শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ২৩ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২২ ডিসেম্বর, ২০২০ ২২:১৫

কী হবে চলচ্চিত্র শিল্পের?

সিনেমা হল এখন ক্লাব ক্লিনিক মার্কেট গোডাউন

আলাউদ্দীন মাজিদ

সিনেমা হল এখন ক্লাব ক্লিনিক মার্কেট গোডাউন
এশিয়া সিনেমা হল এখন ফু-ওয়াং ক্লাব

সিনেমা হল বদলে ফেলতে হবে। বিশাল জায়গাজুড়ে প্রায় ১ হাজার আসনের সিনেমা হল রাখার আর কোনো অর্থ নেই। এখন যা করতে হবে তা হলো সিনেমা হলগুলো ভেঙে সেখানে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করতে হবে। সেই বাণিজ্যিক ভবনে থাকবে দুই থেকে ৩০০ আসনের করে একাধিক সিনেমা হল।

 কাজী ফিরোজ রশীদ

 

সেই নব্বই দশকের শেষভাগ থেকেই সিনেমার বাজারে চরম খরা। অশ্লীলতা, নকল আর পাইরেসি দর্শকদের সিনেমা হল ছাড়তে বাধ্য করেছে। এরপর সিনেমা শিল্পের উন্নয়নে বর্তমান সরকারের শতভাগ আন্তরিকতা ও সহযোগিতা থাকা সত্ত্বেও সিনেমার মানুষের মধ্যে নানা কারণে মতের অমিল, দ্বন্দ্ব, সংঘাত, বয়কট, সমিতি নিয়ে নেতা হওয়ার প্রবণতা বেড়ে গেলে পর্যাপ্ত ও মানসম্মত সিনেমা নির্মাণ মুখ থুবড়ে পড়ে। এতে লোকসানের কবলে পড়ে সিনেমা হলগুলো। একদিকে ছবি অন্যদিকে দর্শক নেই। বছরের পর বছর আর কত লোকসান গোনা যায়। বাধ্য হয়ে সিনেমা হল বন্ধ হতে হতে নব্বই দশকের শেষভাগে দেশে থাকা প্রায় ১ হাজার ৪০০ সিনেমা হল এখন এক শরও নিচে এসে ঠেকেছে। সিনেমা হল বন্ধের শুরুটা হয় ১৯৯৫ সালে। ওই বছর রাজধানীর গুলিস্তানে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী ‘গুলিস্তান’ ও ‘নাজ’ সিনেমা হল ভেঙে শপিং মল তৈরি করা হয়। তারপর দেশজুড়ে এখন পর্যন্ত চলছে এই ভাঙা আর বন্ধের ধারাবাহিকতা। কেউ সিনেমা হল বন্ধ করে ফেলে রেখেছেন কেউবা আবার ওই স্থানে গড়ে তুলেছেন শপিং মল, বাণিজ্যিক ভবন, ক্লাব, ক্লিনিক, গোডাউনসহ নানা স্থাপনা। শুধু ঢাকার সিনেমা হলের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির তথ্যমতে ঢাকায় ছিল ৪৪টি সিনেমা হল। এখন বন্ধ আর খোলা অবস্থায় সিনেমা হল হিসেবে অস্তিত্ব আছে ২৫টির। বাকিগুলোর কী হয়েছে। সে চিত্র বেদনাদায়ক। কারণ বিনোদনের ও একই সঙ্গে দেশের প্রধান গণমাধ্যম এই সিনেমা শিল্পের এমন ভঙ্গুর অবস্থা কোনো দেশপ্রেমিক জাতি মেনে নিতে পারে না। এখন দেখার বিষয় ঢাকার কোনো সিনেমা হল ভেঙে তার পরিবর্তে কী নির্মাণ করা হয়েছে।

