Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শুক্রবার, ১৮ আগস্ট, ২০১৭

ঢাকা, শুক্রবার, ১৮ আগস্ট, ২০১৭
প্রকাশ : রবিবার, ৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ৪ মার্চ, ২০১৭ ২২:১৮
বিশ্বখ্যাত দুঃসাহসী সাংবাদিকরা
সাইফ ইমন
বিশ্বখ্যাত দুঃসাহসী সাংবাদিকরা

সাংবাদিকতার ইতিহাস সাহসিকতার ইতিহাস। বিশ্বের সব প্রান্তেই সাংবাদিকদের ঝুঁকির মধ্যে সংবাদ সংগ্রহ করতে হয়।

সাংবাদিকরা তাদের কর্মনিষ্ঠা, সততা ও সাহসিকতা একবিন্দুতে মিলিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন নিরলসভাবে। সাংবাদিকদের কারণে ধরা পড়ছে বড় বড় চোরাচালান, প্রকাশিত হচ্ছে সত্য, বেরিয়ে আসছে নাশকতার নানা তথ্য ইত্যাদি। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে স্মরণীয় হয়ে আছেন বেশ কয়েকজন সাংবাদিক। তাদের কর্মজীবন অনুপ্রেরণীয়। হত্যা, হুমকিসহ নানা প্রতিবন্ধকতায় যারা সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। এমন কয়েকজন সাংবাদিকের কথা নিয়েই আজকের রকমারি—

 

প্রথমে অপহৃত হন পরে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার

♦  ড্যানিয়েল পার্ল, যুক্তরাষ্ট্র

দীর্ঘ সাংবাদিক ক্যারিয়ার রয়েছে ড্যানিয়েল পার্ল-এর। ২০০১ সালে ওয়ার্ল্ড স্ট্রিট জার্নালের দক্ষিণ এশিয়া প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন তিনি। এরপরই ভারতের মুম্বাইয়ে চলে আসেন এই সাংবাদিক। আল-কায়েদাকে নিয়ে অনুসন্ধানী রিপোর্ট তৈরির পরিকল্পনা করেন। পরবর্তীতে আল-কায়েদা অনুসরণের জন্য পাকিস্তানের অন্যতম ধর্মীয় নেতা শেখ মুবারক আলী গিলানির সাক্ষাৎকারের উদ্দেশে পাকিস্তানে আসেন। সময়টা ২০০২ সাল পাকিস্তানের করাচি। এই সুযোগটাই কাজে লাগায় জঙ্গিরা। এখান থেকেই একটি জঙ্গি গ্রুপ তাকে প্রথমে অপহরণ করে। পরে মুক্তিপণ দাবি করে।

এরপর জঙ্গিরা তার ওপর চালায় নানাবিধ শারীরিক অত্যাচার। দিনের পর দিন অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয় ড্যানিয়েল পার্লের ওপর। এরপর ধারালো ছুরি দিয়ে গলা কেটে হত্যা করে জঙ্গিরা এবং পুরো ঘটনাটির ভিডিও ধারণ করে তারা। ২০০২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি জঙ্গিরা ভিডিওটি গণমাধ্যমের কাছে পাঠায়। আল-কায়েদাকে নিয়ে তার সাহসী খবরগুলো বিশ্ববাসীকে নাড়া দিয়েছিল।

 

গণহত্যার বিরুদ্ধে  প্রতিবাদী কণ্ঠ

♦   হান্ট ডিঙ্ক, তুরস্ক

হান্ট ডিঙ্ক ছিলেন তুরস্কের সংবাদপত্র ‘আগস’-এর প্রধান সম্পাদক। ১৯৮০ সালে জেনারেল কেনান সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করলে হান্ট ও তার বাবা ধরা পড়েন। তুর্কি বিরোধী সংগঠন প্যারিসে তুর্কি রাষ্ট্রদূতকে জিম্মি করলে সরকার হান্ট ও তার বাবাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ‘আগস’ সংবাদপত্রের মাধ্যমে সাহসী এই সাংবাদিক আর্মেনীয় জনগণের ওপর তুর্কি জেনারেলদের গণহত্যা, নিপীড়ন ও সমস্যার কথা তুলে ধরতেন। পাশাপাশি তিনি অন্যান্য জাতীয় দৈনিকেও নিয়মিত কলাম লিখতেন। তার লেখা পড়েই বিশ্ব-মিডিয়া আর্মেনীয় জনগণের দুঃখ-দুর্দশা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হতো।

