২৪ অক্টোবর, ২০২১ ১৮:৩৪

শিল্পীর তুলির আঁচড়ে ফেলনা হয়ে উঠছে জীবন্ত ক্যানভাস

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী

শিল্পীর তুলির আঁচড়ে ফেলনা হয়ে উঠছে জীবন্ত ক্যানভাস

ছবি যেন শব্দহীন যোগাযোগের বিমূর্ত প্রতীক-এই কথাটিই জীবন্তভাবে ধরা দেয় বিশ্বের নানা শিল্পী, চিত্রগ্রাহকের ছবির মাধ্যমে। গহীন অরণ্যের বা মরুভূমির ছবি থেকে শুরু করে ভ্রমণের ছবি, রং-তুলিতে আঁকা শৈল্পিক ছবি, পরিচিত-অপরিচিত নানা শিল্পের ছবি, দেশী-বিদেশি শিল্পী, গায়ক, অভিনেতার দৈনন্দিন ছবি পর্যন্ত কিসের ছবি নেই এখানে, সবকিছুর-ই সন্ধান মেলে এই মাধ্যমটিতে। ব্যতিক্রমী কোনো শিল্প বা ছবি আলোড়ন তুলে প্রায়ই। এরকমই একজন আলোড়ন তোলা মানুষ মো. সাদিতউজ্জামান সাদিত এবং তার টি-ব্যাগের ক্যানভাসে করা শিল্পকর্ম।

টি-ব্যাগে করা শিল্পকর্ম, শুনতে কিছুটা অদ্ভুত শোনায়। একে তো ফেলনা জিনিস, তার ওপর ছোট্ট একটি টি-ব্যাগ, স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন জাগে এমন বস্তু দ্বারা কি তা সম্ভব? সম্ভব হলেও কিভাবে সম্ভব? কিংবা কতোটুকুই নিখুঁত বা জীবন্ত হতে পারে এমন কোনো শিল্প এ ধরনের প্রশ্ন মনে আসবে খুব স্বাভাবিকভাবেই। কোনো খাদ্যবস্তু থেকেও এমন একটি ব্যতিক্রমধর্মী ধারার বাস্তব রূপ দেওয়া যায়, সর্বসাধারণের চিন্তার বাইরের এই কাজটিই করেছেন টগবগে এই তরুণ।

কিছুটা অদ্ভুত শোনালেও তার তৈরি শিল্পের ছবি দেখলেই সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। রং তুলির আঁচড়ে বিখ্যাতজন, প্রাকৃতিক দৃশ্যগুলো জীবন্ত করে তুলেছেন চিত্রশিল্পী মো. সাদিতউজ্জামান সাদিত। কী নেই টি-ব্যাগের ক্যানভাসে! টি-ব্যাগের ক্যানভাসে এঁকেছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ, আছেন জাতীয় কবি নজরুলও। টি-ব্যাগেই রেলস্টেশন, যাত্রীবোঝাই বাস, ময়ূর কিংবা বর্ষার প্রথম কদম ফুল। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, ধর্মীয় সম্প্রীতি, রঙিন কৃষ্ণচূড়া কিংবা সুবিশাল চা বাগান সবই যেন জীবন্ত হয়ে ধরা দেয় তার হাতে। এ বৈচিত্র্যময় খুদে শিল্পকর্ম এরই মধ্যে সাড়া ফেলেছে দেশ-বিদেশে।

সাদিতের বাড়ি রাজশাহী মহানগরের লক্ষ্মীপুর ঝাউতলা এলাকায়। তিনি রাজধানী ঢাকার মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ রাইফেলস পাবলিক কলেজ থেকে এইচএসসি আর বিবিএ, এমবিএ করেন আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ থেকে।

মো. সাদিতউজ্জামানের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বেশ কয়েক বছর আগে শুরু হয় তার এই শিল্পচর্চা। কিভাবে শুরু হয়? হ্যাঁ, অবশ্যই হুট করে নয়, কোনো কিছু দেখে কৌতূহল উদয় হওয়ায় এবং সেই থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই শুরু। ছেলেবেলা থেকেই ছবি আঁকায় ঝোক। তার বাবা একবার এক বাক্স আইসক্রিম কিনে দিয়েছিলেন ছোট্ট সাদিতকে। খাওয়ার পর আইসক্রিমের বাক্সটি ফেলে না দিয়ে তার ওপর রং তুলির আঁচড় দিতে শুরু করেন তিনি। ধীরে ধীরে ফুটে উঠতে থাকল এক দৃষ্টিনন্দন গ্রাম। পরিত্যক্ত আইসক্রিমের বাক্সই হয়ে উঠল ছবি।

সেই শুরু। পরিত্যক্ত কোনো কিছুকে ছবির ক্যানভাস বানিয়ে ফেলার কাজ এখনো করে যাচ্ছেন সাদিত। একটু ফুরসত মিললেই বসে পড়েন রং তুলি নিয়ে।

ছোটবেলায় তার সেজো খালা নূর ই হাফসা পারভিনের প্রভাবও তার ওপর পড়েছে। তার খালাকে দেখেই তার মধ্যে বিভিন্ন ফেলে দেওয়া জিনিসকে নতুনভাবে ব্যবহার করার আগ্রহটা তৈরি হয়েছে। প্রধানত রিসাইকেল ম্যাটেরিয়াল নিয়ে কাজ করার আগ্রহটাও এখান থেকেই। ছোটবেলা থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করলেও টি-ব্যাগে ছবি আঁকার অনুপ্রেরণাটা তিনি পেয়েছেন মার্কিন চিত্রশিল্পী রুবি সিলভিয়াসের কাছ থেকে।

সারা পৃথিবীতে টি-ব্যাগে ছবি আঁকেন এমন শিল্পীদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের রুবি সিলভিয়াস অন্যতম। রুবি সিলভিয়ার রিসাইকেল ফর্মের কাজ দেখেই তার মধ্যে এই আইডিয়াটি আসে। ২০১৬ সাল থেকে তিনি টি-ব্যাগ ক্যানভাসে ছবি আঁকা শুরু করেন।

পড়াশোনার বিষয় ছিল না চিত্রকর্ম। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাও নেই আঁকাআঁকি বিষয়ে। এক রকম শখের বশেই ছবি আঁকেন। রাজশাহীতে নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ফ্যাশন হাউস ‘সুন্দর’ অথবা বাসায় নিজের ঘরই সাদিতের আঁকাআঁকির জায়গা।

টি-ব্যাগের ওপর এঁকেছেন ৪০০ ছবি। চা পানের পর যে টি-ব্যাগ ফেলে দেওয়া হয় অবহেলায়, সেটি তিনি সংগ্রহ করার পর পরিষ্কার করে রোদে শুকিয়ে ছবি আঁকেন। বিখ্যাত সবাই আছেন তার ছবিতে। সাদিতের তুলির আঁচড়ে ফুটে উঠেছে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কবি কাজী নজরুল ইসলাম, ক্রিকেটার মাশরাফি বিন মর্তুজা, সাকিব আল হাসান।

এছাড়াও এঁকেছেন রাস্তায় হেঁটে বেড়ানো লাল-সবুজের পতাকাওয়ালা, শহরের এক কোনে বসে থাকা তরমুজ ব্যবসায়ী, ধর্মীয় সম্প্রীতি, রঙিন কৃষ্ণচূড়া কিংবা কালবৈশাখী ঝড়। পরিবেশ-প্রকৃতি, মুক্তিযুদ্ধ ও বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের গল্পও তিনি বলেছেন। টি-ব্যাগের ক্যানভাসে ছবি আঁকার জন্য তিনি অ্যাক্রেলিক রং ব্যবহার করেন।
‌‘টি-ব্যাগ স্টোরিজ’ সাদিতের টি-ব্যাগ স্টোরিজ নামে একটি ফেসবুক পেজও আছে। সেখানে তিনি তার আঁকা ছবি নিয়মিত পোস্ট করেন। আর সেই আঁকা ছবি দেখে রুবি সিলাভিয়াস প্রশংসাও করেছেন। রুবি সিলভিয়াস যখন বলেন ‘তুমি আমার অনুপ্রেরণা, অসম্ভব ভালো আঁকছ তুমি’-তখন গর্বে বুকটা ভরে ওঠে সাদিতের।

পেয়েছেন দেশ-বিদেশের স্বীকৃতি: টি-ব্যাগে খুদে ছবি নিয়ে সাদিতের এ পর্যন্ত বেশ কিছু স্বীকৃতি মিলেছে। বিখ্যাত টার্কিশ কোম্পানি পেলি পেপার তাদের ক্যাটালগের প্রচ্ছদ সাদিতের আঁকা ছবি দিয়ে করেছে। পেলি পেপার পৃথিবীব্যাপী টি-ব্যাগের কাগজ উৎপাদন করে। এছাড়া সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া দেবী সিনেমার পোস্টারও তিনি এঁকেছিলেন। কাজ করেছেন ইস্পাহানি মির্জাপুর টি-ব্যাগের সঙ্গেও। তার টি-ব্যাগে আঁকা ছবি নিয়ে রূপালী ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি তাদের ক্যালেন্ডার তৈরি করেছে। এছাড়া লেখক লুৎফর হাসানের ‘বগি নম্বর জ’ উপন্যাসের প্রচ্ছদ করা হয়েছে তার টি-ব্যাগ স্টোরি দিয়ে।

সাদিতউজ্জামান সাদিত মনে করেন পরিবার তার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণার জায়গা। তিনি বলেন, যেকোনো সৃষ্টিশীল কাজ করার জন্য তার আশপাশের পরিবেশটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমি এমন একটা পরিবারে বড় হয়েছি, যেখানে সবক্ষেত্রেই জীবনকে উপভোগ করতে শেখানো।

বিডি প্রতিদিন/এমআই

সর্বশেষ খবর