রোনান সুলিভান ধীরে ধীরে হেঁটে এলেন ডি-বক্সে। পেনাল্টি মার্কে দাঁড়িয়ে বলটা ঠিক স্থানে রাখলেন। ঠান্ডা মাথায় শট নিলেন। ভারতীয় গোলরক্ষক সুরুজ ঝাঁপিয়ে পড়লেন ডান দিকে। তবে রোনান পানেনকা শটে ঠিক মাঝবরাবর বল পাঠিয়ে দিলেন জালে। সঙ্গে সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী এই ফুটবলার ছুটে গেলেন দর্শকদের কাছে। তাঁর পেছনে ছুটতে লাগলেন অন্য ফুটবলাররাও। গোলরক্ষক ইসমাইল হোসেন মাহিনের হাতে লাল-সবুজ পতাকা। ফুটবলাররা সেই পতাকা নিয়ে মালদ্বীপের রাজধানী মালের ন্যাশনাল স্টেডিয়ামের সবুজ জমিনে ‘ভিক্টরি ল্যাপ’ সম্পন্ন করলেন। সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপে আবারও চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ। নির্ধারিত সময়ে গোলশূন্য ড্র হওয়ায় ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। পেনাল্টি শুট-আউটে বাংলাদেশ ম্যাচ জিতে নেয় ৪-৩ ব্যবধানে।
শেষ হয়ে গেছে নির্ধারিত সময়ের খেলা। বাংলাদেশের আক্রমণের পর আক্রমণ রুখে দিয়েছে ভারত। গোল করতে দেয়নি তারা। রোনান সুলিভান, ফাহিম, মিঠুদের আক্রমণগুলো বারবারই ভারতের ডিফেন্স লাইনে এসে থেমে গেছে। কখনো ভারতীয় গোলরক্ষক সুরুজ থামিয়ে দিয়েছেন। তবে ম্যাচজুড়ে গোলের দারুণ সব সুযোগ তৈরি করে দর্শকদের মাতিয়ে রেখেছেন বাংলাদেশের ফুটবলাররা। মালদ্বীপের ন্যাশনাল স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে বেশির ভাগই ছিল প্রবাসী বাংলাদেশি দর্শক। তারা ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ’ চিৎকারে সমর্থন জুগিয়েছেন রোনান সুলিভানদের। দর্শকদের এমন উন্মাদনা বৃথা যেতে দেননি সুলিভানরা। দারুণ এক জয় উপহার দিলেন। এই ভারতের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বেও ড্র করেছিল বাংলাদেশ।
টাইব্রেকার শুরু হয় ভারতের ঋষিকান্তকে দিয়ে। বাংলাদেশের গোলরক্ষক মাহিন ডান দিকে ঝাঁপিয়ে ঋষির শটটা রুখে দেন। মালের ন্যাশনাল স্টেডিয়ামের গ্যালারি গর্জে ওঠে ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ’ চিৎকারে। এরপর বাংলাদেশের মোর্শেদ, চন্দন, আবদুল রিয়াদ ফাহিম টানা তিনটি গোল করেন ভারতের গোলরক্ষক সুরুজকে ব্যর্থ করে দিয়ে। ভারতের পক্ষেও টানা তিনটি গোল করেন আরবাশ, স্যামসন ও বিশাল যাদব। বাংলাদেশের চতুর্থ শট নিতে আসেন স্যামুয়েল। তাঁর শট ক্রসবারে লাগে। ভারতীয়দের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়। তাদের পঞ্চম শটটা নিতে আসেন ওমাঙ দুদুম। টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ তিনটি গোল করেছেন তিনি। কিন্তু টাইব্রেকারে গোল করতে ব্যর্থ হলেন। তাঁর শটে বল ক্রসবারের ওপর দিয়ে চলে যায়। এর পরই বাংলাদেশের পঞ্চম শট নিতে এসে পানেনকা শটে গোল করেন রোনান সুলিভান।
সাফের বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ কয়েক বছর ধরেই দুর্দান্ত খেলছে। ২০২৪ সালে নেপালের মাটিতে স্বাগতিকদের হারিয়ে অনূর্ধ্ব-২০ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ। গত বছর ভারতের মাটিতে হয় অনূর্ধ্ব-১৯ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। অরুণাচলে অনুষ্ঠিত সেই টুর্নামেন্টের ফাইনালে ভারতের কাছে টাইব্রেকারে হেরে যায় বাংলাদেশ। সে ম্যাচের অনেকেই গতকালও খেলেছেন। প্রায় এক বছরের ব্যবধানে মোক্ষম এক প্রতিশোধ নিয়ে নিল বাংলাদেশ। সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপ তিনবার অনুষ্ঠিত হয়েছে (২০২২, ২০২৪ ও ২০২৬)। এর মধ্যে দুবারই চ্যাম্পিয়ন হলো বাংলাদেশ। একবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ভারত। গতকাল চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশের ফুটবলাররা ট্রফি হাতে নিয়েই উৎসবে মেতে ওঠেন। সেই উৎসবে যোগ দেন সমর্থকরাও।
যুব দল গত কয়েক বছরে দারুণ সব সাফল্য উপহার দিয়েছে। জাতীয় দল কি সে পথে হাঁটতে পারবে এবার? চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের মাটিতেই অনুষ্ঠিত হবে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। ২০০৩ সালের পর সিনিয়র দল দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে পারেনি। এবার কি অধরা স্বপ্নটা পূরণ করতে পারবেন হামজারা? রোনান সুলিভানদের অর্জন কি তাঁদের অনুপ্রাণিত করতে পারবে? তা কেবল সময়ই বলতে পারবে। আপাতত যুব দলের অর্জনেই উৎসবমুখর ফুটবলপাগল বাংলাদেশ।