হাসনাত আবদুল্লাহ, কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য। ২০২৪ এর জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে আলোচনায় আসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের এ ছাত্র। কুমিল্লার এক নিম্ন আয়ের পরিবারে জন্ম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে পড়াশোনার খরচ মেটাতে প্রথমে টিউশনি পরে একটি অনলাইন কোচিং সেন্টার শুরু করেন, যার নাম স্কুল অব এক্সিলেন্স। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অমর একুশে হলে থাকাকালে হাসনাত আবদুল্লাহ বর্তমানে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের সদস্য ছিলেন। এ সময় ছাত্রলীগের বিভিন্ন কর্মসূচিতে তাকে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে দেখা গেছে। পরবর্তীতে তিনি বলেন, অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এটাই তার রাজনীতির মূল বৈশিষ্ট্য। সুযোগসন্ধানী, যখন যেমন প্রয়োজন তেমনি আকার ধারণ করেন। নিজে ইউটিউবার এ জন্য ভিউ ভালো বোঝেন। মানুষকে চটজলদি আকর্ষণ করার জন্য যা প্রয়োজন তাই করেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হাসনাত সবার নজর কাড়তে ১০ নম্বর জার্সি গায়ে দিয়ে রাস্তায় নামেন, যেন সবাই তাকে সহজেই চিনতে পারে। এভাবেই আন্দোলনে উল্লেখযোগ্য অবদান না রেখেই তিনি বনে যান বড় নেতা। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের একাধিক নেতার অভিযোগ, মাঠের আন্দোলনের চেয়ে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কার্যালয় এবং নেতাদের সঙ্গে দেনদরবারেই বেশি সময় কাটান হাসনাত। মাত্র দুই বছরের রাজনৈতিক জীবন স্ববিরোধিতায় ভরা। নিজের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলেন অথচ ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে মব সন্ত্রাসের অন্যতম প্রধান কারিগর হিসেবে পরিচিত হাসনাত। নিজে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা বলেন, আবার সংবাদপত্রে তার সমালোচনা হলেই তাকে মবের ভয় দেখান। নিজে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলেন অথচ এলাকায় তার বিরুদ্ধে এখন দুর্নীতির অন্তহীন অভিযোগ। হাসনাতের রাজনীতির প্রধান উৎস হলো মবসন্ত্রাস। প্রতিপক্ষকে হুমকি দিয়েই রাজনীতির মাঠ দখল করা তার প্রধান কৌশল। হাসনাতের মবে আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়, আবার হাসনাতই নিজের স্বার্থে চট্টগ্রামে গিয়ে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে বৈঠক করেন। এ হলো বর্তমান সময়ে বিতর্কিত সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর চরিত্র। বাইরে সাদা, ভিতরে কালা।
২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর ফ্রান্সভিত্তিক সংবাদ সংস্থা এএফপি একটি সংবাদ প্রকাশ করে যাতে অভিযোগ করা হয় সময় টিভিতে কর্মরত পাঁচ গণমাধ্যমকর্মীর একসঙ্গে চাকরি যাওয়ার ঘটনায় হাসনাত আবদুল্লাহর সংশ্লিষ্টতা ছিল। সিটি গ্রুপের ও সময় টিভির পরিচালক মোহাম্মদ হাসান বিবিসি বাংলাকে নিশ্চিত করেন যে হাসনাত আবদুল্লাহসহ ১৫ জনের একটি দল তাদের অফিসে গিয়ে কয়েকজনকে চাকরি থেকে বাদ দিতে চাপ দিয়েছিল। তবে হাসনাত আবদুল্লাহ সিটি গ্রুপে যাওয়ার কথা স্বীকার করলেও চাপ দেওয়ার কথা অস্বীকার করেন। পরে হাসনাত বাহিনী সিটি গ্রুপকে হত্যা মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দিলে তারা এ বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করেনি।
