শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৮ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৮ মার্চ, ২০২১ ০০:৫৮

অজানা ভয় আমাকে পেয়ে বসেছে

মতিউর রহমান চৌধুরী

অজানা ভয় আমাকে পেয়ে বসেছে
আমি নিজেই অসহায় আত্মসমর্পণ করে বসে আছি। লিখলে ভয়, না লিখলে বাহবা। শেষের পথটা কখন যে আমি বেছে নিয়েছি! আমার হাত কি কেউ বেঁধে দিয়েছে? না, এটা সত্য নয়। আমি অগোচরে নিজেই নিজের হাত বেঁধে নিয়েছি। খুলতে গিয়ে দেখছি কোথায় যেন গোলমাল হয়ে গেছে।

 

একদম বুঝতে পারছি না। কী যে হয়ে গেল। লেখায় মন বসে না। এলোমেলো চিন্তায় সবকিছু ওলট-পালট হয়ে যায়। এমন তো কখনো হয়নি। দেখতে দেখতে ৫০ বছর হয়ে গেল লেখালেখিতে। টেবিলে বসলেই লেখা হয়ে যেত। এখন কী যেন হয়েছে আমার। আমি কি কোনো অসুখে আক্রান্ত? যদি তাই হয় তাহলে কেমন অসুখ? চারদিকে কত কিছু হচ্ছে। কত কিছু ঘটছে। কত কিছু শুনছি, জানছি। তাহলে লিখতে পারছি না কেন? কে আমাকে আটকাচ্ছে? কেউ তো এসে বলছে না খবরদার! এটা লেখা যাবে না। আপনি কিছু দেখেননি, শোনেননি। তাহলে সমস্যা কোথায়? আসলে আমাকে মনের অসুখে পেয়ে বসেছে। যা কিনা কাউকে বলতে পারছি না। নিজেই নিজের সঙ্গে লড়াই করছি। এক ধরনের অজানা ভয় আমাকে কাবু করে ফেলেছে। আমি নিজেই অসহায় আত্মসমর্পণ করে বসে আছি। লিখলে ভয়, না লিখলে বাহবা। শেষের পথটা কখন যে আমি বেছে নিয়েছি! আমার হাত কি কেউ বেঁধে দিয়েছে? না, এটা সত্য নয়। আমি অগোচরে নিজেই নিজের হাত বেঁধে নিয়েছি। খুলতে গিয়ে দেখছি কোথায় যেন গোলমাল হয়ে গেছে। দিনের শেষে হিসাব মিলিয়ে দেখি আমি এক প্রবঞ্চক। অথচ শপথ নিয়েছিলাম যা কিছু ঘটছে, যা কিছু দেখছি তা লিখব। ক্ষমা করবেন। আমি কিছু দেখছি না। শুনছি না। সত্যের সঙ্গে আমি আপস করছি প্রতিনিয়ত। সাদাকে কালো বলে তৃপ্তির হাসি হাসছি। প্রাপ্তির কাছে নিজেকে সঁপে দিয়েছি। বড় গলায় বলছি, আমি স্বাধীন। আমার হাতে কেউ বেড়ি পরায়নি। আমি বুঝি, মানুষ গালি দেয়। বলে, আমি নাকি দালাল হয়ে গেছি। আরে ভাই! যাব কোথায়? কোন পথ বেছে নেব। সাহসী হতে গেলে সমূহ বিপদ। চারপাশ থেকে আত্মসমর্পণ করার তাগিদ। অন্যরা সুযোগ নেয়। আপনি নেবেন না কেন? তা ছাড়া একা বিপ্লবী হওয়ার মধ্যে কী আনন্দ। দিনভর নিজের সঙ্গে নিজেই লড়াই করে রাতে বলছি, কে কী বলল তাতে কী যায় আসে! নীতিকথা আমাকেই কেন বলতে হবে। অনেকেই তো জাতির সামনে নীতিবাক্য আওড়িয়ে নগদের কাছে ধরা দেয়। মানুষ গালমন্দ করে। তাতে কী! সময়ের পরিবর্তনে আমি আবার রং বদলে ফেলব। তখন অনেকে বাহবা দেবে। বলবে, দেখুন কী সাহসী উচ্চারণ! আমার অতীত ভুলে যাবে মানুষ। হোক না আমার অতীত অন্ধকারে ঠাসা। কেউ কেউ প্রশ্ন করবে কোথায় গেল আপনার শপথ? সেটা আবার কী? শপথ আমার, সাহস অন্যের কাছে বন্দী। এটা থেকে আমি নিজেই বের হতে চাই না। বরং যুক্তির বাইরে কথা বলে নিজেকে প্রমাণ করি সবজান্তা। সময়ের এক সাহসী যোদ্ধা। কেউ অনুসন্ধান করলে একবাক্যে বলি, ধুর ওসব, এটা আবার অনুসন্ধানী হলো নাকি! কার্পেটের নিচে ময়লা লুকিয়ে আওয়াজ তুলি, নিশ্চয় এর পেছনে কোনো মতলব রয়েছে। ইদানীং আমি মতলব খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত। আবার কখনো বলি, ওই ব্যাটা ম্যানেজ হয়ে গেছে। অবশ্যই তাকে কেউ নজরানা দিয়েছে। নিজে অনুসন্ধান না করে অন্যের সমালোচনায় আমি সারাক্ষণ বিভোর থাকি। ছোট পর্দা কাঁপাই। হালে মানুষ আমার চালাকি বুঝে গেছে। তাই এখন আমাকে পর্দায় দেখলেই বলে, এই ব্যাটা ম্যানেজ হওয়ার দলে। আরও কত কিছু বলে! আমার তাতে কিছু যায় আসে না। মাঝেমধ্যে সেলফি তুলে নিজের চেহারা দেখি। কী বীভৎস, বিবর্ণ হয়ে গেছে চেহারা! তাতে কী! আমি তো সুখে আছি। অন্যের সমালোচনার ধার ধারি না।

