শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৮ জুলাই, ২০২০ ২২:১২

জাদুকরী হুমায়ূন

জাদুকরী হুমায়ূন
Google News

কলমের জাদুকর হুমায়ূন আহমেদ। গান, নাটক ও চলচ্চিত্র দিয়ে মানুষের মনকে আলোড়িত করেছেন। গল্পে জীবনের কথা বলেছেন, আনন্দ-বিষাদে ভাসিয়েছেন। এ কারণেই তিনি অনিবার্য প্রসঙ্গ হয়ে উঠেছেন। আজ নন্দিত এই কথাসাহিত্যিকের অষ্টম প্রয়াণ দিবস। তাঁকে নিয়ে লিখেছেন-আলাউদ্দীন মাজিদ ও পান্থ আফজাল

হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয় গানের প্রেক্ষাপট

কেবল সাহিত্যেই নন, সংগীতেরও পরশপাথর ছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। তা যেমন তাঁর লেখা গানের জনপ্রিয়তায় স্পষ্ট, তেমনি তাঁর গানের শিল্পীদের উজ্জ্বল উপস্থিতিতেও। এক একটি গান যেন একটি গল্পের প্রেক্ষাপটে তৈরি। তাঁর লেখা গানে কণ্ঠ দিয়েছেন এস আই টুটুল, মেহের আফরোজ শাওন, বারী সিদ্দিকী, সেলিম চৌধুরী, সাবিনা ইয়াসমিন, সুবীর নন্দী, এন্ড্রু কিশোর, মমতাজ, কুমার বিশ্বজিৎ, আগুন, সফি ম-ল, আঁখি আলমগীর, ফজলুর রহমান বাবু, হাবিব, কণা, কোনাল ও কিশোর। তাঁর জনপ্রিয় কয়েকটি গানের পেছনের গল্প নিচে তুলে ধরা হলো।

নদীর নামটি ময়ূরাক্ষী (শাওনের মান ভাঙানোর গান)

হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে মাঝে মাঝেই ভালোবাসার খুনসুটি-অভিমান লেগে থাকত মেহের আফরোজ শাওনের। শাওনের বড় অভিমানের কারণ, হুমায়ূন আহমেদ তাকে কোথাও বেড়াতে নিয়ে যেতেন না। এমনকি বিয়ের পর হানিমুনেও নিয়ে যাননি তাকে। হুমায়ূন নিজেই বেড়াতে ও আড্ডা দিতে খুব পছন্দ করতেন; তাও আবার একগাদা অর্থাৎ ২০ জনের দল নিয়ে ভ্রমণ। তাই শাওনের খুবই দুঃখ ছিল যে একা একা কখনো হুমায়ূনের সঙ্গে বেড়ানো হয়নি, কোথাও গেলে যেতে হয়েছে দলের সঙ্গে। এক দিন শাওনের খুবই মন খারাপ হলো। কারণ, তাকে কখনো সমুদ্র-পাহাড় দেখাতে নিয়ে যাওয়া হয়নি। এই নিয়ে ভালোই একটা ঝগড়া হলো হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে শাওনের। শাওন অভিমান করে মায়ের বাড়িতে চলে গেলেন। হুমায়ূন আহমেদের খুবই মন খারাপ হলো। তাই শাওনের মান ভাঙাতে তখন এস আই টুটুলকে ডেকে পাঠালেন। শাওনের মান ভাঙাতে তিনি ‘নদীর নামটি ময়ূরাক্ষী’ গানটি লিখেন। এরপর এস আই টুটুলকে সেই কথার ওপর সুর সংযোজন করে গানটি শাওনকে ডেকে এনে শোনাতে বলেন। টুটুল তখন তার বুবুকে (শাওন) গেয়ে শুনিয়েছিলেন গানটি। আর যাবে কোথায়? শাওনের মান-অভিমান গলে এরপর সব পানি! এমন গান শুনলে নদী-সমুদ্র-পাহাড় দেখার লোভ সংবরণ করা যায়।

