Bangladesh Pratidin

ঢাকা, রবিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২৩:১৫
পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়
তুহিন ওয়াদুদ
পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়
স্ত্রী কথাসাহিত্যিক অধ্যাপক আনোয়ারা সৈয়দ হক ও কবি সৈয়দ শামসুল হক

২৭ ডিসেম্বর ১৯৩৫। সৈয়দ শামসুল হক পৃথিবীর প্রথম আলো দেখেন। সাহিত্যকে অবলম্বন করে ১১/১২ বছর বয়স থেকেই শুরু হয় আলো দেখানো। শরীরী উপস্থিতি সাপেক্ষে তার সেই সাহিত্য-বিকিরণের যবনিকাপাত হলো ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬।

সৈয়দ শামসুল হক মৃত্শয্যায় সমাহিত হলেন। যে মাটি শরীরে মেখে বড় হয়েছেন, যেই জনপদের কথা বারংবার তার লেখায় উঠে এসেছে, সেই মাটিশয্যাই তিনি গ্রহণ করতে চেয়েছিলেন। কয়েক বছর ধরেই তিনি সেই ইচ্ছে পোষণ করছিলেন। কুড়িগ্রামের এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেও তিনি বলছিলেন তিনি কুড়িগ্রামেই সমাহিত হতে চান। তার সেই চাওয়া অপূর্ণ থাকেনি।

তার কবিতা সমগ্রের প্রথম কবিতাটি হচ্ছে ‘বুনোবৃষ্টির গান’। সেই কবিতার প্রথম চরণ—‘বৃষ্টি এসে ভেজায় কখন নাগেশ্বরীর মাঠ।’ সৈয়দ শামসুল হক সমাহিত হওয়ার প্রথম রাতেই নেমেছে বৃষ্টি। হয়তো সে বৃষ্টি বুনোবৃষ্টি নয়, সে বৃষ্টি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বৃষ্টির ধারার মধ্যে শান্তির বাণীসম। সৈয়দ শামসুল হককে দাফনের পর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আনোয়ারা সৈয়দ হক বলছিলেন—‘ওর লেখার ফাউন্ডেশন তো কুড়িগ্রাম দিয়ে। ও যেমনটি চেয়েছিল তেমনটি পেয়েছে। কবরের পাশে কী সুন্দর সবুজ ধানখেত।’

সৈয়দ শামসুল হক তার লেখায় যে জলেশ্বরীর কথা লিখেছেন সেই জলেশ্বরী সম্পর্কে তারই রহস্যমোচন বক্তব্য হচ্ছে—‘জলেশ্বরী হচ্ছে কুড়িগ্রাম শহর। তবে জলেশ্বরীতে যে মাজারটি পাওয়া যায়, সেই মাজারটি কবিকল্পনায় সৃষ্ট। জলেশ্বরীর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া যে আধকোষা নদীর নাম পাওয়া যায়।’ সেই রহস্যও মোচন করেছেন কবি। তিনি বলেছেন—কুড়িগ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ধরলাই হচ্ছে তার দেওয়া নাম আধকোষা। ভাষাকাঠামোতেও তিনি কুড়িগ্রামের আঞ্চলিক ভাষাকাঠামোর যথেষ্ট প্রয়োগ ঘটিয়েছেন।

সৈয়দ শামসুল হক কথার জাদুকর। তার পাণ্ডিত্যপূর্ণ এবং ঝরঝরে উচ্চারণ লেখ্যরীতি-কথ্যরীতি উভয় ধারাতে পাঠক-শ্রোতাকে মন্ত্রমুগ্ধ করার ক্ষমতাগুণ সম্পন্ন। তার সৃজনশীলতা আর মননশীলতা সময়ের বাতাবরণ অতিক্রম করেছে। সৈয়দ শামসুল হকের বস্তুগত উপস্থিতির চেয়ে শিল্পগত উপস্থিতি কোনো অংশে কম তৃষ্ণা মেটাবে না।

সৈয়দ শামসুল হক বেঁচে থাকাকালীন জীবতদের মধ্যে প্রধানতম কবি ছিলেন। এখন বাংলা ভাষার প্রধান কবিদের অন্যতম। সাহিত্যের সকল শাখায় তিনি ছিলেন পল্লবিত। মেধা-প্রজ্ঞায় শাণিত ছিলেন তিনি। সব সময়ে তার চলনে-বলনে একটি বিশেষ স্টাইল পরিলক্ষিত হতো। লেখার মধ্যেও তিনি যেন অন্যদের থেকে ক্রমাগত আলাদা হতে চেয়েছেন। শুধু তাই নয়, নিজের আগের লেখা থেকেও তিনি আলাদা হতে চেয়েছেন। এই আলাদা হতে চাওয়ার প্রবণতায় কোনো নিম্নগামিতা ছিল না। তিনি অনবরত নিজেকেও অতিক্রম করেছেন এবং সিঁড়ি বেয়ে উপরেই আরোহণ করেছেন। দীর্ঘ প্রায় ছয় দশক সাহিত্যের উঠানে সগর্ব উপস্থিতি শুধু বাংলা সাহিত্যে নয়, বিশ্ব সাহিত্যেও এ দৃষ্টান্ত বিরল। 

যদিও সৈয়দ শামসুল হক মনে করেন—তিনি সারা জীবন ধরে কিছুই করতে পারেননি। এ তার বিনয়ের নামান্তর মাত্র। গত এপ্রিলে তিনি কুড়িগ্রামে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বলেছেন—‘আমি সারা জীবন কিছুই করতে পারিনি এক নুরুলদীনকে আবিষ্কার করা ছাড়া।’ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তার বক্তব্যে নুরুলদীনকে আবিষ্কারের ঘটনাও বর্ণনা করেন।

ইতিহাসের হারিয়ে যাওয়া এক নায়ককে তিনি আবিষ্কার করেছেন। ব্রিটিশরা ভারতবর্ষের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নিয়ে শোষণ প্রক্রিয়া যখন আরও গভীরভাবে শুরু করেছিল সেই সময়ে নুরুলদীন নামের একজন রংপুর অঞ্চলে নেতৃত্ব দিয়ে প্রায় ৩৫ হাজার কৃষককে একত্রিত করে বিশাল আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। সেই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন নুরুলদীন। তিনিই প্রায় ৩৫ হাজার মানুষকে একত্রিত করেছিলেন। ইতিহাসের পাতা থেকে এত বড় একজন নায়ককে মুছে ফেলা হয়েছিল।

সৈয়দ শামসুল হক বিবিসিতে সাংবাদিকতা করার সময়ে ব্রিটিশদের পুরাতন নথিপত্র ঘাটতে গিয়ে দেখেছেন সেই নুরুলদীনের বীরদর্প সাহসিকতা। তারপর সৈয়দ শামসুল হক সেই সূত্র ধরে বাংলাদেশে এসে সেই ইতিহাসের বস্তুনিষ্ঠতা আবিষ্কার করেন। ব্রিটিশদের ক্ষমতার গোড়া কাঁপিয়ে তুলেছিলেন যে বীর সেই বীরকে কবি আবিষ্কার করেছেন। ইতিহাসের অন্ধকার থেকে আবার তাকে ইতিহাসের আলোয় এনেছেন। নুরুলদীনকে নিয়ে তিনি বিখ্যাত কাব্যনাট্য লিখেছেন—‘নুরুলদীনের সারাজীবন।’ তিনি লিখেছেন—‘আবার নুরুলদীন একদিন কালপূর্ণিমায় দেবে ডাক, জাগো বাহে, কোনঠে সবায়?’

বাংলাভাষায় যে কয়েকটি কবিতার চরণ মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হয় তার মধ্যে এ চরণটি অন্যতম। সৈয়দ শামসুল হক ওই অনুষ্ঠানে এ প্রসঙ্গে আরও বলেন— ‘ব্রিটিশরা নুরুলদীনের এই আন্দোলনের ভয়ে ভীত হয়ে এ অঞ্চলে প্রচুর জমিদার নিয়োগ করেছিলেন। সে কারণে অন্য যে কোনো এলাকার চেয়ে এ এলাকায় জমিদার বেশি ছিল।

‘নিষিদ্ধ লোবান’, ‘খেলারাম খেলে যা’, ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’, ‘নুরুলদীনের সারাজীবন’ সৈয়দ শামসুল হককে এমন এক মাত্রায় উন্নীত করেছে যেখানে কবি তার অমরত্বের বীজ রোপণ করে রেখেছেন। সময় থেকে সময়ান্তরে মানুষ তাকে রাখবে ‘পরানের গহীন ভিতরে’। জাগতিক সব মায়াবন্ধন থেকে আলাদা হলেও কবিসৃষ্ট বিশাল সাহিত্যসম্ভার তাকে আলাদা হতে দেবে না। কালতরঙ্গে কিছু কিছু প্রাণ বয়ে চলে সময়ের গতিতে। সৈয়দ শামসুল হক তাদেরই একজন। 

এই পাতার আরো খবর
up-arrow