গুলিস্তানের গুলিস্তান ও নাজ সিনেমা হল হয়েছে শপিং মল, কারওয়ান বাজারের পূর্ণিমা সিনেমা হল হয়েছে শপিং মল, মিরপুর গাবতলীর এশিয়া সিনেমা হল হয়েছে ফু-ওয়াং ক্লাব, ওয়াইজঘাটের স্টার সিনেমা হল এখন স্টার মার্কেট, ওয়াইজঘাটের মুন সিনেমা হল এখন মার্কেট, মিরপুরের বিউটি সিনেমা হল এখন মার্কেট, সদরঘাটের রূপমহল এখন মার্কেট, মৌলভীবাজারের তাজমহল সিনেমাও এখন মার্কেট, ইসলামপুরের লায়ন সিনেমাও এখন মার্কেট, আর্মানিটোলার শাবিস্তান সিনেমা এখন গোডাউন, বংশালের মানসী সিনেমা হলের নিচ তলা এখন মার্কেট, এলিফ্যান্ট রোডের মল্লিকা সিনেমা হল এখন শপিং মল, গুলশানের জ্যোতি সিনেমা হল এখন মার্কেট, ক্যান্টনমেন্টের সাগরিকা সিনেমা হল এখন কমিউনিটি সেন্টার, ক্যান্টনমেন্টের গ্যারিসন সিনেমা হলটি ভেঙে ফেলা হয়েছে, বাসাবোর আগমন ও অতিথি সিনেমা হলের স্থানে এখন রয়েছে স্বপ্ন চেইনশপ ও আড়ংয়ের শোরুম, পোস্তাগোলার ডায়না, যমুনা ও মেঘনা সিনেমা হল ভেঙে সেখানে নির্মাণ করা হয়েছে ক্লিনিক, কাকরাইলের রাজমণি হল ভেঙে নির্মাণ করা হচ্ছে শপিং মল ও বাণিজ্যিক ভবন। সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে মধুমিতা, বলাকা, অভিসার, জোনাকী, নেপচুন, পূরবী, মুক্তি, শাহীন, পর্বত, সৈনিক, বিজিবি, চিত্রামহল, আজাদ, নিউ গুলশান, বিউটি, মতিমহল, রানীমহল, সুরমা, পদ্মা, পুনম, গীত, সংগীত সিনেমা হল। এ তো গেল ঢাকার সিনেমা হল ভেঙে অন্য স্থাপনা নির্মাণ আর বন্ধের চিত্র। ঢাকার বাইরে সারা দেশেও কিন্তু একই চিত্র। অনেকের প্রশ্ন চাইলেই সিনেমা হল বন্ধ করা বা সেই স্থানে অন্য কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা যায় কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মিয়া আলাউদ্দীন বলেন, সিনেমা হল নির্মাণ করতে গেলে প্রথমে স্থানীয় জেলা প্রশাসক থেকে অনাপত্তিপত্র নিতে হয়। এরপর নিয়মনীতি মেনে বিল্ডিং নির্মাণ করে তাতে চলচ্চিত্র প্রদর্শনের মেশিন থেকে শুরু করে যাবতীয় জিনিসপত্র স্থাপনের পর ফের সিনেমা হল চালুর জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে হয়। জেলা প্রশাসক তখন ১৯৭২ সালের অর্ডিন্যান্স মোতাবেক চলচ্চিত্র প্রদর্শনের জন্য লাইসেন্স প্রদান করে থাকে। এতে সিনেমা হল বন্ধ বা ভাঙার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞাজনিত কোনো শর্ত আরোপ থাকে না। কোনো সিনেমা হল মালিক যদি সিনেমা হল বন্ধ করতে চান তাহলে তাকে এনবিআরকে লিখিতভাবে তা জানাতে হয়। সিনেমা হল বন্ধের সঙ্গে সঙ্গে এর লাইসেন্স বাতিল হয়ে যায়। এরপর আবার যদি কোনো মালিক নতুন করে সিনেমা হল চালু করতে চান তাহলে তাকে আবার নতুনভাবে লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে হয়।