খালি খালি অন্যের দোষ খুঁজে বেড়াই। আমার যে কী হয়েছে! কোনো কিছুই আর এখন স্বাভাবিক ভাবতে পারি না। তাকিয়ে থাকি অন্যের দিকে। কে কী বলল শুনতে চাই। নিজের বিবেক, চিন্তা-চেতনা লোপ পেয়ে গেছে। কেন এমন হলো? জবাব খুঁজে বেড়াই। গভীর রাতে ঘুম ভাঙে, ইচ্ছে হয় এ পথ থেকে সরে যেতে। মনে হচ্ছে আমার চিকিৎসা দরকার। চিকিৎসকই বা কোথায়? সবাই তো নতুন এ ভাইরাসে আক্রান্ত। তাহলে কি আমার যাওয়ার জায়গা নেই? যাক গে, আমার শক্তি, সাহস দেখে সবাই এখন হাসাহাসি করে। বলে, কোথায় গেল সেই অদম্য শক্তি? এখন তো কলম দিয়ে দুর্নীতিপরায়ণদের উল্লাসের নৃত্য বেরোয় না। আগে সহকর্মীরা মাঝেমধ্যে সাহসী হতেন। বলতেন, ঝুঁকি নেওয়াই যায়। এখন তারাই বলেন, কী দরকার? ভালোই তো আছি। খাল কেটে কুমির আনার দরকার কী! আমাকে তারা অনেক কিছুই জানান না। নিজেরা সেন্সর করে উন্নয়নের জোয়ারে যুক্ত হয়ে গেছেন। আমি কিছু বলি না। মাথা-টাথা খারাপ হয়েছে নাকি! প্রতি শব্দ যেখানে মনিটরের আওতায়, তখন ঝুঁকি কেনই বা নেব। এ রকম তো কখনো ছিল না। সবখানেই শেয়ারহোল্ডার। তাই অনেক কিছু দেখেও না দেখার ভান করি। আখেরে আমার কী যে হবে! জবাব খুঁজে পাই না। নিজে নিজেই বলি, চাটুকারিতা জিন্দাবাদ!

লেখক : প্রধান সম্পাদক, মানবজমিন।


আপনার মন্তব্য