 

‘প্যাকেজ সংবাদ’ নাটকের ‘চিকামারো’ গান 

সেলিম চৌধুরী প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদের দুটি নাটকে অভিনয় করেছেন। একটি ‘প্যাকেজ সংবাদ’, অন্যটি ‘সমুদ্র বিলাস’। সেলিমের গান গাওয়ার সঙ্গে নাটকে অভিনয় করাটা প্রিয় কথাসাহিত্যিকের ইচ্ছায়। যদিও ‘প্যাকেজ সংবাদ’ নাটকে অভিনয় করার কথা ছিল না সেলিমের। তখন ছিল প্যাকেজ নাটক কেনার হিড়িক। তাই তিনি এই বিষয়টি নিয়ে স্যাটারধর্মী একটি নাটক করতে চাইলেন। সেলিমকে প্যাকেজ নাটকের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে একটি ক্যারিকেচার গান গাইতে বললেন। তিনি বললেন, ‘এই চিকামারো গানটি তোমার মেজাজে না গেয়ে একটু ফানি করে গাও। আর মিন্টুর সঙ্গে তুমিও অভিনয় করবে। তুমি নাচানাচি করে গানটি করবে।’ এরপর সেলিম কাঠমুলার কোম্পানির ড্রেস আর সানগ্লাস পরে চিকামারো গানটি করলেন। হুমায়ূনের মাধ্যমে ১৯৯৫ সালে ‘ওইজা বোর্ড’ নাটকে ‘আইজ পাশা খেলব রে শাম’ গানটি দিয়ে সেলিম আলোচনায় আসেন।

 

কুদ্দুসের কণ্ঠে ‘এই দিন দিন নয়...’

১৯৮৯ সালে হুমায়ূন আহমেদের ‘খাদক’ নামের একটি নাটকে গান করে ‘নেত্রকোনার বাউল’ হিসেবে পরিচিতি পান কুদ্দুস বয়াতি। ১৯৯২ সালের দিকে ‘এই দিন দিন নয় আরও দিন আছে...’ গানটির মাধ্যমে কুদ্দুস বয়াতির রাজকীয় উত্থান ঘটে পুরো বাংলাদেশে। জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘শুক্লপক্ষ’-এ গানটি গেয়েছিলেন কুদ্দুস বয়াতি। জনসচেতনতামূলক ওই ধারাবাহিকে কুদ্দুস বয়াতি নিজ নামে অভিনয়ও করেছিলেন।

 

‘মরিলে কান্দিস না আমার দায়’

হুমায়ূন আহমেদের একটি খুব প্রিয় গান আছে। গিয়াসউদ্দিনের লেখা ‘মরণ সংগীত’- ‘মরিলে কান্দিস না আমার দায়’। এই গানটি নিয়ে হুমায়ূন আহমেদ নিজেই বলে গেছেন, ‘প্রায়ই ভাবী আমি মারা গেছি, শবদেহ বিছানায় পড়ে আছে, একজন কেউ গভীর আবেগে গাইছে- ‘মরিলে কান্দিস না আমার দায়’। ‘নক্ষত্রের রাত’ নামের ধারাবাহিক নাটকের শুটিং ফ্লোরে আমি আমার ইচ্ছা প্রকাশ করলাম এবং একজনকে দায়িত্ব দিলাম গানটি বিশেষ সময়ে গাইতে। সে রাজি হলো।’ সেই বিশেষ মানুষটি হলো মেহের আফরোজ শাওন।

 

বারী সিদ্দিকীর কণ্ঠে ‘শুয়া চান পাখি’

বিটিভিতে হুমায়ূন উপস্থাপিত একটি অনুষ্ঠানে বারী সিদ্দিকীকে একটি গান গাইতে দিয়েছিলেন ‘বন্ধুয়ারে তোমার মনে যাহা লয়’। ওই গানের পর হুমায়ূন তাকে বলেছিলেন, ‘তুমি ভালো গান গাও, তোমার গান আমি সিনেমায় রাখব।’ প্রথমে বারী সিদ্দিকীকে উনি সুর করতে বলেছিলেন, পরে বললেন তুমি গাও। ১৯৯৮ সালে হুমায়ূন ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ নামে ছবি নির্মাণ করেন। সেই ছবিতে ‘শুয়া চান পাখি’, ‘আমার গায়ে যত দুঃখ সয়, ‘পুবালী বাতাসে’ জনপ্রিয় হয়।

 

 

হুমায়ূন আহমেদের চলচ্চিত্র

চলচ্চিত্রেও মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন হুমায়ূন আহমেদ। নব্বইয়ের দশকে চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করেন তিনি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ৮টি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন। সব চলচ্চিত্রেরই কাহিনি তাঁর নিজের। চিত্রনাট্য, পরিচালনা ও প্রযোজনাও তিনি করেছেন। অধিকাংশ চলচ্চিত্রের গানও তাঁরই লেখা।

 

হুমায়ূন আহমেদের পরিচালনায় প্রথম সিনেমা মুক্তি পায় ‘আগুনের পরশমণি’ [১৯৯৪]। আসাদুজ্জামান নূর, আবুল হায়াত ও বিপাশা হায়াত অভিনীত ছবিটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মিত। ‘আগুনের পরশমণি’ সেরা চলচ্চিত্র, সেরা পরিচালনাসহ ৮টি শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে। হুমায়ূন আহমেদ নিজেও কাহিনিকার, সংলাপ রচয়িতা এবং প্রযোজক হিসেবে জাতীয় পুরস্কার পান। এরপর ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ [২০০০]। এ ছবিটিও ৭টি শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়। ২০০১ সালে মুক্তি পায় ‘দুই দুয়ারী’। রিয়াজ, মাহফুজ আহমেদ ও মেহের আফরোজ শাওন অভিনীত এ ছবিটিও ব্যবসা সফল হয়। এ চলচ্চিত্রের জন্য রিয়াজ ২০০০ সালের সেরা অভিনেতার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান এবং এ ছবির ‘বর্ষার প্রথম দিনে’ গানটির জন্য সাবিনা ইয়াসমিন সেরা নারী কণ্ঠশিল্পীর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। ২০০৩ সালে মুক্তি পায় ‘চন্দ্রকথা’।

 

আসাদুজ্জামান নূর, আহমেদ রুবেল ও শাওন অভিনয় করেন এতে। ২০০৪ সালে মুক্তি পায় ‘শ্যামল ছায়া’। চলচ্চিত্রটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উৎসবে প্রদর্শিত ও প্রশংসিত হয়। ২০০৭ সালে মুক্তি পায় তার ‘নয় নম্বর বিপদ সংকেত’। ২০০৮ সালে হুমায়ূন আহমেদ নির্মাণ করেন ‘আমার আছে জল’। ফেরদৌস, মিম, জাহিদ হাসান ও মেহের আফরোজ শাওন অভিনীত এ ছবিটি দুটি শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়। ২০১২ সালে মুক্তি পায় হুমায়ূন আহমেদের পরিচালনায় নির্মিত সর্বশেষ ছবি ‘ঘেটুপুত্র কমলা’। শেষ ছবিতেও হুমায়ূন আহমেদ বাজিমাত করেন। ছবিটির জন্য সেরা পরিচালকসহ ২০১২ সালের বেশ কয়েকটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জেতেন তিনি।ন।

 

 

কলম জাদুকরের সেরা যত নাটক

এইসব দিনরাত্রি (১৯৮৫) : হুমায়ূনের লেখায় প্রথম ধারাবাহিক নাটক ‘এইসব দিনরাত্রি’। মধ্যবিত্ত একান্নবর্তী পরিবারের জীবনকাহিনি নিয়ে নির্মিত এই ধারাবাহিকটি তৎকালীন সময়ে বেশ জনপ্রিয়তা পায়। অভিনয়ে ডলি জহুর, আসাদুজ্জামান নূর, বুলবুল আহমেদ, আবুল খায়ের, খালেদ খান, শিল্পী সরকার অপু, রাইসুল ইসলাম আসাদ, ইনাম আহমেদ, লুৎফুন্নাহার লতা, আবদুল কাদের প্রমুখ।

বহুব্রীহি (১৯৮৮) : প্রযোজক নওয়াজেশ আলী খানের প্রযোজনায় বিটিভিতে প্রচারিত ধারাবাহিক নাটক ‘বহুব্রীহি’। প্রধান ভূমিকায় সোবহান সাহেব চরিত্রে অভিনয় করা আবুল হায়াতের এটি ছিল তার ক্যারিয়ারের সেরা নাটক। এ ছাড়া অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন আলী যাকের, আবুল খায়ের, আসাদুজ্জামান নূর, আলেয়া ফেরদৌসী, লুৎফুন্নাহার লতা, আফজাল হোসেন, লাকী ইনাম, মাহমুদা খাতুন, আফজাল শরীফসহ আরও অনেকে।

অয়োময় (১৯৯১) : ব্রিটিশ ভারতে ক্ষয়িষ্ণু জমিদারের আভিজাত্য, অহংকারসহ আরও নানা বিষয় নিয়ে নির্মিত নাটক ‘অয়োময়’। অভিনয়ে আসাদুজ্জামান নূর, বিপাশা হায়াত, লাকী ইনাম, সারা যাকের, তারানা হালিম, আবুল হায়াত, দিলারা জামান, আবুল খায়ের, ড. ইনামুল হক প্রমুখ।

কোথাও কেউ নেই (১৯৯৩) : ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকের জনপ্রিয় চরিত্র বাকের ভাই আসাদুজ্জামান নূর ও মুনা চরিত্রের সুবর্ণা মুস্তাফা। এ ছাড়াও ছিলেন আফসানা মিমি, শহীদুজ্জামান সেলিম, শীলা আহমেদ, মাসুদ আলী খান, আবুল খায়ের, লাকী ইনাম, মোজাম্মেল হক, আবদুল কাদের, দিবা নার্গিস, লুৎফর রহমান জর্জ, পুতুল, তমালিকা, বিজরী, মাহফুজ আহমেদ, হুমায়ূন ফরীদিসহ আরও অনেকে।

নক্ষত্রের রাত (১৯৯৫) : মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবনবোধ নিয়ে নির্মিত ‘নক্ষত্রের রাত’। অভিনয়ে শমী কায়সার, জাহিদ হাসান, আবুল হায়াত, দিলারা জামান, আফসানা মিমি, আলী যাকের, সারা যাকের, শাওন, শীলা আহমেদ, আজিজুল হাকিম, দিহান, আবুল খায়ের, লাকী ইনাম, আবদুল কাদের প্রমুখ।

আজ রবিবার (১৯৯৬)

উচ্চবিত্ত পরিবারের কাহিনি নিয়ে নির্মিত প্যাকেজ ধারাবাহিক ‘আজ রবিবার’। নাটকটি নির্মাণ করেন মনির হোসেন জীবন। আনিস, তিতলী ও কঙ্কা চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক সমাদৃত হন জাহিদ হাসান, শাওন ও শীলা আহমেদ। এ ছাড়াও ছিলেন আলী যাকের, আবুল খায়ের, আবুল হায়াত, সুবর্ণা মুস্তাফা, আসাদুজ্জামান নূর, ফারুক আহমেদ প্রমুখ।

অন্যান্য জনপ্রিয় যেসব নাটক

হুমায়ূনের নির্মাণে জনপ্রিয় আরও কিছু নাটকের মধ্যে রয়েছে-সবুজ ছায়া, সবুজ সাথী, উড়ে যায় বকপক্ষী, জোছনার ফুল, একদিন হঠাৎ, তারা তিনজন, আজ জরীর বিয়ে, সমুদ্রবিলাস প্রাইভেট লি., প্যাকেজ সংবাদ, ঘটনা সামান্য।