয়া, বুদ্ধজম, সুফিজম, ভারতীয় সমাজ, সরকার, অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সার্ক গঠন ও দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক অবকাঠামো, বর্তমান পরিস্থিতি, সামাজিক উত্তরাধিকার, যুদ্ধ ও স্বাধীনতা বিষয়ে রয়েছে বিস্তারিত আলোচনা। দক্ষিণ এশিয়ার সংখ্যালঘু সমাজ ও তাদের সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক দুর্বলতা, শিক্ষার পশ্চাৎপদতা নিয়ে মনোগ্রাহী আলোচনা পাঠকদের ভাবিয়ে তুলবে। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে নানা সময়ে সংগঠিত মুক্তিযুদ্ধ বিশ্লেষণধর্মী, নান্দনিক পর্যালোচনা স্থান পেয়েছে। লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি উদার ও উন্মুক্ত। তিনি নিরপেক্ষ থেকে এ অঞ্চলে সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন তুলে ধরেছেন। এ বইতে আলোচিত হয়েছে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান সম্পর্কের বিভিন্ন দিকগুলো; ভুটানের অর্থনীতি, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক তৎপরতা; মালদ্বীপের জনগোষ্ঠীর মানবিকতা, ব্যবসা ও পর্যটন; নেপালের রাজনীতিতে রাজপ্রথা, গণতন্ত্র, বর্ডার সমস্যা, সংস্কৃতি, পাকিস্তানের ভঙ্গুর গণতন্ত্র, সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ, আইনের শাসন; শ্রীলঙ্কার রাজপ্রথা, তামিল টাইগার নিয়ন্ত্রণ প্রভৃতি বিষয়।

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সার্কভুক্ত দেশগুলোর অর্থনীতির বর্তমান অবস্থান, শক্তি ‘সাউথ এশিয়া ইস্টারডে টুডে টুমরো’ বইয়ের অন্যতম আলোচ্য। লেখক দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনৈতিক বন্ধন সুদৃঢ় করার তাগিদ দিয়েছেন। বাণিজ্যের প্রসার ও গভীর কূটনৈতিক সম্পর্ক সে ভিত রচনা করতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ অর্থনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য সবাইকে একযোগে কাজ করার কথা বলা হয়েছে। লেখকের পর্যবেক্ষণ, আমেরিকা ও ভারতের প্রভাব দক্ষিণ এশিয়ার ছোট দেশগুলো সুদৃঢ় অর্থনৈতিক ভিত নির্মাণ করতে পারছে না। চীন এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কারণ চীনের ব্যবসা বিশ্বের অন্য দেশগুলোকে গ্রাস করতে চলেছে। চীনের প্রভাব দিন দিন বাড়ছে। আফগানিস্তান পর্যন্ত তাদের বিনিয়োগ পাচ্ছে। এ জন্য সবার কণ্ঠ এক হলেই অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী হবে। তিনি সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন সুদৃঢ় করার তাগিদ দিয়েছেন।

শামসুল আলম বেলাল সাংবাদিক হিসেবে পেশাগত মর্যাদা বাড়িয়েছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য বই ‘দ্য সিলভার লাইন ইন মাই মেমোরি’, ‘ইউনাইটেড স্টেট, ইউনাইটেড কিংডম, রাশিয়া, চীন, ইসরায়েল, ভারত এবং মুসলিম ওয়ার্ল্ড’, ‘বাংলাদেশ-ফ্রম এনসিয়েন্ট এজ টু মডার্ন ইরা’, ‘জাতির পিতার সামধিতে ও অন্যান্য কবিতা’। এসব বই পাঠকপ্রিয় হয়েছে। তাঁর গবেষণামূলক বই উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে গবেষকদের কাছে। তাঁর যৌবনে লেখা কবিতাগুলো তরুণ প্রজন্মের কাছে বেশ জনপ্রিয়।

শামসুল আলম বেলালের ‘সাউথ এশিয়া ইস্টারডে টুডে টুমরো’ প্রকাশ করেছে দিব্য প্রকাশ। ৬৭২ পৃষ্ঠার বইটির মূল্য ১২৫০ টাকা।  প্রচ্ছদ নকশা করেছেন মোস্তাফিজ কারিগর।  পাওয়া যাচ্ছে পাঠক সমাবেশসহ দেশের বিভিন্ন বইয়ের স্টলে।

-মেহেদী হাসান


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর
এই বিভাগের আরও খবর