২০০৭ সালে তারই সংবাদপত্র ‘আগস’ এর অফিসের কাছে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

 

স্বাধীনতাকামীদের  পক্ষে সোচ্চার

♦  আনা পলিটকোভস্কি, রাশিয়া

আনা পলিটকোভস্কি ইউক্রেন বংশোদ্ভূত রাশিয়ান সাংবাদিক ও লেখক। চেচেন স্বাধীনতাকামীদের পক্ষে সোচ্চার ছিল এই নারী সাংবাদিকের কলম। তুলে ধরেন তাদের ওপর নির্যাতনের নানা তথ্য। তখন চেচেনদের পক্ষ নেওয়াকে রাশিয়ার গণমাধ্যমে দেশদ্রোহিতার শামিল বলে মনে করা হতো। অথচ সেসব তুচ্ছ করে সাহসী এই নারী সর্বপ্রথম চেচনিয়া নির্যাতন সম্পর্কে বিশ্বের সামনে তুলে ধরেন। সামরিক কর্মকর্তারা চেচনিয়া থেকে যাকে খুশি ধরে বন্দিশিবিরে নিয়ে যায়। এরপর চলে অমানুষিক নির্যতন। ইলেকট্রিক শক থেকে শুরু করে অবাধে চলে ধর্ষণ—এই ভয়াবহ সব খবর তার হাত ধরেই চলে আসে গণমাধ্যমে। তোলপাড় শুরু হয় বিশ্বব্যাপী। শুধু রাশিয়া নয়, গোটা বিশ্বে তিনি সাহসী সাংবাদিকতার জন্য অনুপ্রেরণীয় একজন।

 

হুমকি কখনই দমাতে পারেনি তাকে

♦  সাঈদ সালেম শাহজাদ, পাকিস্তান

সাঈদ সালেম শাহজাদ হংকং ভিত্তিক এশিয়া টাইমস অনলাইনের পাকিস্তান ব্যুরো প্রধান ছিলেন। জঙ্গিবাদ, তালেবান ও আল-কায়েদা ছিল সাঈদ সালেম শাহজাদের সাংবাদিকতার বিষয়। প্রায়ই তাকে দেখা যেত তালেবান অধ্যুষিত এলাকায়। লিখতেন তালেবান সম্পর্কিত নানা অজানা কথা। এ সংক্রান্ত তার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলো বিশ্ব মিডিয়ায় তোলপাড় ফেলে দেয়।    তালেবানকে সেনাবাহিনীর সহায়তার কথা তিনিই লেখেন তার বই ‘ইনসাইড আল কায়েদা অ্যান্ড তালিবান : বিয়ন্ড বিন লাদেন অ্যান্ড নাইন ইলেভেন’-এ। এ কারণেই পাকিস্তানি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর নজরে  পড়েন। তালেবান থেকে একের পর এক হুমকি—কোনো কিছুই দমাতে পারেনি তাকে।

 