সিনেমা হল বন্ধ করা নিয়ে প্রশ্ন তুললে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সাবেক সভাপতি কাজী ফিরোজ রশীদ জানতে চান ‘পর্যাপ্তসংখ্যক ও মানসম্মত ছবি নেই এ কারণে দর্শক সিনেমা হলবিমুখ। ফলে লোকসানের কবলে পড়ে আমাদের নাকাল হতে হচ্ছে গত প্রায় এক দশক ধরে। এভাবে লোকসান গুনে কি সিনেমা হল টিকিয়ে রাখা সম্ভব?’ তাঁর কাছে পাল্টা প্রশ্ন- তাহলে কী করবেন? এক কথায় তাঁর জবাব, সিনেমা হল বদলে ফেলতে হবে। বিশাল জায়গাজুড়ে প্রায় ১ হাজার আসনের সিনেমা হল রাখার কোনো অর্থ নেই। এখন যা করতে হবে তা হলো সিনেমা হলগুলো ভেঙে সেখানে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করতে হবে। সেই বাণিজ্যিক ভবনে থাকবে দুই থেকে ৩০০ আসনের করে একাধিক সিনেমা হল। কিন্তু সিনেপ্লেক্স নয়, কারণ সিনেপ্লেক্সে ব্যয় বেশি, টিকিটের দামও বেশি। তাই মালিক পক্ষ এবং দর্শক দুইয়ের জন্যই তা অনুকূল হবে না। সাধারণ দর্শক উচ্চমূল্যে টিকিট কিনে ছবি দেখতে পারবে না। আরেকটি বিষয় হলো মফস্বলের সাধারণ দর্শকও সিনেপ্লেক্সে বেশি দামের টিকিটে ছবি দেখবে না। গ্রাম-গঞ্জে এখন যাত্রাপালা, মঞ্চনাটক, জারি-সারি গানের আসর, সার্কাস, পুতুলনাচ বলতে কিছু নেই। তাদের যদি সিনেমার মাধ্যমে বিনোদন দেওয়া না যায় তাহলে তো তারা নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়বে। এখন তো সাধারণ মানুষের হাতের মুঠোয়ও সারা বিশ্বের ছবি দেখার ব্যবস্থা রয়েছে। তাই দেশের প্রধান এই গণমাধ্যম সিনেমা শিল্প টিকিয়ে রাখতে হলে সিনেমা হল পরিবর্তনের বিকল্প নেই। কাজী ফিরোজ রশীদ জানান, তাঁর মালিকানাধীন সাভারের চন্দ্রিমা ও শিউলি এবং রংপুরের শাপলা সিনেমা হল তিনটি ভবিষ্যতে ভেঙে এভাবেই সিনেমা হল নির্মাণ করবেন। একই মত ব্যক্ত করে রাজধানীর মধুমিতা সিনেমা হলের কর্ণধার ও চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির আরেক সাবেক সভাপতি ইফতেখার উদ্দীন নওশাদ বলেন, ছবিই তো নেই। ছবি ছাড়া এত বড় সিনেমা হল রেখে লোকসান গোনার কোনো মানে আছে? তিনি বলেন, আমার সিনেমা হলটি এখনই ভাঙছি না। কারণ এই ভবনটিতে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। তবে একটু দেরিতে হলেও ভবিষ্যতে বর্তমান কাঠামো বদলে কয়েকটি ২০০ থেকে ৩০০ আসনের করে সিনেমা হল নির্মাণ করব। নারায়ণগঞ্জ জেলার আড়াইহাজার থানার সাথী সিনেমা হলের মালিক চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির কর্মকর্তা মিয়া আলাউদ্দীন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তো মানসম্মত ও পর্যাপ্ত ছবির অভাব রয়েছেই। তার ওপর বর্তমানে অনলাইনে ছবি মুক্তির কালচার শুরু হয়েছে। এ অবস্থায় সিনেমা হলের দর্শক আরও কমে যাবে। তাই বড় মাপের সিনেমা হল রেখে জায়গা নষ্ট করে আর লোকসান গুনতে চাই না। বড় সিনেমা হল ভেঙে আমিও সেখানে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করে ছোট পরিসরে মানে ২০০ থেকে ৩০০ আসনের একাধিক সিনেমা হল গড়ার পক্ষে। সত্যি বলতে আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মানুষ সিনেমা দেখার ব্যবস্থায়ও পরিবর্তন চায়। আমাদেরও দর্শকরুচি আর বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন পথে হাঁটতে হবে। মিয়া আলাউদ্দীন জানান, সরকারি হিসাবে দেশে এখন ৯২টি সিনেমা হল আছে। তবে এই সংখ্যা আরও বেশি। কারণ, লোকসানের কারণে অধিকাংশ সিনেমা হলের মালিক অনেক দিন ধরে সিনেমা হলের লাইসেন্স নবায়ন করছেন না। ফলে সরকারি হিসাবের তালিকায় সেসব সিনেমা হলের নাম অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে না। এখন আসলে প্রায় সব সিনেমা হল মালিকই চাচ্ছেন বড় সিনেমা হল ভেঙে সেখানে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করে তাতে ছোট আকারে একাধিক সিনেমা হল নির্মাণ করতে। করোনাকাল অবসানের পরই সব সিনেমা হল মালিক মিলে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করবে বলে আলোচনা চলছে। রায়েরবাজারের মুক্তি সিনেমা হলে কাজ করেন ২২ জন কর্মচারী। হলটির ব্যবস্থাপক শহিদুল্লাহ বলেন, বেতন কীভাবে চালিয়ে যাবে সেই চিন্তায় অস্থির কর্তৃপক্ষ। মিরপুরের পূরবী হলের ম্যানেজার পরেশ জানান, তাঁদের হলে  মোট ৩২ জন কর্মচারী কাজ করেন। তাঁর কথায় ব্যবসা না থাকলে মালিকের পক্ষে বেতন দেওয়া কীভাবে সম্ভব? লোকসান গুনে বন্ধ করে দেওয়া ঢাকার ঐতিহ্যবাহী সিনেমা হল ‘অভিসার’-এর কর্ণধার সফর আলী ভূঁইয়া উদ্বেগ জানিয়ে বলেন, প্রতি মাস ৪-৫ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হয়। এভাবে আর কতদিন। তাই বাধ্য হয়ে মার্চ মাস থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ১ হাজার আসনের অভিসার হলটি। ঢাকার আজাদ সিনেমা হলের কর্ণধার কলিমুল্লাহর উদ্বেগ আরও তীব্র। তাঁর কথায় ২৫ জনের মতো স্টাফ আর বিদ্যুৎ বিলসহ যাবতীয় খরচ লাখ লাখ টাকার আর কতদিন এভাবে বেকার বসে বসে চালাব। ১৯২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত স্বনামধন্য এই সিনেমা হলটি গত ছয় মাস বন্ধ থাকায় এর সব যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্র, আসন সবই নষ্ট হয়ে গেছে। বেশির ভাগ সিনেমা হল মালিক উদ্বেগ জানিয়ে বলেন, সিনেমা হলের মেশিন থেকে শুরু করে সবকিছুই করোনার বন্ধের কারণে দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকতে থাকতে নষ্ট হয়ে গেছে। প্রতি মাসে স্টাফ খরচ, বিদ্যুৎ বিল, করসহ নানা খরচ মেটাতে গিয়ে লাখ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। সিনেমা হল বন্ধ করে সেই স্থানে গোডাউন বা বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করলে এই দুর্দশা থেকে মুক্তি পাব।। তাই ভাবছি আগামীতে সিনেমা হলের স্থানে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করে তাতে ছোট কয়েকটি সিনেমা হল তৈরি করব। এতে একদিকে সিনেমা হলের আধুনিক ব্যবস্থা প্রবর্তন হবে, অন্যদিকে সিনেমা হল মালিকরা ব্যয় কমে যাওয়ায় লোকসানের  হাত থেকে রক্ষা পাবেন।

 


আপনার মন্তব্য