শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ২ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১ আগস্ট, ২০২১ ২২:২৭

চলচ্চিত্রে সিনিয়র শিল্পীরা উপেক্ষিত কেন

আলাউদ্দীন মাজিদ

চলচ্চিত্রে সিনিয়র শিল্পীরা উপেক্ষিত কেন
Google News

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কাবুলিওয়ালা’র মতো মর্মস্পর্শী গল্পটি সব বয়সী পাঠকেরই মনে দাগ কাটে। গল্পটি নিয়ে ১৯৫৬ সালে প্রথমবারের মতো চলচ্চিত্র নির্মাণ হয় কলকাতায়। এটি পরিচালনা করেন প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক তপন সিংহ। ছবির প্রধান দুটি চরিত্রের মধ্যে একটি হলো বৃদ্ধ কাবুলিওয়ালা অন্যটি শিশু মিনি।

এই ছবিতে কাবুলিওয়ালার চরিত্র রূপায়ণ করেন টালিগঞ্জের সিনিয়র অভিনেতা ছবি বিশ্বাস। তার অসাধারণ অভিনয়ে ছবিটি কালজয়ী হয়ে যায়। দর্শক প্রশংসার পাশাপাশি এটি দেশ-বিদেশে পুরস্কৃতও হয়। এভাবে সিনিয়র শিল্পীদের মূল চরিত্রে কাস্ট করে যুগে যুগে বিশ্বে নির্মিত হয়েছে অসংখ্য ছবি। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে এখনো সিনিয়র শিল্পীদের মুখ্য চরিত্রে রেখে গল্প তৈরি ও ছবি নির্মাণ হয়। বলিউড শাহেনশাহ অমিতাভ বচ্চনকে মূল চরিত্রে কাস্ট করে গত কয়েক বছরে নির্মিত হয়েছে ‘বুড্ডা হোগা তেরা বাপ’, ‘চিনি কম’, ‘নিঃশব্দ’, ‘পিংক’, ‘পা’ সহ বেশ কটি ছবি। প্রয়াত সিনিয়র অভিনেত্রী শ্রীদেবীকে প্রধান চরিত্রে কাস্ট করে নির্মিত হয়েছে ‘ইংলিশ-ভিংলিশ’ ও ‘মম’র মতো জনপ্রিয় ছবি। কলকাতায় প্রখ্যাত প্রয়াত অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে প্রধান চরিত্রে কাস্ট করে বছর কয়েক আগে নির্মিত হয় ‘বেলাশেষে’র মতো অনবদ্য একটি ছবি। যেখানে সৌমিত্রর অভিনয় সব শ্রেণির দর্শকের অশ্রু ঝরিয়েছে। আসলে মুখ্য চরিত্রকে ঘিরেই ছবির গল্প গড়ায়। গল্প অনুযায়ী নির্বাচিত হয় শিল্পী। ছবির মুখ্য শিল্পী যে কিশোর, তরুণ বা যুবক হতে হবে তা কিন্তু নয়। গল্প অনুযায়ী সিনিয়র শিল্পীরাও একটি ছবির মুখ্য চরিত্র হতে পারে।

ঢাকাই ছবিতে সিনিয়র শিল্পীদের কেন্দ্রীয় চরিত্রে কাস্ট করে চলচ্চিত্র নির্মাণ হয় না এখন। অথচ ভারতে শ্রীদেবী, অমিতাভ বচ্চন, ধর্মেন্দ্র, মিঠুন চক্রবর্তী,  রঞ্জিত মল্লিক, প্রসেনজিতের মতো সিনিয়র শিল্পীদের  কেন্দ্রীয় চরিত্রে কাস্ট করে ছবি নির্মাণ হয় এবং তা পুরস্কৃত ও দর্শক প্রশংসাও কুড়ায়।