ছদ্মবেশে জেলখানায়  দিনের পর দিন  

♦  মেডিলাইন জে দ্যোতি, যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্রের মেডিলাইন জে  ছিলেন একাধারে একজন আইনজীবী, সাংবাদিক এবং লেখিকা। তিনি ছদ্মবেশে জেলখানায় হাজতিদের সঙ্গে দিনের পর দিন কাটিয়েছেন নানা তথ্য সংগ্রহের জন্য। ১৯৯০ সালে রাশিয়ায় জেলে ছদ্মবেশে কারাবন্দী জীবন কাটান। এ সময় তিনি কথা বলেছেন অন্য কয়েদিদের সঙ্গে। অপরাধের মোটিভ এবং অপরাধীদের মনস্তত্ত্বের নানা দিক নিয়ে গবেষণা করেছেন। তার এই গবেষণা ক্রিমিনাল সাইকোলজিস্টদের জন্য পরবর্তীতে অত্যন্ত কার্যকরি ভূমিকা রাখে। এ ছাড়াও জেলখানার অসুস্থ পরিবেশে থেকে সেখানকার নানাবিধ সমস্যা ও অসঙ্গতি উঠে আসে মেডিলাইন জে দ্যোতির লেখনীতে। নারী হয়েও এমন সাহসী পদক্ষেপ নেওয়ার এমন নজির ইতিহাসে বিরল।

 

হত্যার হুমকিতে পরোয়া নেই

♦   লাসান্থা বিক্রমাতুঙ্গে, শ্রীলঙ্কা

শ্রীলঙ্কার জাতীয় ইংরেজি দৈনিক সানডে লিডার এর সম্পাদক লাসান্থা বিক্রমাতুঙ্গে। সরকার ও তৎকালীন তামিল টাইগারদের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা উঠে আসতে থাকে এই সাংবাদিকের লেখনীতে। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রী গৌতব্য রাজাপাকসে অস্ত্রচুক্তি নিয়ে এক প্রতিবেদনের কারণে লাসান্থার নামে মানহানির মামলা করেন। যার প্রেক্ষিতে ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে সানডে লিডারে তিনি এক প্রবন্ধ লেখেন যার শিরোনাম ছিল ‘যদি তুমি লেখ, তোমাকে হত্যা করা হবে’। এর কিছুদিন পরই ২০০৯ সালের ৮ জানুায়ারি সকাল সাড়ে ১০টায় অফিসে যাওয়ার পথে চার মোটরসাইকেল আরোহী লাসান্থাকে গুলি করে পালিয়ে যায়। পরে তাকে কলম্বো ন্যাশনাল হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। হাসপাতালে নেওয়ার তিন ঘণ্টার মধ্যে তিনি মারা যান।

 

অপরাধ সাংবাদিকতায় পথিকৃৎ ব্যক্তি

♦ জ্যোতির্ময় দে ভারত

জ্যোতির্ময় দে ভারতের মুম্বাই শহর থেকে অপরাধের শিকড় তুলে ফেলতে চেয়েছিলেন। তাকে বলা হয় ‘ফাদার অব ক্রাইম রিপোর্টিং’। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস সংবাদপত্রের এই সাহসী সাংবাদিক মুম্বাই শহরের অপরাধীদের মুখোশ খুলতে থাকেন তার প্রতিবেদনে। এমনকি দাউদ ইব্রাহিম ও ছোটা রাজন বিপদের মুখে পড়ে। ফলে একের একের পর মৃত্যু হুমকি তার জন্য হয়ে নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনা। কিন্তু কোনো কিছুই দমাতে পারেনি এই অকুতভয় সাংবাদিককে। জানা যায়, এক হত্যাকাণ্ডের অনুসন্ধান করতে গিয়ে জ্বালানি তেল সিন্ডিকেটের খোঁজ পান জ্যোর্তিময়। যে কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ছোটা রাজন এবং তার মাস্টারমাইন্ড দাউদ ইব্রাহিমের ভাই ইকবাল কাসকার জড়িত আছে বলে অনেকে ধারণা করেন।

 

৪০ বছর ধরে  ছদ্মবেশী সাংবাদিক

♦  গান্টার ওয়ালরাফ, সুইডেন

১৩টি অপ্রত্যাশিত সংবাদের মাধ্যমে সাংবাদিকতার ক্যারিয়ার শুরু করেন গান্টার ওয়ালরাফ। শুরুতে ছদ্মবেশী এই সাংবাদিক দুষ্প্রাপ্য সব ঘটনার মোড়ক উন্মোচন করেছেন জীবনবাজি রেখে। সংবাদ সংগ্রহে কখনো তিনি হয়েছেন ফ্যাক্টরির লেবার, আবার সেজেছেন মাতাল কিংবা ক্যামিকেল ফ্যাক্টরি কর্মী। ভ্যগাবন্ড সেজে ঘুরেছেন শহরের অলিগলি। বার বার বিপদের মুখে পড়েছেন কিন্তু থেমে থাকেননি। ১৯৬৯ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত টানা ৪০ বছর ছদ্মবেশে সাংবাদিকতা করেছেন এই সাহসী সাংবাদিক। তিনি এতই ভালো আর দক্ষতার সঙ্গে কাজ করেছেন যে সুইডিশ ডিকশনারি তার নামানুসারে একটি নতুন শব্দ যোগ করেছে—walraffa : to expose misconduct from the inside by assuming a role.

 

চোরাচালানের বিরুদ্ধে নির্ভীক

♦   টিম লুপস, ব্রাজিল

ব্রাজিলের পথিকৃৎ সাংবাদিক টিম লুপস। ব্রাজিলের সব ধরনের নেশাদ্রব্য ও অবৈধ অস্ত্র চোরাচালানের বিরুদ্ধে এই সাংবাদিকের কলম ছিল সর্বদা জাগ্রত। বহুবার হত্যার হুমকি এলেও পাত্তা দেননি কখনো। ২০০১ সালে একে-৪৭ এর অনেক বড় এক চালান পাচারের খবর পান টিম লুপস। তিনি তা তুলে ধরেন সচিত্র প্রতিবেদনের মাধ্যমে। এর ফলে সেই চালানটি সুবিধা করতে পারেনি। ধরা পড়ে যায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে। এরপরই অপরাধীরা পরিকল্পনা করে টিম লুপসের কলম থামিয়ে দেওয়ার। তিনি দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় আততায়ীর হাতে নিহত হন।

 

মুখোশ উন্মোচনে বদ্ধপরিকর

♦   ভেরোনিকা গুইরেন, আয়ারল্যান্ড

দুঃসাহসী সাংবাদিকদের তালিকায় ভেরোনিকা গুইরেনের নাম সব সময় উপরের সারিতেই থাকবে। তিনিই সাংবাদিক ভেরোনিকা গুইরেন—যার জীবন নিয়ে হলিউডে চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে। এই সাংবাদিক অপরাধ বিষয়ক সংবাদ কভার করতেন। ১৯৯৪ সাল থেকে তিনি কাজ করেন আয়ারল্যান্ডের জনপ্রিয় সংবাদপত্র সানডে ইন্ডিপেনডেন্টে। এ সময় তিনি অনেক বড় বড় অপরাধীর মুখোশ উন্মোচন করেন তার লেখার মাধ্যমে। তার লেখনীতেই প্রথম উঠে আসে অপরাধীদের সঙ্গে আইরিশ পুলিশ ও রিপাবলিকান আর্মির সখ্যতার নানা তথ্য। আইরিস মাদক সম্রাট জন জিলিগ্যানের শিষ্য জন ট্রেইনরের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রতিবেদন লেখা প্রকাশের পর অনবরত মৃত্যুর হুমকি পেতে থাকেন ভেরোনিকা। ১৯৯৬ সালের ২৬ জুন জিলিগ্যানের ভাড়াটে খুনিরা গুলি করে তাকে। ভেরোনিকার জীবন নিয়ে ২০০৩ সালে বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার জোয়েল সুমাখার চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। সেখানে উঠে আসে এই নারী সংবাদিকের সাহসিকতার নানা কাহিনী। এই সাহসী নারী সংবাদিকের সম্মানে ডাবলিন পার্কে একটি ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow