Bangladesh Pratidin

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ আগস্ট, ২০১৭

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ আগস্ট, ২০১৭
প্রকাশ : শুক্রবার, ১০ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ৯ মার্চ, ২০১৭ ২৩:৫৯
কবির কথাশিল্প, কথাশিল্পীর কবিতা
নিবন্ধ । সরকার মাসুদ

কবির কথাশিল্প, কথাশিল্পীর কবিতা

বিশ শতকের গোড়ার দিকে কবিতা এবং গদ্যের ভাষারীতি পরস্পরের পরিপূরক, সহযোগী ও প্রভাবচিহ্নিত হয়ে উঠতে চেয়েছিল। জেমস জয়েস, ওয়াল্ট হুইটম্যান, চেশোয়াভ মিউশ, হেরমান হেস, স্য ঝন, পার্সের মতো জগদ্বিখ্যাত কারও কারও বেলায় তা অনেকখানি হতে পেরেওছিল।

আর মহামতি এলিয়ট সম্বন্ধে তো এ কথা নিঃসংশয়ে বলা যায় যে, সৃষ্টিশীল সেরা গদ্যের যেসব গুণ থাকে, সেগুলো তার কবিতা ভাষারও গুণ। অন্যদিকে ভাষার প্রভাবচিহ্নিত হওয়ার প্রশ্নে আমরা বোধ হয় জীবনানন্দ দাশের নামটিও একই পঙিক্ততে উচ্চারণ করতে পারি। তার ‘মাল্যবান’ এবং ‘জলপাইহাটি’ উপন্যাস দুটি মাথায় রেখেই আমি একথা বললাম।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে সাহিত্যের ওই লক্ষণ ক্রমশ সুস্পষ্ট ও সর্বব্যাপ্ত হয়ে ওঠে। ফরাসিদের হাত ধরে পৃথিবীর দেশে-দেশে গদ্য এবং পদ্য পরস্পর প্রবিষ্ট, পরস্পর প্রভাবসম্পাতী চেহারা নিতে শুরু করে। কবিতার ভিতর গদ্যের স্টাইল যেমন ঢুকে পড়ে তেমনি গদ্য সাহিত্যেও কবিতাশিল্পের নানা রং-রশ্মি, অনেক বর্ণচোরা আলো-ইমেজ স্থান পেয়ে যায় অবলীলায়। এক্ষেত্রে জয়েস ও এলিয়ট এমন দুজন যুগন্ধর শিল্পী, যারা তাদের সাহিত্যবস্তুর প্যাটার্নের গুণে, লিখনভঙ্গির স্বাতন্ত্র্যে সমসময় থেকে কমপক্ষে পঞ্চাশ বছর এগিয়ে ছিলেন। বিশেষ করে জয়েসের চৈতন্যপ্রবাহ রীতিটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সাহিত্য বিশ্বে যে তুলকালাম কাণ্ড ঘটে গেছে সে সম্বন্ধে অনেকেই জানেন। প্রথমদিকে জয়েসও কবিতা লিখেছেন। তার একটা কবিতাবইও আছে। কিন্তু মহাকাব্যিক ‘ইউলিসিস’-এর দর্শন—জীবনের বিশাল অর্থশূন্যতা ও অর্থময়তার মাঝামাঝি এক অশনাক্ত উপলব্ধি, মনস্তত্ত্ব, সংগীত ভাবনা, গণিতমনস্কতা প্রভৃতি বহুবিপ্রতীপ আইডিয়ার অন্তরালে যে কাব্য মর্মরিত হয়ে উঠেছে তা আক্ষরিক অর্থেই অভাবিত, অদৃষ্টপূর্ব। আবার জেমস জয়েসের বিপরীতে দাঁড়ানো সবচেয়ে শক্তিমান অপর স্কুলটির অন্যতম পথিকৃত্ ডি. এইচ লরেন্সের কথা ভাবা যাক। তার গদ্য জগতের বর্ণাঢ্যতা, তার ‘নষড়ড়ফ শহড়ষিবফমব’, তার সহজ গভীরশৈলী এবং মর্মস্পর্শী প্রজ্ঞা আমাদের এখনো যে সমানভাবে আপ্লুত করে তার কারণ লেখকের অসামান্য জীবনবাদিতা, সেই সঙ্গে দ্বন্দ্বজর্জরিত কবিমন।

লরেন্সের গল্প উপন্যাসে নানা ঋতুর উল্লেখ, নানা রকম ফুল ও পাখির প্রসঙ্গ; লম্বা, সুশ্রী, যুবতীদের ফর্সা, ঘাড়, চওড়া, কাঁধ ও চোখ-মুখের জীবন্ত বর্ণনা, আপ্লুত রোমান্টিক মুহূর্তের অবর্ণনীয় আবেগ, অর্থময় নীরবতা... এসব পাঠ করে তাকে আমার চিরবসন্তের গীতিকবি আখ্যা দিতে ইচ্ছা করেছিল। এ লরেন্স একজন বেশ ভালো কবিও। বেশ কিছু সফল কবিতারও জনক তিনি। ‘খড়ত্ফ ড়ভ ঃযব ভষরবং’ খ্যাত ঔপন্যাসিক নোবেল লরিয়েট উইলিয়াম গোল্ডিং (যিনি লেখকদের লেখক, যেমন আমাদের কমল কুমার, অমিয়ভূষণ) এর বিভীষিকা ও কলুষচেতনাদীপ্ত কথাসাহিত্যে, জন আপডাইকের গল্পে কুশীলবদের মধ্যকার ব্যক্তিত্ব সংকট ও ব্যক্তিত্ব সংঘাতে ঋদ্ধ প্রাত্যহিকতাময় সূক্ষ্ম উপলব্ধির জগতে কিংবা গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের ভেলকিবাজিভরা অতিবাস্তবতার ভূমিতে কবিতা গদ্যরান্নায় উত্কৃষ্ট মসলার ভূমিকা পালন করেছে। কথাশিল্পে নতুন যুগ সৃষ্টিকারী কবিতার এ নেপথ্য-ভূমিকা আমরা আরও লক্ষ্য করেছি হেরমান হেস, গুন্টার গ্রাস, উইলিয়াম ফকনার, হাসান আজিজুল হক, মার্গারেট অ্যাটউড, দেবেশ রায়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, শহীদুল জহির প্রমুখ লেখকের মধ্যে। হেস তো অভূতপূর্ব কবিও ছিলেন। অন্যদিকে, কথাসাহিত্যিক ও কবি গুন্টার গ্রাসের সমাজ-রাজনীতি মনস্ক কবিতাগুলোর প্রতীকী তাত্পর্যকেও খাটো করে দেখা যাবে না। তালিকা বাড়ানোর প্রয়োজন নেই। বরং অন্য কথায় প্রবেশ করা যাক।

এতক্ষণ বিশ শতকী কথাসাহিত্যের একাধিক লক্ষ্যযোগ্য বৈশিষ্ট্যের একটির ওপর যে আলোকপাত করা হলো, তা মুখ্যত কবিতার বা কবির আধিপত্যকে এক যুক্তিগ্রাহী, শক্ত-সমর্থ্য প্লাটফর্মের ওপর দাঁড় করানোর অভিপ্রায় থেকেই। কিন্তু একজন হেমিংওয়েকে আমি কখনোই ইয়েটসের চেয়ে খাটো শিল্পী ভাবতে পারি না। তেমনি একজন সিমাস হিনি কিংবা জন অ্যাশবেরি প্রতিভার বিচারে ফকনার বা ফরস্টারের কাঁধ সমান এ রকম ভাবাও সমীচীন নয়। আবুল হাসান ও বুলবুল চৌধুরী—দুজন দু ধরনের জীবনভাবুক। নিজ নিজ ক্ষেত্রে তাদের উল্লেখযোগ্য কাজ আছে। এদের সাহিত্যকর্মের তুলনামূলক বিচার হতে পারে। কিন্তু একজনের চেয়ে আরেকজন লেখক হিসেবে খাটো, এমন ভাববার অবকাশ নেই। তবে অন্য একটা ব্যাপার বোধ হয় সত্য। সেটা হচ্ছে, প্রধানত গদ্য লেখক কিন্তু উঁচু দরের কবিতাও লিখেছেন এমন সাহিত্যিকের চেয়ে প্রধানত কবি কিন্তু উচ্চমানের গল্প উপন্যাসও লিখেছেন এরকম লেখকের সংখ্যা পৃথিবীতে অনেক বেশি।