এ প্রসঙ্গে কিংবদন্তি অভিনেত্রী সুচন্দা বলেন, হলিউড আর বলিউডে দর্শক যখন একই গল্পের ছবি দেখতে দেখতে বিরক্ত তখন শন কনোরি, অমিতাভ বচ্চন, শ্রীদেবী, সৌমিত্রের মতো শিল্পীদের নিয়ে নতুন ডায়মেনশনে ছবি তৈরি শুরু হয়। দর্শক এসব ছবি গ্রহণ করল, গল্পে নতুনত্ব পেয়ে নড়েচড়ে বসল। এমন ব্যবস্থা আমাদের  দেশেও দরকার। প্রয়োজন সিনিয়রদের সেন্ট্রাল ক্যারেক্টরে এনে ছবি নির্মাণ করা। এভাবে নির্মাণ হলে চলচ্চিত্রের দুরবস্থার দ্রুত পরিবর্তন আসবে। আরেক দর্শকনন্দিত অভিনেত্রী শাবানার কথায় আমাদের এখানে সিনিয়রদের নিয়ে ছবি বানানোর ঝুঁকি কেউ নিতে চান না। এখন যারা নির্মাণে আসছেন তাদের মধ্যে গবেষণা বা ভ্যারিয়েশনের চিন্তা ভাবনা তেমন নেই। সিনিয়রদের নিয়ে কাজ করার চিন্তা থাকলেও ব্যবসায়িক ঝুঁকির কারণে অনেকে পিছিয়ে যান। এটিই দুঃখজনক। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অভিনেত্রী ববিতা বলেন, সিনিয়র হয়ে গেলে এখানে শিল্পীকে  সেন্ট্রাল ক্যারেক্টর দিয়ে ছবি নির্মাণ করেন না। নির্মাতাদের অজুহাত- ‘ছবির বাজার মন্দা, ছবি চলে না আবার সিনিয়রদের সেন্ট্রাল ক্যারেক্টরে কাস্ট করে  কে লোকসান গুনতে যাবে।’ কথাটি মোটেও ঠিক নয়। সিনেমা হচ্ছে একটি গবেষণাধর্মী মাধ্যম। আমাদের দেশে এ নিয়ে গবেষণার কোনো বালাই নেই। খ্যাতিমান গল্পকারেরও অভাব রয়েছে। সিনিয়রদের ছবি যদি নাই দেখত তাহলে আমাদের দর্শক কেন বলিউডের  শ্রীদেবীর ‘ইংলিশ ভিংলিশ’, ‘মম’, অমিতাভ বচ্চনের ‘পিংক’, ‘পা’, ‘নট আউট ১০২’, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বেলাশেষে’র মতো ছবিগুলো বার বার দেখছে। আমাদের গতানুগতিক ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে এবং চিন্তা-চেতনার পরিবর্তন ঘটাতে হবে।

প্রখ্যাত অভিনেতা সোহেল রানা বলেছিলেন, সিনিয়রদের নিয়ে কেন ছবি নির্মাণ হয় না তা এখনকার নির্মাতারাই ভালো জানেন। আমরা গল্পে ডায়মেনশন আনার চেষ্টা করতাম। নতুনত্ব খুঁজতাম। এখন এই অবস্থা কোথায়। শিল্পীরা চলচ্চিত্রে আসেন দুটো কারণে। অর্থ এবং সম্মানের জন্য। এখন তো কোনোটাই নেই। একজন মাছ ব্যবসায়ীও এখন সিআইপি, ভিআইপির মর্যাদা পাচ্ছেন। কিন্তু একজন চলচ্চিত্র শিল্পী বা নির্মাতাকে এসব সম্মান তো দূরে থাক এয়ারপোর্টে গেলে বাইরে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এসব দেখে বড় কষ্ট হয়।

খ্যাতিমান অভিনেতা আলমগীর বলেন, সিনিয়র শিল্পীদের নিয়ে গল্প তৈরির মেধাসম্পন্ন লেখক এখানে আছে বলে মনে হয় না। এমন নির্মাতাও নেই যারা সিনিয়রদের কন্ট্রোল ও ডমিনেট করতে পারবেন। কারণ সিনিয়ররা ভুল দেখলে শুদ্ধ করতে বলবেন। তাই সাহস করে এখনকার নির্মাতারা সিনিয়র শিল্পীদের নিয়ে ছবি নির্মাণ করেন না। সিনিয়র নির্মাতাদের নিয়েও কাজ করতে চান না, কারণ তাদের নিয়ে কাজ করতে গেলে অ্যাডজাস্ট করতে বলবে। যদি একে অন্যের প্রতি সম্মান দেখায় তাহলে এখনো সিনিয়রদের সেন্ট্রাল ক্যারেক্টরে কাস্ট করে কাজ করা সম্ভব। সিনিয়র অভিনেতা উজ্জ্বল আক্ষেপ নিয়ে বললেন, ‘আমাকে উপস্থাপন করার লোক নেই। আমার ভিতরের যে শিল্পীসত্তা, আমার যোগ্যতা বা ম্যাচিউরিটি, তাতে আমার তো ইচ্ছা করে অমিতাভ বচ্চনের মতো গল্পের নায়ক হয়ে কাজ করি।

