শিরোনাম
প্রকাশ : ২৭ জুলাই, ২০২০ ১৬:৫৪
আপডেট : ২৭ জুলাই, ২০২০ ১৭:০৮

আমি লিখেছি স্রেফ নিজের মনের খোরাকের জন্য

আমিনুল ইসলাম

আমি লিখেছি স্রেফ নিজের মনের খোরাকের জন্য
আমিনুল ইসলাম

আমাকে আজ একটা ইন্টারভিউ'তে জিজ্ঞেস করা হয়েছে

-আপনি কেন লেখালেখি করেন?

আমি উত্তর কি দিয়েছি, সেটা বলার আগে বরং ভারতের বলিউড নিয়ে কিছু বলে নেয়া যাক

আমি হিন্দি সিনেমা একদম'ই দেখি না। আমাকে আপনারা এই বিষয়ে মূর্খ বলতে পারেন। কিছু দিন আগে সুশান্ত সিং নামে এক নায়ক মারা গেল। আমি এই নায়ক'কে এর আগে চিনতাম না। কেমন যেন সঙ্কোচবোধ হচ্ছিল নিজের কাছেই।

এরপর আমি এই নায়কের দুটো সিনেমা দেখেছি এবং তার মৃত্যু নিয়ে বলিউডে যা যা ঘটে চলেছে- সেটা পর্যবেক্ষণ করার চেষ্টা করছি।

আগে'ই বলে নেই, সিনেমা-নাটক আমার আগ্রহের বিষয় নয়। শিল্পের এই শাখা'টি আমাকে কখনো খুব একটা টানে'নি। যদিও আমি নিজেই সিনেমা করার প্রস্তাব পেয়েছি বেশ কয়েকবার। মাস খানেক আগেও পেয়েছি একবার!

যা হোক, সুশান্ত নামের এই নায়কের মৃত্যু ঘিরে বলিউডে এখন নানান বিতর্ক শুরু হয়েছে। একদল বলছে- তাকে হত্যা করা হয়েছে। আরেক দল বলছে এটি আত্মহত্যা।

এর মাঝে যে দল বলছে তাকে হত্যা করা হয়েছে সিস্টেম্যাটিক উপায়ে; তারা বলিউড মাফিয়াদের নিয়ে নানান সমালোচনা করছে। বলিউড মাফিয়া বলতে এরা বুঝাচ্ছে এক দল প্রতিষ্ঠিত সিনেমার প্রযোজক, পরিচালক এবং নায়ক-নায়িকা। এরা নাকি বলিউডের বাইরে ছোট ছোট শহর থেকে যারা উঠে আসে- তাদের নানান ভাবে হয়রানি করে। যাতে করে তারা বলিউডে প্রতিষ্ঠিত হতে না পারে। এই সব প্রতিষ্ঠিত লোকজনদের সবাই চেনে-জানে। কিন্তু তাদের ভয়ে কেউ এতদিন মুখ খুলেনি।

সুশান্তের মৃত্যু'র পর প্রথম মুখ খুলেছে- কঙ্গনা নামের এক নায়িকা। একজন নায়িকার প্রেমে পড়ার মতো মানুষ আমি নই। কিন্তু আমি এই মানুষটার প্রেমে পড়েছি।

আমি প্রেমে পড়েছি- তার কথা শুনে। তার সাহস দেখে এবং যে কোন কথা নির্ভয়ে বলে দেয়ার ক্ষমতা দেখে।

সেদিন এক আলোচনা অনুষ্ঠানে এই নায়িকা'কে প্রশ্ন করা হয়েছিল

-আপনি নিশ্চয় প্রতিবাদ করছেন দেশের সাধারণ মানুষের জন্য। দেশের সাধারণ ছেলে-পেলেদের জন্য, যারা এই বলিউড ইন্ডাস্ট্রি'তে কাজ করতে চায় কিন্তু এই মাফিয়াদের জন্য পেরে উঠছে না।

এই নায়িকা যে'ই উত্তর দিয়েছে; সেটা আমি বিমোহিত হয়ে শুনেছি। সে বলেছে

-আমি দেশের সাধারণ মানুষের জন্য কথা বলছি না। আমি জানি ভারতীয় মানুষজন কেমন। এরা তো বিদেশি সাদা চামড়া দেখলে'ই বেহুশ হয়ে পড়ে থাকে। আমি মোটেই এসব সাধারণ মানুষের জন্য কথা বলছি না। আমি কথা বলছি আমার নিজের জন্য। যাতে শান্তি'তে ঘুমাতে পারি।

আমি যথেষ্ট পরিমাণ পড়াশুনা করেছি। নিজে অল্প একটু গবেষণাও করি। আজ যখন আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছে

- আপনি লেখালেখি করেন কেন?

আমি চাইলেই নিজের মতামত দেয়ার সময় নানান সব তাত্ত্বিকের রেফারেন্স দিয়ে উত্তর দিতে পারতাম। সেটা না করে আমি বরং বলিউডের এই নায়িকার রেফারেন্স দিয়ে বলেছি

আমি আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের জন্য লিখি না। কারণ আমি জানি, এই সাধারণ মানুষরা কতটা ডাবল স্ট্যান্ডার্ড হতে পারে। এই সাধারণ মানুষরা আপনি যদি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এদের কোন কমেন্টের উত্তর না দেন; তাহলে বলবে- ভাব নিচ্ছে! আবার যদি আপনার মূল্যবান সময় ব্যয় করে সবার উত্তর দেন; তাহলে বলবে - এর মনে হয় খেয়ে দেয়ে কোন কাজ নেই। এই জন্য সবার উত্তর দিয়ে বেড়াচ্ছে।

এই সাধারণ মানুষ'রা দিন-রাত দেশের সরকারি অফিস-আদালত, আমলাদের বিরুদ্ধে কথা বলে বেড়াবে। আবার এরা'ই দেখবেন এসব মানুষদের সেলিব্রেটি বানাচ্ছে। আজকাল তো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরকারি আমলারা একেকজন বিশাল বিশাল সেলিব্রেটি। যেই কাজ তাদের এমনিতেই করার কথা। যেটা করার জন্য'ই তাদের চাকরি দেয়া হয়েছে। সেই কাজ করে'ই এরা প্রশংসা পাচ্ছে। বিরাট সেলিব্রেটি হয়ে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ'ই এদের সেলিব্রেটি বানাচ্ছে।

এই সাধারণ মানুষ ব্যবসায়ীদেরও সেলিব্রেটি বানাচ্ছে। রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে সবাইকে এরা'ই সেলিব্রেটি বানাচ্ছে।

এই সাধারণ মানুষ'ই দিন রাতে এদের সমালোচনা করে বেড়ায়। আমি আমার আশপাশের মানুষজনের মাঝে'ই এইসব দ্বিচারিতা দেখতে পাই।

কেউ একটু সুন্দর করে ইংরেজি বলে ভিডিও আপলোড করে বিশাল সেলিব্রেটি হয়ে যাচ্ছে। কেউ আবার নিজের অর্থ-সম্পদ ইত্যাদি দেখিয়ে নামকরা হয়ে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ'ই করছে এসব। অথচ যারা প্রকৃত লেখক; যারা কিনা মেধার চর্চা করছে, তারা থেকে যাচ্ছে আলোচনার বাইরে। এদের লেখা আমরা পড়ি না।

না; আমি দেশের সাধারণ মানুষের জন্য লিখি না। আমি এটাও মনে করি না- আমার লেখার মাধ্যমে অনেক কিছু বদলে যাবে।

আমি সব সময় বিশ্বাস করে এসেছি পুরনো ধ্যান-ধারণা বর্তমান সমাজে চলতে পারে। এতে কোন সমস্যা নেই। কিন্তু এক'ই সাথে এমন অনেক পুরাতন সংস্কার এবং ধ্যান-ধারণা আছে; যেটা কোন ভাবে'ই বর্তমান পৃথিবী কিংবা সমাজের সাথে যায় না অথবা সভ্য সমাজের সাথে মেলে না। আমি সেই সব বিষয় নিয়ে বলতে চেয়েছি সব সময়।

আর সেটা আমি লিখতে চেয়েছি আমার নিজের জন্য। যাতে রাতে যখন ঘুমাতে যাই, শান্তিতে একটু ঘুমাতে পারি।

দেশের জন্য, দেশের সাধারণ মানুষের জন্য আমি কোন দিন লেখালেখি করিনি। করবোও না। কারণ আমি জানি কতোটা ভণ্ড এবং ডাবল স্ট্যান্ডার্ড সমাজে আমাদের বসবাস। আমরা পর্দার আড়ালে ধর্ষণ করি। আর প্রকাশ্যে এসে ধর্ষণের বিরুদ্ধে কথা বলে ফেরেশতা হয়ে যাই। আমি জানি এই সমাজের সাধারণ মানুষ গুলো কতোটা স্ববিরোধী।

আমি কখনোই সাধারণ মানুষের জন্য লিখিনি। আমি লিখেছি স্রেফ আমার নিজের মনের খোরাকের জন্য।

এখানে সাদা চামড়া এবং নীল চোখের যেই নারী আজ আমার ইন্টারভিউ নিয়েছে, সে আমার উত্তর শুনে ইংরেজিতে আমাকে প্রশ্ন করেছে

-তুমি একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। উত্তর দেবার সময় একজন বলিউড সিনেমার নায়িকার রেফারেন্স দিচ্ছ; ব্যাপারটা কেমন হয়ে যাচ্ছে না। তুমি কি আরেকবার চিন্তা করে বলবে।

আমি তাকে উত্তরে পরিষ্কার ইংরেজিতে বলেছি

-This is exactly the reason, i write. I always wanted to contest and deconstruct such existing grand narratives.

এর বাংলা করলে দাঁড়ায়- এই জন্য'ই আমি লেখালেখি করি। কারণ আমি সব সময়'ই প্রথাগত এমন সব ধ্যান-ধারণা'র সেকল ভাঙতে চেয়েছি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হলেই যে একজন সিনেমার নায়িকার রেফারেন্স দিয়ে কথা বলা যাবে না কিংবা বললে সেটা খুব হালকা হয়ে যাবে- এই তত্ত্ব আমাদের কে শিখিয়েছে? যারা শিখিয়েছে, আমি তাদের বিরুদ্ধেও লিখতে চাই। হ্যাঁ, সাধারণ মানুষের জন্য নয়। স্রেফ নিজের মনের শান্তি'র জন্য।

কারণ আমি জানি স্ববিরোধী এসব সাধারণ মানুষ দিন-রাত নিজেরা "সাধারণ মানুষ"; কোন সুযোগ-সুবিধা নেই ইত্যাদি বলে বেড়াবে। হা-হুতাশ করে বেড়াবে। আবার একটু পরেই যারা তাদের এসব থেকে বঞ্চিত করছে- এদের'ই প্রশংসা করে সেলিব্রেটি বানিয়ে দেবে!

না, আমি এদের জন্য লিখি না। আমি লিখি স্রেফ আমার নিজের জন্য।

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

বিডি প্রতিদিন/আরাফাত


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর