সাম্প্রতিক সময়ে মুসলিম সমাজে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণালব্ধ বা আদর্শগত মতপার্থক্যকে কেন্দ্র করে আলেম সমাজ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে অতি আবেগপ্রবণ পক্ষপাত ও বিরূপ প্রতিক্রিয়া বৃদ্ধি পাচ্ছে। কেউ কারও সমর্থনে এতটাই উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন যে অন্যদের অবদান ও মর্যাদা অস্বীকার করতে শুরু করেন। আবার কেউ মতবিরোধের কারণে এমন ভাষা ও আচরণ অবলম্বন করেন, যা ইসলামি শিষ্টাচার, ন্যায়বোধ ও ভ্রাতৃত্বের চেতনাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সর্বসাধারণ বিশেষভাবে যুবসমাজ এর ফলে বেশি প্রভাবিত হচ্ছে। বিনষ্ট হচ্ছে অনেকের আচার-আচরণ। অথচ ইসলামের ইতিহাস, কোরআনের শিক্ষা এবং সালাফে সালেহীনের জীবন আমাদের সম্পূর্ণ ভিন্ন এক আদর্শের দিকে আহ্বান জানায়।
মতভেদ কোনো নতুন বিষয় নয়। ইসলামি জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে সাহাবায়ে কেরাম (রা.), তাবেয়িন, তাবে-তাবেয়িন, ফুকাহা, মুহাদ্দিস ও মুফাসসিরগণের মধ্যেও বহু বিষয়ে ইজতিহাদি মতপার্থক্য ছিল। নামাজ, ফিকহ, উসূল, ব্যাখ্যা ও প্রয়োগের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁরা ভিন্নমত পোষণ করেছেন। প্রকৃতপক্ষে ইজতিহাদ, গবেষণা ও চিন্তাশীল বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে মতভেদ একটি স্বাভাবিক ও অনিবার্য বাস্তবতা। কিন্তু সেই মতভেদ কখনো তাঁদের পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্ববোধকে নষ্ট করেনি। তাঁরা জানতেন যে ইজতিহাদের ক্ষেত্রে একজন গবেষক সত্যে পৌঁছতে পারেন, আবার কখনো ভুলও করতে পারেন; কিন্তু এজন্য তাঁর ইলম, তাকওয়া ও দীনি খেদমত অস্বীকার করা যায় না। দুঃখজনকভাবে বর্তমান যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মতবিনিময়ের সুযোগ সৃষ্টি করলেও অনেক ক্ষেত্রে তা শালীনতার সীমা লঙ্ঘনের ক্ষেত্রেও পরিণত হয়েছে। কারও একটি বক্তব্য বা মতামতকে কেন্দ্র করে মুহূর্তের মধ্যে অপমান, বিদ্রুপ, কটূক্তি এবং ব্যক্তিগত আক্রমণের ঝড় শুরু হয়ে যায়। অনেক সময় দেখা যায়, মানুষ বক্তব্যের সমালোচনা না করে সরাসরি ব্যক্তির চরিত্র ও মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এটি শুধু নৈতিক অবক্ষয় নয়, বরং ইসলামি আদবেরও সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। পবিত্র কোরআন মানুষকে সুন্দর ভাষায় কথা বলার নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা মানুষের সঙ্গে উত্তম ভাষায় কথা বল।’ (বাকারা-৮৩) অন্যত্র তিনি সতর্ক করেছেন ‘কোনো সম্প্রদায় যেন অন্য কোনো সম্প্রদায়কে উপহাস না করে।’ (হুজুরাত- ১১) এসব আয়াত থেকে স্পষ্ট হয় যে মতবিরোধ থাকলেও সম্মানজনক ভাষা ও আচরণ বজায় রাখা একজন মুমিনের মৌলিক দায়িত্ব। অপর আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি তোমাদের বিদ্বেষ যেন তোমাদের ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করতে উদ্বুদ্ধ না করে। তোমরা ন্যায়বিচার কর; এটাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।’ (মায়িদাহ-৮)
এই আয়াত ইসলামি সভ্যতার অন্যতম মৌলিক নীতি প্রতিষ্ঠা করেছে। মানুষের প্রতি ভালোবাসা যেমন অন্ধ সমর্থনের কারণ হতে পারে না, তেমনি বিরোধিতা বা অপছন্দও অন্যায় আচরণের বৈধতা দেয় না। একজন আলেমের প্রতি শ্রদ্ধা থাকলে তাঁর ভুলকে ভুল বলার সাহস থাকতে হবে, আবার কারও সঙ্গে মতবিরোধ থাকলেও তাঁর ভালো কাজ, ইলম ও অবদানকে স্বীকার করার ন্যায়পরায়ণতাও থাকতে হবে। এটিই ইসলামের শিক্ষা, তাকওয়ার দাবি। আজ আমাদের সমাজে দুটি চরম প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। একদল কোনো আলেমকে এমনভাবে অনুসরণ করেন যেন তাঁর প্রতিটি মতামত প্রশ্নাতীত। অন্যদিকে আরেক দল বিরোধিতার নামে এমন আচরণ করেন যেন সংশ্লিষ্ট আলেমের কোনো ভালো কাজ বা অবদানই নেই। উভয় অবস্থানই ভারসাম্যপূর্ণ ইসলামি মানসিকতার পরিপন্থি। ইসলামের শিক্ষা হলো ব্যক্তি নয়, সত্যকে অনুসরণ করা; দল নয়, দলিলকে প্রাধান্য দেওয়া।
আলেমগণ নবীদের উত্তরাধিকারী। তাঁদের সম্মান করা দীনেরই সম্মান। তবে সম্মান করার অর্থ এই নয় যে তাঁদের সব মতামতকে নির্ভুল মনে করতে হবে। আবার কোনো বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করার অর্থও এই নয় যে তাঁদের মর্যাদা নষ্ট করতে হবে। সমালোচনা হতে পারে, কিন্তু তা হতে হবে জ্ঞানভিত্তিক; মতভেদ হতে পারে, কিন্তু তা হতে হবে আদবপূর্ণ; সংশোধনের চেষ্টা হতে পারে, কিন্তু তা কখনো অপমান বা বিদ্বেষে পরিণত হওয়া উচিত নয়।
বর্তমান সময়ে মুসলিম উম্মাহ নানা সংকট, চ্যালেঞ্জ ও বিভক্তির মুখোমুখি। এ অবস্থায় নিজেদের আদর্শগত মতভেদকে বিভেদের কারণ না বানিয়ে জ্ঞানচর্চার স্বাভাবিক অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, ব্যক্তিপূজা যেমন ক্ষতিকর, তেমনি ব্যক্তিবিদ্বেষও ধ্বংসাত্মক। সত্যের অনুসরণ, ন্যায়ের প্রতি আনুগত্য এবং পারস্পরিক সম্মানবোধই একজন সচেতন মুসলিমের পরিচয়। অতএব মতভেদ থাকুক, কিন্তু ভ্রাতৃত্ব নষ্ট না হোক; আলোচনা হোক, কিন্তু শিষ্টাচার বজায় থাকুক; সমালোচনা হোক, কিন্তু ইনসাফের সীমারেখা অতিক্রম না করুক। তাহলেই জ্ঞানচর্চার পরিবেশ হবে সুস্থ, সমাজ হবে শান্তিপূর্ণ এবং উম্মাহর ঐক্য ও কল্যাণ আরও সুদৃঢ় হবে।
♦ লেখক : গবেষক, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার, বসুন্ধরা, ঢাকা