বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীকে মোদি সরকার ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর পদমর্যাদা দেওয়ায় বাংলাদেশের একশ্রেণির বুদ্ধিজীবী, টক শোব্যক্তিত্ব ও ইউটিউবার সাংবাদিক মনে হয় বেশ দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। তাঁদের কথাবার্তায় মনে হচ্ছে, তাঁরা দিশাহারা হয়ে পড়েছেন যে ‘এবার কী হবে বাংলাদেশের?’ কথায় কথায় ভারতীয় হাইকমিশনারকে পররাষ্ট্র দপ্তরে তলবের দিন শেষ! অথবা প্রশ্ন তুলেছেন, ‘দিল্লির নতুন চালে কী করবে ঢাকা!’ তাঁদের মতে, হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীকে ইউনিয়ন মন্ত্রী পদে উন্নীত করে ভারত বাংলাদেশের পররাষ্ট্র দপ্তর তথা বাংলাদেশকে এমন বেকায়দায় ফেলে দিয়েছে যে ভারত যদি কোনোভাবে বাংলাদেশের স্বার্থবিরুদ্ধ কিছু করে, তাহলে বাংলাদেশ সে বিষয়ে কৈফিয়ত চাওয়ার জন্য হাইকমিশনারকে ডেকে পাঠাতে পারবে না। ভারতের ওপর কোনো কারণে যদি বাংলাদেশের কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের প্রয়োজনও পড়ে, তাহলে হাইকমিশনার উচ্চ পদমর্যাদার কারণেই বাংলাদেশ তা করতে পারবে না এবং কোনো সংকটকালে বাংলাদেশ তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখানোর ক্ষেত্রে প্রোটোকলজনিত জটিলতার মধ্যে পড়বে ইত্যাদি। যদি প্রোটোকল কোনো সমস্যার সৃষ্টি করে, তাহলে তা নিষ্পত্তির সহজ ও তাৎক্ষণিক উপায় হচ্ছে দিল্লিস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কূটনীতিতে অভিজ্ঞ কোনো রাজনীতিবিদকে মন্ত্রীর পদমর্যাদা দিয়ে হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ করা। তাহলেই তো হিসাব চুকে গেল। আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশ সরকারও তাই করবে।
এ বিষয়ে ভিয়েনা কনভেনশন কী বলে?
কূটনৈতিক সম্পর্কবিষয়ক ১৯৬১ সালের ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী, ‘একটি রাষ্ট্র যখন অন্য রাষ্ট্রে তার রাষ্ট্রদূত পাঠায়, তখন গ্রহণকারী রাষ্ট্র প্রেরণকারী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের তার দেশের অভ্যন্তরীণ মন্ত্রিত্বের পদবিকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য নয়।’ কনভেনশনের অধীনে ‘মিশনপ্রধানকে স্বাগতিক রাষ্ট্র একজন কূটনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে মর্যাদা দান করে। “মিশনপ্রধান” বলতে সেই ব্যক্তিকে বোঝায়, যাকে প্রেরণকারী রাষ্ট্র এই দায়িত্ব পালনের জন্য নিয়োগ করে যে তিনি ওই এখতিয়ার অনুযায়ী তার দায়িত্ব পালন করবেন।’ এ সম্পর্কে ভিয়েনা কনভেনশন আরও স্পষ্ট করেছে যে ‘কোনো ব্যক্তি যদি প্রেরণকারী রাষ্ট্রে একজন অভ্যন্তরীণ মন্ত্রীও হন, তবু মিশনপ্রধান হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে রাষ্ট্রপ্রধান বা ক্ষেত্রবিশেষে সরকারপ্রধানের কাছে তাঁর পরিচয়পত্র উপস্থাপনের পর গ্রহণকারী রাষ্ট্রে তাঁকে পূর্ণ কূটনৈতিক মর্যাদাসম্পন্ন একজন কূটনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়, তাহলে এই মর্যাদা লাভের জন্য তাঁর অভ্যন্তরীণ মন্ত্রিত্বের পদবি আইনগত কোনো শর্ত নয়।’ ভারত এর আগেও একাধিক দেশে পূর্ণ মন্ত্রীর পদমর্যাদায় রাষ্ট্রদূত নিয়োগ করেছে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে তারা রাষ্ট্রদূত হিসেবেই দায়িত্ব পালন করেছেন। স্বাগতিক দেশে মন্ত্রী হিসেবে নয়।
এই প্রেক্ষাপটে হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীর ‘কেবিনেট মন্ত্রী’ উপাধি বাংলাদেশে তাঁর কূটনৈতিক পদমর্যাদার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার কোনো কারণ নেই। ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী কোনো রাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত তাঁর নিজ দেশে যে পদমর্যাদারই হোন না কেন, তাঁকে গ্রহণকারী দেশ তাঁর পদবির পার্থক্যনির্বিশেষে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে পূর্ণ কূটনৈতিক মর্যাদা প্রদান করবে। দিনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনার হিসেবে হঠাৎ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, ব্যাপারটি এমন নয়। মিশনপ্রধান হিসেবে প্রেরণকারী রাষ্ট্রকে অবশ্যই গ্রহণকারী রাষ্ট্রের গোপন সম্মতি গ্রহণ করতে হয়েছে। ঢাকা থেকে সদ্য বিদায়ি ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় বর্মাকে তাঁর নতুন কর্মস্থল ব্রাসেলসে বদলি করার সিদ্ধান্তের সঙ্গে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো একজন রাজনীতিবিদ আরিফ মোহাম্মদ খানকে ভারতীয় হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ করা হবে মর্মে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রাণালয়ের সূত্র উদ্ধৃত করে গত এপ্রিল মাসে ভারত ও বাংলাদেশের গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। বিজেপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বিতর্কিত রাজনীতিবিদ আরিফ মোহাম্মদ খান ভারতীয় মুসলিমদের কাছে ‘চরম মুসলিমবিদ্বেষী মুসলিম’ এবং ‘আরএসএস এর শো’ বয় হিসেবে চিহ্নিত।
বিজেপি সরকার তাঁকে কেরালা ও বিহারের গভর্নর হিসেবে মনোনীত করেছিল। গভর্নর হিসেবে তাঁর নিয়োগের আগে উভয় রাজ্যে তাঁর বিরুদ্ধে প্রচণ্ড আপত্তি উঠেছিল। ভারতীয় গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলে তাঁকে একজন ‘মুসলিম বুদ্ধিজীবী’ হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও তাঁর বিরুদ্ধে মুসলমানদের অভিযোগ হলো, তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ভারতীয় মুসলমানদের স্বার্থের বিরুদ্ধে অশুভ ও ধ্বংসাত্মক ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে যে ১৯৮৬ সাল থেকে আরিফ মোহাম্মদ খান তাঁর মুসলিম পরিচয়কে নিজ সম্প্রদায়ের কল্যাণের জন্য নয়, বরং তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর আক্রমণ করতে, হিন্দু জনমতকে প্রভাবিত করতে এবং কংগ্রেস ও ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের বিরুদ্ধে আরএসএস-বিজেপি জোটকে আদর্শগত শক্তি জোগাতে ব্যবহার করেছেন।
কী কারণে শেষ পর্যন্ত আরিফ মোহাম্মদ খানকে বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ করার সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়েছে, তা জানা না গেলেও বাংলাদেশে তাঁকে হাইকমিশনার পদে নিয়োগ করা হলে, দুই দেশের সম্পর্ক আরও অবনতি হতে পারত আঁচ করে, অথবা তাঁর সম্পর্কে বাংলাদেশের নিজস্ব মূল্যায়নও তাঁকে নিয়োগ না করার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করে থাকতে পারে বলে ধারণা করা যেতে পারে। আরিফ খানের পরিবর্তে বিজেপি সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী দিনেশ ত্রিবেদীকে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং গত ১২ জুন তিনি তাঁর রাজনৈতিক কেন্দ্র কলকাতা থেকে ঢাকার উদ্দেশে সড়কপথে বেনাপোল স্থলবন্দর অতিক্রম করেন। বেনাপোলে তিনি অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের পপুলেশন আছে ১৪০ কোটি। তার সঙ্গে ২০ কোটি (বাংলাদেশের) অ্যাড করেছি। ১৬০ কোটি। আমি এখানে যা করতে চাই, তা সব একসঙ্গে হবে। আলাদাভাবে ভাবছি না। দেখছেন না আমি হেঁটে চলে এসেছি। একই আকাশ একই বাতাস। আমরা মিলেমিশে ভিসার সমাধান করব। শুধু অভিন্ন সীমান্ত নয়, অভিন্ন স্বপ্নও আছে। আমাদের আকাশ এক, বাতাস এক, চ্যালেঞ্জও অনেক ক্ষেত্রে এক। তাই আমাদের পথ ভুল হওয়ার সুযোগ নেই। ভালোবাসা আর পারস্পরিক আন্তরিকতার মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার একমাত্র অগ্রাধিকার বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণের সম্পর্ক। আমরা সবাই ভাইবোন। আমাদের পথ ভুল হওয়ার সুযোগ নেই। ...বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্নের সঙ্গেও আমরা যুক্ত। যারা আমাদের ভাইবোন ও মা-তাদের কল্যাণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’
দিনেশ ত্রিবেদীর কথাগুলো বাংলাদেশের অনেকের ভালো লাগেনি। বাংলাদেশে যাঁরা ভারতবিরোধী, তাঁরা প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন। তাঁরা ভারতের ১৪০ কোটির সঙ্গে বাংলাদেশের ২০ কোটি মানুষকে যুক্ত করে সবকিছু একসঙ্গে করতে চান না। তাঁরা ভাইবোনও হতে চান না। এর আগে ২০১৯ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এম এ মোমেন ভারত সফরে গিয়ে সেখানকার সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন যে ‘ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ককে স্বামী-স্ত্রীর মতো।’ তাঁকে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল। বৃহৎ প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সমমর্যাদার ভিত্তিতে ভ্রাতৃপ্রতিম সম্পর্ক রক্ষা এবং পারস্পরিক স্বার্থেই তা জোরদার করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া উভয় দেশের জন্য কল্যাণকর। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেনের ‘স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক’বিষয়ক বক্তব্যের সাত বছর পর জাতীয় সংসদে বিএনপিদলীয় সদস্য জি এম সিরাজ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের গভীরতা তুলে ধরে বলেছেন, ‘স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কও ক্ষণস্থায়ী হতে পারে, স্বামী-স্ত্রীর ডিভোর্স হতে পারে। কিন্তু ভারত-বাংলাদেশ প্রতিবেশী এবং প্রতিবেশীর সম্পর্কের ডিভোর্স হতে পারে না। প্রতিবেশীকে আমরা কখনো অস্বীকার করতে পারি না, না ভারত পারবে, না বাংলাদেশ পারবে।’ তিনি সম্মানজনকভাবে ভারত-বাংলাদেশ বন্ধুত্ব বজায় রাখার ওপর জোর দিয়ে দুই দেশের বন্ধুত্ব নিয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের নতুন হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীর সাম্প্রতিক বক্তব্যে বিভিন্ন মহলের প্রতিক্রিয়াকে অনাকাক্সিক্ষত বলে অভিমত ব্যক্ত করেন।
একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের ওপর ভারতের খবরদারি করার কোনো সুযোগ নেই। যেকোনো দেশের কূটনীতিকরা ভিয়েনা কনভেনশনের শর্ত অনুযায়ী ব্যাপক দায়মুক্তি পেয়ে থাকেন। তবে কোনো কোনো কূটনীতিক যে দেশে তিনি তাঁর দেশের হয়ে দায়িত্ব পালন করছেন, সেই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নাক গলানোর মতো ভূমিকা রাখলে বা অবাঞ্ছিত বক্তব্য প্রদান করলে, সেই দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ববিরোধী প্রকাশ্যে বা গোপনে তৎপরতা চালানোর অভিযোগ উঠলে গ্রহণকারী রাষ্ট্র যেকোনো সময় মিশনপ্রধান বা মিশনের কূটনৈতিক কর্মীদের যেকোনো সদস্যকে ‘পারসন নন গ্রাটা’ বা অবাঞ্ছিত ব্যক্তি ঘোষণা করে এবং এ ধরনের সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা না করেই প্রেরণকারী রাষ্ট্রকে অবহিত করতে পারে যে মিশনপ্রধানকে বা মিশনের অন্য কোনো কর্মী গ্রহণযোগ্য নন। এ ধরনের ক্ষেত্রে, প্রেরণকারী রাষ্ট্র যথাযথভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে হয় প্রত্যাহার করবে, অথবা মিশনে তাঁর দায়িত্বের অবসান ঘটাবে। এমনকি কনভেনশনে কোনো কূটনীতিককে স্বাগতিক দেশে প্রবেশ করার আগেই তাঁকে অগ্রহযোগ্য ঘোষণা করতে পারে। দিনেশ ত্রিবেদী যা বলেছেন, তা তাঁর কূটনৈতিক দায়মুক্তির অবস্থান থেকেই বলেছেন। এ নিয়ে অহেতুক উদ্বেগ, সন্দেহ-সংশয় প্রকাশ করে দুই প্রতিবেশী দেশের পারস্পরিক সম্পর্কোন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করাই বাঞ্ছনীয় হওয়া উচিত।
♦ লেখক : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক