শিরোনাম
প্রকাশ : ১৭ ডিসেম্বর, ২০২০ ১০:৩৭
প্রিন্ট করুন printer

কাকরাইল ফিল্মপাড়া এখন প্রযোজনা সংস্থাশূন্য

আলাউদ্দীন মাজিদ


কাকরাইল ফিল্মপাড়া এখন প্রযোজনা সংস্থাশূন্য

কাকরাইল ফিল্মপাড়ার সেই রমরমা অবস্থা এখন আর নেই। ২০১২ সাল পর্যন্ত কমপক্ষে দুই শতাধিক চলচ্চিত্র প্রযোজনা সংস্থার অফিস নিয়ে মুখর ছিল কাকরাইল। এখন সেখানে চলচ্চিত্রের মানুষের পদচারণা নেই। নেই ছবি, পোস্টার, সিনেমা হল মালিক, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও শিল্পী-কলাকুশলীদের পদচারণা। মানে প্রযোজনা সংস্থাশূন্য হয়ে পড়েছে ফিল্মপাড়া খ্যাত কাকরাইল।

অন্যদিকে, করোনার কারণে দীর্ঘ প্রায় ৭ মাস বন্ধ থাকার পর ১৬ অক্টোবর সিনেমা হল খুললেও নির্মাতারা নানা কারণে ছবি মুক্তি দেননি। এ নিয়ে প্রদর্শক আর দর্শকদের মধ্যে হা-পিত্যেশ ছিল। অবশেষে ১১ ডিসেম্বর দুটি ছবি ‘বিশ্বসুন্দরী’ ও ‘রূপসা নদীর বাঁকে’ মুক্তি পেলেও চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মিয়া আলাউদ্দীনের কথায় ‘ছবি দুটো তেমনভাবে দর্শক টানতে পারছে না। ‘বিশ্বসুন্দরী’ সিনেপ্লেক্সের বাইরে যে কয়টি সিনেমা হলে মুক্তি পেয়েছে তাতে আশানুরূপ দর্শক নেই। সিনেপ্লেক্স প্রদর্শক সমিতির আওতাভুক্ত নয়। তাই সেখানকার অবস্থার কথা বলতে পারছি না। ‘রূপসা নদীর বাঁকে’ সিনেপ্লেক্সে মুক্তি পেয়েছে। তাই ওই ছবির বিষয়েও কোনো মন্তব্য করতে পারছি না। প্রত্যাশা ছিল দীর্ঘদিন পর যেহেতু নতুন ছবি মুক্তি পেয়েছে তাই হয়তো সিনেমা হলে দর্শকবহুল একটি চিত্র দেখা যাবে। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি। 

কেন দর্শক সিনেমা হলে আসছে না এমন প্রশ্নে মিয়া আলাউদ্দীন বলেন, এটি দর্শকের ব্যক্তিগত বিষয় ও রুচির প্রশ্ন। মনের মতো ছবি পেলে তারা যে সিনেমা হলমুখী হয় তার প্রমাণ খরার মাঝেও একাধিকবার পাওয়া গেছে। মনপুরা, আয়নাবাজি, মোল্লা বাড়ির বউ, আমার স্বপ্ন তুমি, কোটি টাকার কাবিন, পিতার আসন, চাচ্চু কিংবা পাসওয়ার্ডের কথাই যদি ধরি তাহলে বলব অশ্লীলতার কারণে নব্বই দশকের শেষ ভাগ থেকে সিনেমা হলবিমুখ দর্শকরা এসব ছবি দেখতে ওই সময়ও কি সিনেমা হলে আসেনি? দর্শকের মনের মতো মানসম্মত ছবি নির্মিত হলে দর্শক অবশ্যই সিনেমা হলে আসে।

এদিকে, কাকরাইল ফিল্মপাড়ায় যমুনা ভবন, ভূঁইয়া ম্যানশন, রাজমণি ভবন, ইস্টার্ন কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, ফরিদপুর ম্যানশনে প্রায় দুই শতাধিক চলচ্চিত্র প্রযোজনা সংস্থার অফিস ছিল ২০০০ সালের প্রথম পর্যন্ত। এরপর দর্শকের অভাবে সিনেমা হল বন্ধ শুরু হলে লোকসান গুনে বন্ধ হতে থাকে প্রযোজনা সংস্থার অফিস। করোনাকালে ১৮ মার্চ থেকে সিনেমা হল ও সিনেমা নির্মাণ বন্ধের আগে কাকরাইল ফিল্মপাড়ায় অবশিষ্ট ছিল হার্টবিট প্রোডাকশন, জননী কথাচিত্র, সজীব ফিল্মস, আশীর্বাদ চলচ্চিত্র, এনএন ফিল্মস, বেনানা ফিল্মস, মালঞ্চ কথাচিত্র, টিওটি ফিল্মস, শাপলা মিডিয়া, কৃতাঞ্জলি চলচ্চিত্রের অফিস। করোনা মহামারীর কবলে পড়ে গত জুলাই মাসে বন্ধ হয়ে যায় হার্টবিট প্রোডাকশন, জননী কথাচিত্র, সজীব ফিল্মস। বাকিগুলো পুরনো ছবি ভাড়া দিয়ে নামে মাত্র টিকে আছে।

প্রখ্যাত চলচ্চিত্র প্রযোজক টিওটি ফিল্মসের কর্ণধার খোরশেদ আলম খসরু বলেন, চলচ্চিত্র শিল্পের দৈন্যদশার কারণে বিশাল অঙ্কের লোকসান গুনে ২০১৬ সাল থেকেই আমার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকে আর ছবি নির্মাণ করতে পারছি না। ছবি নির্মাণ না করলেও নিয়মিত অফিস ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, স্টাফদের বেতনসহ সমুদয় খরচ বহন করে যেতে হচ্ছে। এতে অবস্থা নাভিশ্বাসে উঠেছে। এই অবস্থা শুধু আমার একার নয়, সব প্রযোজকের। প্রযোজকরা আগে বলতাম ‘প্রযোজক বাঁচলে সিনেমা হল বাঁচবে’, এখন বলছি ‘সিনেমা হল বাঁচলে প্রযোজক বাঁচবে’। সরকারের কাছে বিষয়টি একাধিকবার উত্থাপন করার পর সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সিনেমা হল বাঁচাতে ঋণ প্রদানের ঘোষণা দিয়েছেন। এখন প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন, প্রযোজকদের যদি চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করা হয় তাহলে প্রযোজকরাও নিয়মিত মানসম্মত ছবি নির্মাণ করতে পারবেন এবং সিনেমা হলগুলোও পর্যাপ্ত ছবি পেয়ে তাঁদের ঋণ শোধ করতে পারবেন। মানে নির্মাণ ও প্রদর্শনের ক্ষেত্রে ভারসাম্য ফিরবে। ঋণগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রযোজকরা তাঁদের টোটাল ডিজিটাল রাইটস ব্যাংকের কাছে মর্ডগেজ রাখবেন। কারণ পরবর্তীতে কোনো প্রযোজক যদি ঋণ শোধ করতে না পারেন ব্যাংক তখন ওই প্রযোজকের ডিজিটাল রাইটস থেকে সহজেই ঋণের টাকা তুলে নিতে পারবেন। সরকার যদি শুধু সিনেমা হলের জন্য ঋণ দেয় আর চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে সহযোগিতা না করে তাহলে ছবির অভাবে সিনেমা হল বন্ধ হতেই থাকবে। এতে দেশে চলচ্চিত্র শিল্প বলে একসময় আর কিছুই থাকবে না।

এসকে ফিল্মসের কর্ণধার শীর্ষ অভিনেতা ও প্রযোজক শাকিব খান বলেন, ‘চলচ্চিত্র প্রযোজকরা দীর্ঘদিন ধরে করুণ অবস্থা পার করছেন। পাইরেসি ও দর্শকখরা প্রযোজকদের পথে বসিয়ে ছেড়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়নে সদা তৎপর। এ পর্যন্ত এই বিষয়ে নানা যুগান্তকারী পদক্ষেপ তিনি গ্রহণ করেছেন। সম্প্রতি তিনি সিনেমা হলের উন্নয়নে ঋণ প্রদানের ঘোষণা দিয়েছেন। এখন সিনেমা হল টিকিয়ে রাখতে ও বন্ধ সিনেমা হলগুলো পুনরায় চালু করতে দরকার পর্যাপ্ত মানসম্মত ছবি। আর এর জন্য কমপক্ষে গত ৫ বছর যেসব প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান নির্মাণে সক্রিয় ছিল তাদের যদি বছরে কমপক্ষে ১০০ কোটি টাকা করে দুই বছরে ২০০ কোটি টাকার স্বল্প সুদ ও সহজ কিস্তিতে ঋণ দেওয়া হয়, তাহলে অবধারিতভাবে চলচ্চিত্র শিল্পের সুদিন ফিরে আসবে। চলচ্চিত্রের মানুষ ও দর্শকের মাঝে স্বস্তি ফিরবে এবং দেশের প্রধান গণমাধ্যম চলচ্চিত্র শিল্প আবার দেশে-বিদেশে বাংলাদেশের জন্য সুনাম বয়ে আনবে।

দেশ স্বাধীনের আগেই ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় স্থাপিত হয় চলচ্চিত্র প্রযোজনা সংস্থার অফিস। বঙ্গবন্ধু এভিনিউ, তোপখানা রোড, নয়াপল্টন, কাকরাইল, গ্রিন রোড, সিদ্দিকবাজার, নওয়াবপুর, ওয়াইজঘাট, ইসলামপুর, গুলিস্তান, দিলকুশা, মতিঝিল, বিজয়নগর, ওয়ারী, পুরানা পল্টন, গুলশান, ধানমন্ডি, আরামবাগ, ফকিরাপুলসহ নানা স্থানে ছিল প্রযোজনা সংস্থার অফিস। ১৯৫৬ সালে এ দেশে প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ নির্মাণ হলে স্থাপিত হয় প্রযোজনা সংস্থার অফিস। ইকবাল ফিল্মসের ব্যানারে ছবিটি নির্মাণ করেন আবদুল জব্বার খান। তখন এই সংস্থার অফিস স্থাপিত হয় ভিক্টোরিয়া পার্কে অবস্থিত প্রভেনশিয়াল বুক ডিপো ভবনের দ্বিতীয় তলায়। দেশ স্বাধীনের পর গুলিস্তানে গুলিস্তান সিনেমা হল ভবনে প্রযোজনা সংস্থার অফিসগুলো একত্রিত হয়ে গড়ে তোলে ফিল্মপাড়া। ২০০০ সালের প্রথমদিকে গুলিস্তান সিনেমা হল ভেঙে ফেলা হলে প্রযোজনা সংস্থাগুলো কাকরাইলে চলে আসে। এখানে রাজমণি ভবন, ভূঁইয়া ম্যানশন, ফরিদপুর ম্যানশন, যমুনা ভবন, ইস্টার্ন কমার্শিয়াল ভবনে  খোলা হয় প্রযোজনা সংস্থার অফিস। তখন  থেকেই চলচ্চিত্রপাড়া হিসেবে খ্যাতি লাভ করে কাকরাইল। এই ফিল্মপাড়ায় প্রায় দুই শতাধিক চলচ্চিত্র প্রযোজনার অফিস শিল্পটিকে সরব করে রেখেছিল। ২০০৮ সালের পর থেকে নানা কারণে চলচ্চিত্র ব্যবসায় মন্দাভাব শুরু হলে ধীরে ধীরে প্রযোজনা সংস্থাগুলো বন্ধ করে দিয়ে অফিস গুটিয়ে নিতে শুরু করেন প্রযোজকরা। 

চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির প্রধান উপদেষ্টা সুদীপ কুমার দাস উদ্বেগের সঙ্গে জানান, এই ফিল্মপাড়ায় বর্তমানে প্রযোজনা সংস্থার অফিস নেই বললেই চলে। কারণ চলচ্চিত্র নির্মাণই যদি না থাকে তাহলে অফিস ভাড়া, স্টাফ খরচসহ অন্যান্য ব্যয় আর কত লোকসান গুনে টিকিয়ে রাখা যায়। যেগুলো আছে তাতে চলচ্চিত্রের কোনো কাজ নেই। বাধ্য হয়ে অন্য ব্যবসায় অফিসগুলোকে ব্যবহার করছেন সংশ্লিষ্ট প্রযোজকরা। কাকরাইলের বাইরে বিভিন্ন স্থানে হাতে গোনা কয়েকটি প্রযোজনা সংস্থার অফিস রয়েছে। যেমন- জাজ মাল্টিমিডিয়া, এসকে ফিল্মস, লাইভ টেকনোলজি প্রভৃতি। এগুলো থেকেও এখন আর নিয়মিত ছবি পাওয়া যায় না। দীর্ঘদিন ধরে প্রযোজনায় অনিয়মিত রয়েছে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় প্রযোজনা সংস্থা জাজ মাল্টিমিডিয়া। হার্টবিট প্রোডাকশন হাউসের কর্ণধার তাপসী ফারুক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সিনেমা হলে পরিবেশের অভাব, সিনেমা হল হ্রাস, অপর্যাপ্ত সিনেপ্লেক্স এবং দর্শকগ্রহণযোগ্য নায়ক-নায়িকার অভাবে এখন আর ব্যবসাসফল ছবি হয় না। একমাত্র শাকিব খানকে নিয়ে ছবি নির্মাণ করলে সেই ছবি ব্যবসার মুখ দেখে। কিন্তু এই শীর্ষ নায়ককে নিয়ে ছবি নির্মাণ করতে গেলে কমপক্ষে দুই থেকে আড়াই কোটি টাকা দরকার। সিনেমা হলের সংখ্যা এখন এক শরও নিচে নেমে আসায় এই অর্থ ফেরত আনা সম্ভব নয়। আর কলকাতার ছবি এখানে একসঙ্গে মুক্তি দিতে না পারায় দর্শক তা দেখে না। ফলে প্রযোজনা সংস্থা টিকিয়ে রাখতে গেলে স্টাফদের বেতনসহ নানা ব্যয় নির্বাহ করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। এতে প্রযোজনা সংস্থাগুলো এখন চরম অশনি সংকেতের কবলে পড়েছে। সরকারের কাছে প্রণোদনা নয়, সহজ শর্তে ঋণ চাই। তাহলে আবার মানসম্মত ছবি নির্মাণের মাধ্যমে এই শিল্পকে চাঙ্গা করে তোলা সম্ভব হবে।


আপনার মন্তব্য