সুদূর অতীতের টমাস হার্ডি, এডগার অ্যালান পো, লরেন্স, অস্কার ওয়াইল্ডের মতো সব্যসাচীরা তো আছেনই; গত শতাব্দীর মধ্যভাগে দুজন কবির লেখা দুটি উপন্যাসের কথা আপাতত বলতে পারি। কবি ফিলিপ লারকেনের উপন্যাস অ মরত্ষ রহ রিহঃবত্ এবং কিংবদন্তির নায়িকা কবি সিলভিয়া প্লাথের ঞযব ইবষষ ঔবত্ আত্মজৈবনিক উপাদানে সমৃদ্ধ, অন্যজাতের হৃদয়স্পর্শী গদ্যগ্রন্থ। এগুলোর পাঠ আমার স্মরণীয় অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে আছে। হার্ডি, মিউস, হেরমান হেস বা অ্যাশবেরির মতো লেখকদের কবিতা পড়ার পরও আমার একই ধরনের অনুভূতি হয়েছিল। এখানে একটা কথা না বলে পারছি না। খুব ভালো, নিদেনপক্ষে ভালো কবিতা যিনি লিখেছেন, তার হাত দিয়ে যখন মানসম্মত গল্প-উপন্যাস বেরোয় তখন ‘একজন কবি এর চেয়ে ভালো কী গল্প লিখবেন’ এ জাতীয় মন্তব্য করেন অনেকেই। আবার একজন কথাসাহিত্যিক যদি মাঝারি মানের বা যথেষ্ট মানসম্মত কবিতা লিখে ফেলেন, তখনো ওই একই রকম কথা শোনা যায়। এ এক মহা বিভ্রান্তি। এর পেছনে আমার ধারণা, কাজ করে দুটো জিনিস। এক, কূপমণ্ডূকরা মনে করেন, কবিরা উঁচু দরের কথাসাহিত্য লিখতে অক্ষম। ফলে তাদের গল্প/উপন্যাস বিচার করতে বসার আগে ওই পাঠক লেখকের কবি সত্তাটির কথাই বেশি করে মাথায় রাখেন। দুই, একজন কথাসাহিত্যিকও যে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সৃজনশীল কবিতা লিখতে পারেন একথা সম্ভবত ছিদ্রান্বেষীদের মনে থাকে না। থাকলে এক্ষেত্রে, তারা তাদের কাব্য বিচার করতে বসার আগে লেখকের কথাশিল্পী সত্তাটির কথাই বার বার ভাবতেন না। সেজন্য ‘কবিদের লেখা গল্প’ কিংবা ‘গল্পকারদের লেখা কবিতা’ এরকম শিরোনাম আমার কাছে আদৌ সঠিক মনে হয় না। কেননা এর ভিতর একটা প্রশ্রয়ের সুর লুকিয়ে আছে। ভাবটা যেন এমন, কবিরা কথাসাহিত্য করেছেন; তাদের খানিকটা গ্রেস মার্কস দিয়ে দিন! স্মরণীয় কবিতা লিখতে সক্ষম একজন লেখকের অভিন্ন মগজ থেকে বেরিয়ে আসা গল্প উপন্যাস যদি তেমন মানসম্মত না হয়, তবে তা-ই। বিপরীত ক্ষেত্রেও তা ঘটতে পারে। কবির গল্প বা কথাসাহিত্যিকের কবিতা নামের গ্রেস মার্কস প্রকৃত সৃষ্টিশীল লেখক কখনোই নেবেন না। একজন কবি-কথাশিল্পী এ চ্যালেঞ্জ নিয়েই গদ্য পদ্য লিখতে নামেন, যদি কবিতার পাশাপাশি কথাসাহিত্যের ভাষাটিও তার আয়ত্তে থাকে।

কবিরা যে কেবল পাঠযোগ্য আধুনিক কথাসাহিত্য রচনা করেননি, কারও কারও কলম দিয়ে বেরিয়েছে খুবই উত্কৃষ্ট মানের গল্প-উপন্যাস; আমাদের বাংলা সাহিত্যেই তার অনেক প্রমাণ আছে। আলাউদ্দিন আল আজাদ, সৈয়দ শামসুল হক, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সুপ্রতিষ্ঠিত কথাসাহিত্যিক। কিন্তু এরা প্রত্যেকেই চমৎকার কবিতাও লিখেছেন : বিশেষত সুনীলের নীরাকেন্দ্রিক কাব্যগুচ্ছ এবং সৈয়দ হকের স্বদেশ দীপক ও নারীবিষয়ক বেশ কিছু কবিতা মনে রাখার মতো। আল মাহমুদ, হাসান হাফিজুর রহমান ও সাইয়ীদ আতিকুল্লাহর প্রাথমিক পরিচিতি কবি। কিন্তু প্রথমজন ‘পানকৌড়ির রক্ত’, দ্বিতীয়জন ‘আরো দুটি মৃত্যু’ এবং তৃতীয়জন ‘বুধবার রাতে’ নামের গল্পগ্রন্থের ভিতর দিয়ে প্রমাণ করেছেন তাদের কথা শিল্পীসত্তার বলিষ্ঠতা। প্রসঙ্গত. শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও মলয় রায় চৌধুরীর যথাক্রমে ‘কুয়োতলা’ এবং ‘ভেন্ন গল্প’ বই দুটির বৈশিষ্ট্যময় গদ্যসামর্থ্যের কথা এখানে বলতে চাই। আহমদ ছফা, আবদুল মান্নান সৈয়দ, আবু কায়সার, মুস্তফা আনোয়ার তাদের নিরবচ্ছিন্ন কাব্যচর্চার পাশাপাশি ব্যতিক্রমী ঘরানার সৃজনশীল গল্প-উপন্যাসও লিখেছেন। এক্ষেত্রে মনে হয়, আবদুল মান্নান সৈয়দ বৈচিত্র্য ও প্রাচুর্য দুয়ে মিলে তার অপরাপর সমকালিক বন্ধুদের চেয়ে এগিয়ে আছেন।

সত্তরের প্রজন্মের বিশিষ্ট কবি ইকবাল আজিজ কথাসাহিত্যেও বেশ সক্রিয় বলে মনে হয়। ছোটগল্পেও তিনি গ্রহণযোগ্য সৃষ্টিশীলতার স্বাক্ষর রেখেছেন ‘পানশালার সবুজ ফেরেশতা’ বইয়ের মাধ্যমে। তার উপন্যাস ‘এক অমানুষের ছায়া’ও মনোযোগের দাবিদার। অন্যদিকে একই প্রজন্মের বলিষ্ঠ কথাসাহিত্যিক নকিব ফিরোজ (সর্বশেষ গল্পগ্রন্থ ‘অপমৃত্যুর উপত্যকায়’) কবিতার ক্ষেত্রেও সৃজন সামর্থ্য দেখাতে পেরেছেন। এ লেখক অল্প কিছু কবিতা লিখেছেন যেগুলো এখনো অগ্রন্থিত। কবিতাগুলো প্রথানুগ কিন্তু কাব্যভাষা ও ব্যক্তি ভাবনার সাবলীলাগুণে উজ্জ্বল। সত্তরের আরেক কবি আলমগীর রেজা চৌধুরীও এক সময় (সম্ভবত ১৯৮৩-১৯৯৫-এর মধ্যে) কয়েকটি ভালো গল্প লিখেছেন। এখন লিখে চলেছেন উপন্যাস। শিহাব সরকার যদিও কবি হিসেবেই বেশি পরিচিত, তা সত্ত্বেও গত ৮/১০ বছর ধরে তিনি ছোটগল্পও লিখছেন। সত্তরের এই লেখক কবিতার ক্ষেত্রে নিজত্বমণ্ডিত ভুবন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন। কথাসাহিত্যেও তিনি সাবলীল ও স্বাতন্ত্র্যপ্রয়াসী।

এ যাবত্ তার তিনটি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে—ক. পতঙ্গ ও অন্যান্য গল্প, খ. মুক্তিযুদ্ধের গল্প, গ. লাইলী মজনু। সবকটি বইয়েই কথাসাহিত্যিক হিসেবে তার বিশিষ্টতার স্বাক্ষর বিদ্যমান।

আশির প্রজন্মের অগ্রগণ্য কবিদের মধ্যে কাজল শাহনেওয়াজ ও অমিতাভ পাল স্ব স্ব বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। উভয়েই একাধিক স্মরণযোগ্য ছোটগল্প লিখেছেন। কাজলের প্রথমদিককার গল্পগুলোর মধ্যে ‘কাছিমগালা’, ‘শাদা প্রজাপতি’ এবং ‘রোকনের মৃত্যু’ আলাদাভাবে উল্লেখের দাবি রাখে। পরেও তিনি ‘বাসেত হিরনচি’, ‘চাদের ব্লেড’, ‘উত্তম ভায়াগ্রা’র মতো কয়েকটি অসাধারণ গল্প লিখেছেন। এর সবগুলোই তার দুটি গল্প গ্রন্থ—‘কাছিমগালা’ (১৯৯৩) এবং ‘গতকাল লাল’ (২০০৭)-এর অন্তর্ভুক্ত। কথাসাহিত্যিক হিসেবে কাজল শাহনেওয়াজের আসনটি বেশ দৃঢ় এবং স্মরুচিনির্ণীত। তার সেরা গল্পগুলোতে কবির কল্পনাদ্যুতি এবং কথাশিল্পীর পর্যবেক্ষণী দৃষ্টি একবিন্দুতে এসে মিলেছে। স্বাতন্ত্র্যকামী গদ্যভাষা তো আছেই। আশির দশকের শেষদিকে অমিতাভ পাল তার কৃশকায় কাব্যগ্রন্থ ‘নতুন বাল্বের আলো’র ভিতর দিয়ে প্রকৃত অর্থেই আলো ছড়িয়েছিলেন। সেই ‘আলো’ আরও খানিকটা প্রসারিত হয়েছিল পরবর্তী সময়ে, নিজত্বময় স্টাইলে। এর অল্প কিছুকাল পরেই আমরা আবিষ্কার করি গল্পকার অমিতাভ পালকে। কবিতার মতোই গল্পের ক্ষেত্রেও এ লেখক গোড়া থেকেই স্বাতন্ত্র্যসন্ধানী।   হয়তো অধরা থেকে গেছে অনেক কিছুই, কিন্তু প্রাপ্তিও একেবারে কম হয়নি। মনে পড়ছে ‘রাতপঞ্জি’ নামের গল্পটার কথা (একই নামে লেখকের প্রথম গল্পগ্রন্থ বেরোয় ১৯৯৬/৯৭-এর দিকে) যার বিষয়বস্তু ও উপস্থাপনরীতি চারপাশের অসংখ্য প্রথানুগ গল্পের সঙ্গে খাপ খায় না। আবার তার ছোটগল্প পড়ে আমার এমন অভিজ্ঞতাও হয়েছে, যেন বাংলা গল্প পড়ছি না, পড়ছি ইংরেজি বা স্প্যানিশ ভাষার কোনো গল্প—এমনই তার শিল্পীদৃষ্টি ও গদ্যশৈলী।

কথাসাহিত্যিক হিসেবে এটাও অমিতাভের এক ধরনের অর্জন। দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ ‘অসচরাচর’ (২০১৬) এও শিল্পিত গদ্য ও কথাবস্তুর স্বার্থক সংযোগ লক্ষণীয়।

এ নিবন্ধের লেখক কবি হিসেবেই বেশি পরিচিত। কিন্তু তিন দশকের বেশি সময় ধরে তিনি কথাসাহিত্যের চর্চাও করে আসছেন। এ পর্যন্ত তার তিনটি গল্পের বই প্রকাশিত হয়েছে— ‘দূরবিনের ভেতর দিয়ে’ (২০০২), ‘আওরাবুনিয়ার কাঁটা’ (২০১২) এবং ‘অপমানের দিন’ (২০১৫)।

সাহিত্যের একাধিক মাধ্যমে যারা কাজ করেন তাদের সম্বন্ধে বলা হয় যে, তারা একক মাধ্যমে কাজ করা লেখকদের চেয়ে বেশি সংশয়ী। একথা রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে আজকের তরুণতম সব্যসাচী লেখক সম্বন্ধে সমানভাবে প্রযোজ্য। এ সংশয়াধিক্যের কারণ কি? কারণ সব্যসাচীর নানামুখী সৃষ্টিশীল কাজের বেলায় দেখা যায়, শিল্পের একটি মাধ্যম বেড়ে ওঠে অন্য একটিকে ছাড়িয়ে।

একটির দ্বারা কমবেশি বঞ্চিত হয় আরেকটি। তাছাড়া একাধিক লাইনে সৃজনক্ষমতা থাকলেও সচরাচর কোনো একটির দিকে লেখকের ঝোঁক বেশি থাকে। আবার তার অর্থ এটা নয় যে, অন্য মাধ্যমগুলোকে তিনি কিছুটা অবহেলা করছেন। প্রকৃতপক্ষে লেখালেখির নানা দিকে নানাভাবে তিনি সৃষ্টিশীল থাকতে চান। এজন্য তার মধ্যে লেখকসুলভ টানাপড়েন দেখা দেয়। দুই বা ততোধিক মাধ্যমে প্রতিনিয়ত কাজ করার জন্য তার অনেক বেশি সময় ভাবনা মনস্ক অনেক অবসর প্রয়োজন। উপরন্তু বিশ্বসাহিত্য ও জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় বিচরণের জন্যও চাই পর্যাপ্ত সময়। চাকরি নামক গোলামির খাঁচায় বন্দী, তৃতীয় বিশ্বের সর্বার্থে সুবিধাবঞ্চিত একজন উচ্চাশী লেখকের হাতে সেই সময় কোথায়? প্রতিভার বরপুত্রগণও, তাই, ভীষণ খণ্ডিত হীরকোজ্জ্বল সাফল্য প্রদর্শন করে ততোধিক বিমর্ষ মনে চিরবিদায় নিতে বাধ্য হন। এ বাস্তবতা যেমন ট্র্যাজিক তেমনি শিল্প-সাহিত্যের অপূরণীয় ক্ষতিরও কারণ।

 

এই পাতার আরো খবর
up-arrow