তিমির গান পৃথিবীর সবচেয়ে আশ্চর্যজনক প্রাকৃতিক রহস্যের একটি। সমুদ্রের বিশাল গভীরে তারা যে ধ্বনি তৈরি করে, সেটি কয়েক শ কিলোমিটার দূর থেকেও শোনা যায়। কারণ শব্দ পানিতে বায়ুর তুলনায় অনেক দ্রুত ও শক্তিশালীভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণে তিমির ডাক সমুদ্রজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এক অনন্য সুরে। তিমিদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত গায়ক হাম্পব্যাক তিমি। তাদের গান এত সুন্দর ও জটিল যে বিজ্ঞানীরা একে সংগীতের সঙ্গে তুলনা করেন। শুধু হাম্পব্যাক নয়, নীল তিমি, ফিন তিমি এবং বো-হেড তিমিরাও নিজস্ব সুরে গান গায়। প্রতিটি দলের গান ভিন্ন হয়, যেন তাদের নিজস্ব ভাষা আছে। আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, হাম্পব্যাক তিমির গান প্রতি বছর পরিবর্তিত হয়, যেন তারা নতুন গান শিখে নিচ্ছে।
তিমি কেন গান গায়, তা নিয়ে গবেষকরা নানা ধারণা দিয়েছেন। ধারণা করা হয়, তারা গান গেয়ে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করে, সঙ্গী খোঁজে এবং নিজেদের এলাকা চিহ্নিত করে। গভীর সমুদ্রের অন্ধকারে গান তাদের পথ নির্দেশনাতেও সাহায্য করে। কিছু গান মানুষের কানে শোনা যায় না, কারণ তা ইনফ্রাসাউন্ডের পর্যায়ে থাকে, তবে অন্য তিমিরা সহজেই শুনতে পায়।
মানুষের জন্যও তিমির গান বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। সমুদ্র গবেষণায় এর মাধ্যমে তিমির সংখ্যা, চলাফেরা এবং আচরণ বোঝা যায়। সংগীতশিল্পীরাও তিমির গান থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছেন। পৃথিবীর পরিবেশ রক্ষার বার্তায় তিমির গানকে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তবে দুঃখজনক হলো, আজকের সমুদ্র আর তেমন শান্ত নেই। জাহাজ চলাচল, গভীর সমুদ্রে খনন, ইঞ্জিনের শব্দ এবং সোনার যন্ত্রের কারণে তিমিরা প্রায়শই বিভ্রান্ত হয়, যোগাযোগ করতে পারে না, পথ হারিয়ে ফেলে এবং দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায়। এসব শব্দের কারণে তিমির সঙ্গী খুঁজতেও সমস্যা হয়, যা প্রাণীটির প্রজননে বাধা সৃষ্টি করে। তাই তিমির গান শুধু এক প্রাকৃতিক রহস্য নয়, বরং আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তাও। তিমির গান প্রমাণ করে যে সমুদ্র শুধু পানি নয়, এটি প্রকৃতির এক সুরেলা অর্কেস্ট্রা, যেখানে প্রতিটি তিমি একেকজন শিল্পী। সমুদ্রের গভীর অন্ধকারে প্রতিধ্বনিত এ সুর আমাদের মনে করিয়ে দেয় প্রাণ-প্রকৃতির ভিতরে অসংখ্য রহস্য ও সৌন্দর্য এখনো লুকিয়ে আছে, যা জানার জন্য আমাদের প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
লেখক : পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়