২১ নভেম্বর, ২০২১ ১০:১০

বাংলাদেশিসহ ১১ মিলিয়ন অভিবাসী ক্ষুব্ধ

মার্কিন কংগ্রেসে বিল পাস সিটিজেনশিপ প্রদানের প্রসঙ্গ না থাকায় গভীর হতাশা

লাবলু আনসার, যুক্তরাষ্ট্র

বাংলাদেশিসহ ১১ মিলিয়ন অভিবাসী ক্ষুব্ধ

ফাইল ছবি

মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে কেবলমাত্র ডেমোক্র্যাটদের ভোটে গত শুক্রবার পাস হওয়া স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং পরিবেশ সুরক্ষায় উচ্চাভিলাষী ১.৯ ট্রিলিয়ন ডলারের বিলে নেই কাগজপত্রহীন লক্ষাধিক বাংলাদেশিসহ ১১ মিলিয়ন অভিবাসীকে নানা পরিক্রমায় সিটিজেনশিপ প্রদানের প্রসঙ্গ। সেখানে রয়েছে ২০১১ সালের আগে থেকে যারা বেআইনিভাবে বসবাস করছে, তাদেরকে ওয়ার্ক পারমিটসহ অস্থায়ীভাবে বসবাসের প্রসঙ্গ। অথচ নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ক্ষমতা গ্রহণের দিনই কংগ্রেসকে উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছিলেন যে, ১১ মিলিয়ন কাগজপত্রহীনের মধ্যে যারা কোনো ধরনের অপরাধে লিপ্ত ছিল না, যারা ট্যাক্স প্রদান করেছেন নিয়মিতভাবে- তাদেরকে গ্রিনকার্ডের পথ বেয়ে সিটিজেনশিপ প্রদান করা হবে। অথচ পাস হওয়া এই ‘বিল্ড ব্যাক বেটার’ বিলে সে প্রসঙ্গ নেই। এ নিয়ে প্রচ- ক্ষোভ এবং হতাশা দেখা দিয়েছে প্রবাসী বাংলাদেশিসহ অভিবাসী সমাজে। ‘দ্য নিউইয়র্ক ইমিগ্রেশন কোয়ালিশন’র নির্বাহী পরিচালক মুরাদ আওয়াদ তাৎক্ষণিক এক বিবৃতিতে ইউএস সিনেটের লিডার চাক শ্যুমারের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন, বাইডেনের নির্বাচনী অঙ্গীকারের পরিপূরক বিল পাসের জন্যে। অন্যথায় সামনের বছরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অটুট রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

উল্লেখ্য, এই বিলে রিপাবলিকানরা ভোট দেয়নি। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির একজন কংগ্রেসম্যানও বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন। অথচ রিপাবলিকানদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পরই তা ভোটে দেওয়া হয়েছিল। এই বিলটি পাসের আগের দিন প্রেসিডেন্ট বাইডেন অবকাঠামো উন্নয়নের জন্যে ১.২ ট্রিলিয়ন ডলারের একটি বিলে স্বাক্ষর করেন। অর্থাৎ আমেরিকার সামগ্রিক উন্নয়নের প্রত্যাশার পরিপূরক বিশাল কর্মযজ্ঞে লিপ্ত হবে আমেরিকানরা। এর মধ্য দিয়ে করোনায় বিধ্বস্ত অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হবে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে কাগজপত্রহীন বিরাট এই জনগোষ্ঠীকে স্থায়ীভাবে বসবাসের স্বপ্নকে অবজ্ঞার মধ্য দিয়ে ডেমোক্র্যাটরা প্রকারান্তরে নিজেদের জনপ্রিয়তায় ধস নামানোর ক্ষেত্র প্রশস্ত করলেন বলে ইমিগ্র্যান্ট-কম্যুনিটির নেতারা মন্তব্য করেছেন।

অভিবাসীদের অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নে আপসহীন ডেমোক্র্যাট এবং ইউএস সুপ্রিম কোর্টের অ্যাটর্নি মঈন চৌধুরী বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন, নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণে কার্পণ্য করার পরিণতি কারও জন্যেই শুভ হবে না। তাই আশা করছি সিনেটে ডেমোক্র্যাট লিডার চাক শ্যুমার বিষয়টি বিলে যুক্ত করতে আন্তরিকতার প্রমাণ দেবেন।
এর আগে উত্থাপিত বিলে গত ১ জানুয়ারির আগে থেকে যারা কাগজপত্রহীন এবং কোনো ধরনের অপরাধে লিপ্ত নেই তাদেরকে নানা পরিক্রমায় গ্রিনকার্ডের সিঁড়ি বেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সিটিজেনশিপ প্রদানের প্রসঙ্গ ছিল। সেটি কেন বাদ পড়েছে তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন অ্যাটর্নি মঈন।

এই বিলে অভিবাসন-ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে ১০০ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দের প্রসঙ্গ রয়েছে। তা দিয়ে একশ জন ইমিগ্রেশন জজ নিয়োগসহ বিভিন্ন সেক্টরে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ করা হবে। পারিবারিক কোটাসহ বিভিন্ন সেকশনে ভিসা প্রসেসিংয়ের কাজ ত্বরান্বিত করা হবে। এসাইলামের আবেদন প্রসেসিংয়ের গতিও বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন। এ ছাড়া, নানাবিধ দুর্যোগের পরিপ্রেক্ষিতে নিরাপত্তার জন্যে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকারী বিদেশিদের অস্থায়ীভাবে বসবাসের সময় বাড়ানো হবে। ২০১১ সালের আগে থেকে অবস্থানরত ৭০ লাখ কাগজপত্রহীন অভিবাসী পাবেন ওয়ার্ক পারমিট। সেটিই হবে নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে। ওয়ার্ক পারমিটের পথ ধরে গ্রিনকার্ড ইস্যুর কোনো কথা নেই এই বিলে। এ জন্যই ক্ষোভ তৈরি হয়েছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।

সর্বশেষ ১৯৮৭ সালে প্রেসিডেন্ট রিগ্যানের আমলে দেওয়া অ্যামনেস্টির আওতায় ৩০ লাখের মতো বিদেশি গ্রিনকার্ড পেয়েছেন। এরপর শুধু কথার ফুলঝুরি ফুটেছে, কখনোই কাগজপত্রহীনদের মধ্যে যারা কঠোর পরিশ্রমী, মেধাবী, উদ্যমী এবং উদ্যোক্তা-তাদেরকে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি দেওয়ার জন্যে কেউই কোনো বিধি করেননি। বিল ক্লিন্টনের আমলে গ্রিনকার্ডধারীরা অপরাধ করে দুই বছরের বেশি দন্ড ভোগ করলেই তার গ্রিনকার্ড কেড়ে নিয়ে নিজ দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার বিধি হয়েছে। এরপর বারাক ওবামাকে বিপুল বিজয় দিয়েও কোনো লাভ হয়নি কাগজপত্রহীন অভিবাসীদের। জুনিয়র বুশের শেষ আমলে অবশ্য বৈধপথে যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর যারা গ্রিনলাভে সক্ষম হননি তাদেরকে অভিবাসনের মর্যাদা সমন্বয়ের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। হাজার হাজার বাংলাদেশিসহ ১০ লাখের অধিক বিদেশি সে সুযোগে সিটিজেনশিপ লাভে সক্ষম হয়েছেন। ট্রাম্পের আমলে অভিবাসন কার্যক্রমকে স্থবিরতায় লিপ্ত করা হয়েছে। এ জন্যে বাইডেনের অঙ্গীকারকে আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করেই সবাই তাকে বিজয়ী করতে সর্বাত্মক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তিনিও এমন হতাশার পরিস্থিতি তৈরি করায় অভিবাসী সমাজ ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। নিউইয়র্ক, ফিলাডেলফিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেস, বস্টন, হিউস্টন, মায়ামি, আটলান্টা, ডেট্রয়েট, শিকাগোসহ বিভিন্ন সিটিতে শুক্রবার মানববন্ধন-সমাবেশ হয় ‘বিল্ড ব্যাক বেটার’ বিলকে সিনেটে ঢেলে সাজানোর জন্যে।

বিডি প্রতিদিন/হিমেল

এই বিভাগের আরও খবর

সর্বশেষ খবর