২০২৫ সালের ২১ মার্চ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে নিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহর একটি ফেসবুক পোস্ট দিয়ে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতীক সেনাবাহিনী সম্পর্কে সমাজে ঘৃণা ছড়ানোর অপচেষ্টা করেন। এটি একটি চরম অন্যায় এবং অপরাধ। কিন্তু ইউনূস সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় লালিত হাসনাতের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ পোস্ট ঘিরে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে নেত্র নিউজ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে সেনাবাহিনীর আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)-এর মন্তব্য প্রকাশিত হয়। যাতে বলা হয় ‘হাসনাতের বক্তব্য ‘অত্যন্ত হাস্যকর ও অপরিপক্ব গল্পের সম্ভার’। এভাবেই গুজব আর অপতথ্য ছড়িয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করেই চলেছেন হাসনাত। হাসনাতের বিরুদ্ধে কোনো গণমাধ্যম সংবাদ পরিবেশন করতেও ভয় পায়। কারণ, হাসনাতের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশিত হলেই, ওই সংবাদপত্রকে আওয়ামী লীগের দোসর কিংবা ভারতের দালাল ট্যাগ লাগিয়ে মবের হুমকি দেওয়া হয়।
গত বছরের এপ্রিলে ‘বিলাসী জীবনসহ নানা প্রশ্নের মুখে হাসনাত’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে প্রথম আলো। এই শিরোনামের প্রতিবাদ জানিয়ে প্রথম আলোকে ফেসবুকে প্রকাশ্যে হুমকি দেন হাসনাত। তিনি বলেন, দিল্লি থেকে লিখে দেওয়া নিউজ করে যদি ভেবে থাকেন হাসনাত আবদুল্লাহকে থামাতে পারবেন তাহলে আপনারা এখনো ভুলের জগতে আছেন। হাসনাতের হুমকিতে প্রথম আলো সংবাদটি মুছে ফেলে।
হাসনাত একসময় ছাত্রলীগের রাজনীতি করলেও এখন প্রচণ্ড আওয়ামী লীগ বিরোধী। তার আন্দোলনকে ব্যবহার করেই অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ করে। প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগ বিরোধিতা করলেও গোপনে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে তার যোগাযোগের কথা ওপেন সিক্রেট। নিজ নির্বাচনি এলাকায় বিএনপিকে ঠেকাতে ‘আওয়ামী দোসর’দের সঙ্গে সমঝোতা করেন হাসনাত। বিএনপি নেতাদের অভিযোগ হাসনাতের ছত্রছায়ায় এখানে আওয়ামী লীগ এখন পুনর্বাসিত হচ্ছে। নিজের প্রয়োজনে যে আওয়ামী লীগের সঙ্গে হাসনাত কোলাকুলি করতে পারেন তার বড় প্রমাণ গত ১৪ এপ্রিল চট্টগ্রামের কাট্টলি এলাকায় মনজুর আলমের বাসায় সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন হাসনাত আবদুল্লাহ। এ খবর পেয়ে মনজুর আলমের বাসার সামনে ‘জুলাই যোদ্ধা’ পরিচয়ে কিছু মানুষ জড়ো হয়। পরে মনজুর আলমের বাসা থেকে বের হওয়ার সময় উপস্থিত জনতা হাসনাত আবদুল্লাহকে ঘিরে ধরে নানা প্রশ্ন করে। তেমন কিছু ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
তাদের কাউকে কাউকে বলতে শোনা যায়, মনজুর আলম ‘আওয়ামী লীগের দোসর’; হাসনাত আবদুল্লাহ নিজে জুলাই যোদ্ধা, যিনি সংসদে দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার কথা বলেছেন; তাহলে তিনি কেন মনজুর আলমের বাসায়, সেটিও জানতে চান তারা মি. আবদুল্লাহর কাছে। পরে হাসনাতের ঘনিষ্ঠরা তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়।
হাসনাতকে সব সময় দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার দেখা যায়। গত বছরের এপ্রিলে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান আবদুল মোমেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ। গণমাধ্যম কর্মীদের হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘আমরা কিছু অভিযোগ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে এসেছি। আমাদের অভিযোগগুলো আমরা লিখিতভাবে জানিয়েছি।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘ভেরি কনফিডেনশিয়াল’ (অতিগোপনীয়)। কাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, এমন প্রশ্নে সরাসরি জবাব না দিয়ে হাসনাত বলেন, ‘এটা ভেরি কনফিডেনশিয়াল। এখন কনফিডেনশিয়াল বিষয় বলে দিলে তো আর কনফিডেনশিয়াল থাকল না। তা ছাড়া অপরাধীরা তখন সতর্ক হয়ে যাবে।’ পরে জানা যায়, হাসনাতের দুদক যাওয়ার পিছনে ছিল বড় চাঁদাবাজির পরিকল্পনা। একটি বিশেষ শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ জমা দিয়ে তাদের আলটিমেটাম দেওয়া হয়, এ সময়ের মধ্যে শিল্পগোষ্ঠী হাসনাতদের মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়ে বিদেশে চলে যায়। হাসনাতের অভিযোগের কি হলো? জানতে চাইলে দুদকের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কয়েক দিন পরই তারা অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেন।
হাসনাত সংসদ সদস্য হয়েছেন মাত্র তিন মাস। এর মধ্যেই তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে এলাকায়।
দেবিদ্বার উপজেলার দক্ষিণ মুইঙ্গলার ১ নম্বর ওয়ার্ডের মরিচাকান্দাপূর্ব পাড়া বাইতুল ফালা জামে মসজিদের ঈদগাহ পাকা করার একটি টেন্ডার আসে। যেখানে ১০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এলাকায় একটি মসজিদের ঢালাই কাজে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ২০ ফুট ইন্টু ৪০ ফুট পাকা কাজের একটি টেন্ডার ১১ লাখ ৮১ হাজার টাকা দিয়ে করা হয়েছে। স্থানীয় রাজমিস্ত্রিরা অভিযোগ করে বলেন- এ কাজ সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকাতেই করা সম্ভব। প্রায় ৯ লাখ কোথায় গেল?- এ প্রশ্ন এলাকাবাসীর। তাদের মতে স্থানীয় এনসিপি নেতারা এ টাকা আত্মসাৎ করেছে।
২০২৪ সালে বন্যার ১২ কোটি ৮০ লাখ টাকা নিয়ে কোনো স্বচ্ছ হিসাব দিতে পারেননি হাসনাত আবদুল্লাহ। এ সময় বন্যা দুর্গতদের সাহায্যের জন্য জনগণের কাছে টাকা নেওয়া হয়, কিন্তু সেই টাকায় ত্রাণ বিতরণ করা হয়নি।
দেবিদ্বার উপজেলার বরকামতা ইউনিয়নের প্রেমু গ্রামে কোনো সোলার লাইন না বসিয়েই খরচ দেখানো হয়েছে। প্রেমু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে সোলার লাইটটি আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা রাজীব মুন্সির বাজেটের। এটাকেই হাসনাত আবদুল্লাহ তার কাজ বলে দাবি করেছেন। তাহলে সোলারের টাকা কোথায় গেল? দেবিদ্বারে সোলার লাইট বসানো নিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহর একটিই অভিযোগ না, এমন একাধিক অভিযোগের পাহাড় জমা এলাকাবাসীর কাছে। হোসেনপুর মধ্যপাড়া মোবারক মাস্টারের বাড়ির সামেন নেই কোনো সোলার বাতি। এমনকি, নন্দীবাড়ি সংযোগস্থলে হোসেনপুর কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানের সামনে তিন রাস্তার মোড়েও নেই কোনো সোলার বাতি। ফেসবুক ও স্থানীয়দের অভিযোগকারীদের হাসনাত আবদুল্লাহর ক্যাডাররা হুমকি দিচ্ছে বলেও জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
সম্প্রতি বিএনপির একটি অনুষ্ঠানে ২০২৪ এর গণ অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তৎকালীন দুই নেতার বিরুদ্ধে ২৫ কোটি টাকার বৈষম্যের অভিযোগ তোলেন কুমিল্লা জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. মোস্তাক মিয়া। তিনি বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতারাই বৈষম্য করেছেন’। এ দুই নেতার বিরুদ্ধে দেওয়া মোস্তাক মিয়ার বক্তব্যটি মুহূর্তেই ভাইরাল হয় বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে। এ বক্তব্য প্রচারের পর অভিযোগকারী মোস্তাক মিয়ার সঙ্গে ফোনে কথা বলেন এমপি হাসনাত আবদুল্লাহ। এ সময় তাদের মধ্যে উচ্চবাচ্য বিনিময় হয়। সেই কথোপকথনও ছড়িয়ে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায়।
এ বিষয়ে কুমিল্লা জেলা পরিষদের প্রশাসক মোস্তাক মিয়া বলেছেন, ‘২৪-এর গণ অভ্যুত্থানে বিএনপিসহ সারা দেশের ছাত্র জনতার অংশগ্রহণে স্বৈরাচারের পতন ঘটে। অথচ কতিপয় ছাত্রনেতা অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গায়ের জোরে অনিয়ম ও বৈষম্য সৃষ্টি করেছেন।’ এ হলো হাসনাত আবদুল্লাহ। বাইরে তিনি স্বচ্ছতা, সুশাসন আর গণতন্ত্রের কথা বলেন। কিন্তু ভিতরে তিনি বিশ্বাস করেন পেশিশক্তি আর মব। ভিন্নমত দমন করতে বল প্রয়োগ করেন। সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে সমালোচকদের হুমকি দেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, হাসনাতের কর্মকাণ্ড একসময়ের লক্ষ্মীপুরের তাহের, ফেনীর জয়নাল হাজারীর কথা মনে করিয়ে দেয়। রাজনীতিতে তাহের, হাজারীর মতো গডফাদাররা বিদায় নিয়েছে, এখন নতুন গডফাদার তৈরি হচ্ছে?