 সে রকম গল্প লিখবেন, পরিচালনা করবেন, তেমন কেউ তো সেই অর্থে নেই।’ জ্যেষ্ঠ অভিনয়শিল্পীরাও জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অভিনয় করতে চান। অভিনয়ের ইচ্ছা, মুনশিয়ানা আর অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রস্তুত তারা। দরকার শুধু চমৎকার গল্প আর প্রযোজক পরিচালকের উদ্যোগ।

গত ৩০ জুলাই ববিতার জন্মদিনে এই কিংবদন্তি অভিনেত্রীকে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে শাকিব খান তার ফেসবুক পেজে লেখেন- ‘পাশের দেশের ষাট, সত্তর, আশির দশকের সিনেমার অভিনেতা-অভিনেত্রীদের ঘিরে কত কত সিনেমা নির্মিত হচ্ছে; অথচ ববিতা ম্যাডামদের মতো গুণী অভিনয়শিল্পীদের আমরা পরবর্তীকালে আর ব্যবহারই করতে পারলাম না। তাদের জন্য যুতসই গল্প-চরিত্র নির্মাণ করতে পারলাম না।’ কেন জ্যেষ্ঠ অভিনয়শিল্পীদের নিয়ে গল্প তৈরি হচ্ছে না? এমন প্রশ্নে প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা মতিন রহমান বলেন, ‘আমাদের দেশে এখন যা ঘটছে, তা আগের পুনরাবৃত্তি। আগে যেহেতু সিনিয়র শিল্পীদের নিয়ে গল্প ভাবা হয়নি, এখন যেন তা ভাবাই যাবে না। সবাই  তৈরি রাস্তায় হাঁটছে। নতুন রাস্তা তৈরিতে কেউ আসছে না। নতুন করে অবশ্যই ভাবতে হবে। জ্যেষ্ঠ শিল্পীদের নিয়ে সিনেমা বানানোর বিষয়টি পরিচালকদেরই ভাবতে হবে। একবার কেউ শুরু করলে সেটাকে ছাড়িয়ে যেতে অন্যরাও চেষ্টা করত বলে মনে করেন চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তারা আরও মনে করেন, চর্চার অভাব, মনোজগতের সীমাবদ্ধতা, বৈচিত্র্য খোঁজার মানসিকতা না থাকায় বয়স্ক শিল্পীদের নিয়ে গল্প ভাবতে পারেন না তারা। বলিউডে শ্রীদেবী, ইরফান খান, ঋষি কাপুরের মতো সিনিয়র তারকারা মুখ্য চরিত্রে কাজ করতে করতেই মারা গেছেন।

বাংলাদেশে নায়করাজ রাজ্জাক নব্বইয়ের দশকে ‘বাবা  কেন চাকর’ নামে একটি ছবি নির্মাণ করেন। যেখানে বাবাই ছিল মুখ্য চরিত্র। আর এই চরিত্রে রাজ্জাক মর্মস্পর্শী অভিনয় করেন। ছবিটি এতটাই জনপ্রিয় হয় যে পরবর্তীতে কলকাতায় ছবিটি রিমেক করা হয় এবং সেখানেও ছবিটি সুপারহিট হয়। এরপর একই দশকে স্বনামধন্য নির্মাতা  কাজী হায়াৎ কিংবদন্তি অভিনেত্রী শবনমকে কেন্দ্রীয় চরিত্রে কাস্ট করে নির্মাণ করেন ‘আম্মাজান’ ছবিটি। এটিও ব্যাপক জনপ্রিয় হয়। বাংলাদেশে এখন যারা জ্যেষ্ঠ অভিনয়শিল্পী তারাও অভিনয়টা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত করতে চান। অভিনয়ের ইচ্ছা, মুনশিয়ানা আর  অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রস্তুত তারা।  দরকার শুধু চমৎকার কিছু গল্প আর প্রযোজক পরিচালকের উদ্যোগ।