ইতালির হাজার বছরের ইতিহাসে পরশু রাতে আরও একটি ট্র্যাজিক গল্প লেখা হলো। আদ্রিয়াটিক সাগরপাড়ের দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডি ভিসুবিয়াসের অগ্ন্যুৎপাতে পম্পেই নগরীর ধ্বংস। দেশটির ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে ট্র্যাজিক গল্প ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালে রবার্তো ব্যাজিওর পেনাল্টি মিস। বিশ্ব শাসনকারী রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর দেশটি সব ভুলে মাথা উঁচু করে নতুনভাবে দাঁড়িয়েছে। অথচ বিশ্বকাপ ফুটবলের ব্যর্থতা কোনোভাবেই মুছতে পারছে না। ২০১৮ সাল থেকে সেই যে দুর্ভাগ্য পিছু নিয়েছে আজ্জুরিদের, পরশু রাতে বসনিয়া হারজেগোভিনার কাছে হেরে নিজেদের ব্যর্থতার পাইপলাইনে নিজেরাই সিলগালা মেরে নিয়েছে ১৯৩৪, ১৯৩৮, ১৯৮২ ও ২০০৬ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের বিশ্বকাপ খেলতে না পারার ইতিহাস মুছে ফেলার হাতছানি দেওয়া প্লে অফের ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল বসনিয়ার। প্রথমার্ধে এগিয়েও ছিল। কিন্তু ১০ জনের দল নিয়ে শেষ পর্যন্ত বসনিয়ার ছোট ছোট পাসিং ও গতিশীল ফুটবলের সঙ্গে পেড়ে ওঠেননি দোন্নারুম্মারা। টাইব্রেকারে ৩-১ গোলে হেরে টানা তিন বিশ্বকাপে দর্শকে পরিণত হয়। বিশ্বকাপ খেলতে না পারায় হতবিহ্বল স্পোর্ট ম্যাগাজিন গ্যাজেট্টো ডেলর লিখেছে, ‘এবার আমরা ঘরেই কাটাচ্ছি। কী নিদারুণ!
১৯৯৪ সালে আমেরিকান বিশ্বকাপের ফাইনালের ট্র্যাজিক হিরো ব্যাজিও। প্যাসাডোনায় ব্রাজিলের বিপক্ষে ফাইনালে টাইব্রেকারে পেনাল্টি মিস করেছিলেন পনিটেইলের ব্যাজিও। ২০২৬ সালে কোয়ালিফাইং ফাইনালে লাল কার্ড দেখে ইতালির ফুটবলের নতুন ট্র্যাজিক হিরো হন আলেসান্দ্রো বাস্তোনি। প্রথমার্ধে শেষ মুহূর্তে বসনিয়ার কাউন্টার অ্যাটাকে নিশ্চিত গোল বাঁচাতে রাফ ট্যাকল করেন বাস্তোনি। রেফারি কালক্ষেপণ না করে লাল কার্ড দেখান। লাল কার্ডের পর ধারাভাষ্যকার বলে ওঠেন, ‘এটাই কি ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট?’ বাস্তোনির লাল কার্ডে ইতালি পরিণত হয় ১০ জনে। এরপর আর পেড়ে ওঠেনি বসনিয়ার সঙ্গে।
দূরত্বের জন্য ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে বিশ্বকাপের প্রথম আসরে অংশ নেয়নি। ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালে পরের দুই আসরে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় ইতালি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য বিশ্বকাপ হয়নি ১৯৪২-১৯৪৬ সালে। ১৯৫০ ও ১৯৫৪ সালে খেললেও ১৯৫৮ সালে খেলার সুযোগ করে নিতে পারেনি সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। এরপর ১৯৬২ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বিশ্বকাপের প্রতিটি আসরেই খেলেছে দেশটি। ২০১৮, ২০২২ ও ২০২৬; তিন আসরে টানা খেলতে পারছে না আজ্জুরিরা। তিনবারই সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা বিদায় নিয়েছে প্লে অফ থেকে। ২০১৮ সালে রাশিয়া বিশ্বকাপে খেলতে পারেনি সুইডেনের বিপক্ষে হেরে। ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে খেলতে পারেনি উত্তর মেসিডোনিয়ার কাছে হেরে। ২০২৬ সালে এবার স্বপ্নভঙ্গ করল বসনিয়া ও হারজেগোভিনা।
যুগোস্লাভিয়া ভেঙে বসনিয়ার হারজেগোভিনার জন্ম। সার্বিয়ার সঙ্গে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ১৯৯২ সালে স্বাধীন হয় বসনিয়া। দেশটি প্রথম বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে অংশ নেয় ১৯৯৮ সালে। প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলে ২০১৪ সালে। ৩ ম্যাচে অংশ নিয়ে একমাত্র জয় ইরানের বিপক্ষে ৩-১ গোলে। এবার গ্রুপ পর্ব টপকে কোয়ালিফাইয়ে জায়গা করে নেয়। পরশু রাতে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের ৬৬ নম্বর দল বসনিয়া মুখোমুখি হয় ১২ র্যাঙ্কিংয়ের ইতালির। ম্যাচের ১৫ মিনিটে ইতালিকে ১-০তে এগিয়ে নেন কিন। ৭৯ মিনিটে বসনিয়ার পক্ষে সমতা আনেন হারিস তাবাকোভিচ (১-১)। ম্যাচ বসনিয়ার আধিপত্য ছিল প্রশ্নাতীত। ম্যাচের ৬৫ শতাংশ বল ছিল বসনিয়ার। প্রতিপক্ষে গোলবারে শট নেয় ৩০টি। ১১টি টার্গেট করে এবং ১০টিই সেভ করে ইতালির গোলরক্ষক দোন্নারুম্মা।